দুটি অণুগল্প

আপডেট : ০২ মে ২০১৯, ১৮:৫৭

প্রতিমাপূজা

 

মেরি কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেছে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সে একজন ভারতীয় এবং সবকিছুই ভারতীয়দের মতো—আনন্দ উত্সব, অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া এবং বিয়ে—সব অনুষ্ঠানে ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। এই অডিশন ভারতীয়দের জন্য নয়, কিন্তু তার নাম ধরে ডাকার জন্য সে তৈরি ছিল।

‘তুমি কোন গান গাইবে?’ ব্রিটিশ লোকটি জিজ্ঞাসা করে।

‘প্রত্যেক প্রতিযোগী মেয়ে প্যাটসি ক্লাইনের গান ভালোবাসে,’ মেরী বলল।

‘তাহলে শোনা যাক।’

লোকটি থামানোর আগে মেরি মাত্র প্রথম কলি গেয়েছে।

‘তুমি একটা বাজে গায়িকা,’ ব্রিটিশ লোকটি বলল, ‘আর কখনোই গাইবে না।’

মেরি জানত এই মুহূর্তটা হয়তো জাতীয় টেলিভিশনে প্রচার করবে। যে কোনো ধরনের অপমান সহ্য করার জন্য ইতোমধ্যে সে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছে।

‘কিন্তু আমার বন্ধু-বান্ধব, আমার কণ্ঠস্বরের শিক্ষক, আমার মা, সবাই বলেছে আমি অসাধারণ।’

‘তারা মিথ্যা বলেছে।’

মেরি জীবনে কতগুলো গান গেয়েছে? কতগুলো মিথ্যা কথা তাকে শোনানো হয়েছে? ক্যামেরার সামনে মেরি কোনো নিষ্ঠুর দৃশ্যের অবতারণা করেনি, বরং সে দৌড়ে গ্রিনরুমে চলে যায় এবং মায়ের হাতের ওপর মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করে।

এই পৃথিবীতে আমরা মিথ্যুকদের ভালোবাসব, নতুবা একাকী বাস করব।

 

 

 

নির্ধারিত আয়

 

আমি যখন ম্যাকডোনাল্ডে চাকরি শুরু করি, তখন সেখানে নিজেকে একমাত্র কিশোর দেখে আশ্চার্যান্বিত হয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, একমাত্র ফাস্টফুড দোকানেই কিশোররা চাকরি করে। কিন্তু ম্যাকডোনাল্ডের বেশিরভাগ কর্মচারী ছিল কলেজের ছাত্র অথবা সদ্য কলেজ থেকে পাস করা স্নাতক ডিগ্রিধারী। রাঁধুনিদের মধ্যে একজনের ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ছিল এবং সে তার বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষা ও জ্ঞান ব্যবহার করে নিশ্চিত হতেন যে, হ্যামবার্গারে মাত্র দু ধরনের চাটনি থাকবে এবং শুধু দু ধরনেরই চাটনি।

আমার সহকর্মীদের নিয়ে আমি কোনো মশকরা করতে চাই না। তারা খুবই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। তবে আমার রাগ হচ্ছিল এ কারণে যে, এসব বয়স্ক লোকের ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করার জন্য আমাদের এলাকা দায়ী। যে মহিলা ‘ড্রাইভ-থ্রু’ সেকশনে কাজ করে, সে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী স্বামীহীন তিন সন্তানের জননী। আমি ভেবে পাই না, ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করে মহিলা কিভাবে সংসারের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করে?

তবে এ কথা ভাবার ফুরসত নেই, এটা একটা কাকতালীয় ঘটনা যে আমার সহকর্মীদের মধ্যে নিরানব্বই শতাংশ কৃষ্ণ বর্ণের এবং লাটিনো সম্প্রদায়ের লোকজন। আমি আদিবাসী এবং আমার গায়ের রং মিশ্র-রক্তের শহুরে ভারতীয়দের তুলনায় বেশ কালো। ম্যাকডোনাল্ডের একমাত্র সাদা জিনিস হলো ভ্যানিলা আইসক্রিম।

ম্যাকডোনাল্ডে কাজ করার জন্য কখনো কখনো নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কাজটা হয়তো অন্য কোনো বাবা বা মায়ের কাছে খুবই দরকার ছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমার বাবা-মা আর্থিক দিক থেকে সচ্ছল। আমার মা একজন ভারতীয় এবং তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উপদেষ্টা। তাঁর উপার্জন মোটামুটি ভালো। কিন্তু আমার বাবা একজন শ্বেতাঙ্গ এবং দু বছর আগে বোয়িং কোম্পানি থেকে চাকরিচ্যুত হন। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তিনি কোথাও কোনো চাকরি পাননি। একসময় হয়তো আমার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ভাজতে হবে।

কলেজে পড়াশোনা করার জন্য আমি আমার উপার্জন জমা করছি। অন্যান্য ভারতীয় ছেলেমেয়েদের মতো আমিও হাইস্কুলের দু বছর অপচয় করেছি। সুতরাং চার বছর স্কুলের পড়াশোনা সমাপ্ত করার কোনো গ্রেড আমার নেই। কিন্তু সিয়েটলে অদ্ভুত নিয়ম-কানুনের কয়েকটা বারোয়ারি কলেজ আছে। আমি অনায়াসে সেখানে পড়াশোনা করতে পারি এবং আরো বেশি উপার্জন করে বাড়ির আশপাশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারি।

এসব হলো কঠিন সময় এবং আমি অন্য অনেকের মতো মরিয়া নই। কিন্তু এই কাজটা করার জন্য আমি অত্যন্ত বেপোয়ারা।

ম্যাকডোনাল্ডে একজন বয়স্ক শ্বেতাঙ্গ কাজ করে। চলজলদি সে কোনো যন্ত্রপাতি চালাতে পারে না। সুতরাং সে দরজায় দাঁড়িয়ে খদ্দেরদের অভ্যর্থনা জানায় এবং ময়লা টেবিল পরিষ্কার করে। তবে তার জ্ঞানবুদ্ধি ভীষণ প্রখর। তার কথাবার্তা আমার ভালো লাগে। আমরা একইসঙ্গে বিরতি নিই। আমরা ম্যাকডোনাল্ডের পোলো শার্ট ঢাকার জন্য গায়ে কোট চাপিয়ে একটু দূরের সরু রাস্তায় যাই এবং সেখানে ধূমপান করি। 

লোকটির স্ত্রী দশ বছর আগে মারা গেছে।

‘বয়স্কা স্ত্রীদের চেয়ে বয়স্ক স্বামীদের বেশি দিন বাঁচা উচিত নয়,’ লোকটি বলল, ‘আমার স্ত্রীর বিধবা হওয়ার দরকার ছিল। তাহলে সে অন্যসব বয়স্কা মহিলাদের সঙ্গে বসে মৃত স্বামীদের নিয়ে হাসি-তামাশা করতে পারত।’ 

লোকটির মেয়েবন্ধু আছে। আসলে কয়েকজন বান্ধবী। 

‘বুড়ো মানুষের ঘরে যদি একা কেউ থাকে,’ সে বলল, ‘তাহলে আলাদা মেয়েমানুষের সঙ্গে নেচে অনায়াসে সময় কাটানো যায়।’

‘অদ্ভুত মন-মানসিকতার বুড়ো ভামেরা একে নাচ বলে,’ আমি বললাম, ‘আপনি বিশ্বের সবচেয়ে বুড়ো প্লেবয়ের মতো।’

সিগারেট খাওয়ার বন্ধুত্বের কয়েক মাস পরে লোকটি আমাকে বলে যে, আমি যেন তাকে বড় হরফের ‘জি’ ব্যবহার করে গ্র্যান্ডফাদার সম্বোধন করি।

‘তোমরা ভারতীয়রা কি এভাবেই বয়স্কদের সম্মান দেখাও না?’ বুড়ো বলল। ‘গ্র্যান্ডপা বা গ্রাম্পস্ কিংবা বুড্ডা অথবা বুড়ো ভাম বলে ডাকো না। আমার কাছে গ্র্যান্ডফাদার হলো রাজকীয় সম্বোধন।’

আমার চার জন দাদা-দাদি এবং নানা-নানির মধ্যে দুজন কৃষ্ণ বর্ণের এবং দুজন শ্বেতাঙ্গ। আমার জন্মের আগেই তাঁরা ইহলোক ত্যাগ করেছেন। সুতরাং ঐতিহ্যগত দিক থেকে আমার কোনো বয়স্ক আত্মীয় নেই। আমার একজন গ্র্যান্ডফাদার প্রয়োজন। এতদিন আমি গভীরভাবে গ্র্যান্ডফাদারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছিলাম। 

‘গ্র্যান্ডফাদার,’ আমি আলতো করে ডাকলাম, ‘চলুন, কাজে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে।’

বুড়ো লোকটি মুখ বড় করে এমনভাবে হাসল, যে হাসি আমি আগে কখনো দেখিনি। লোকটি সম্মান পেতে পছন্দ করে। আমি সম্মান জানাতে পছন্দ করি। এই দুঃখভরা এলাকায় সম্মানই একমাত্র বস্তু, যা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে আছে।

লেখক পরিচিতি :আদিবাসী আমেরিকান প্রভাবশালী লেখক শারম্যান আলেক্সি (পুরো নাম : শারম্যান যোসেফ আলেক্সি জুনিয়র) একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, কবি, চিত্রনাট্যকার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তাঁর জন্ম ১৯৬৬ সালের ৭ অক্টোবর, ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকানে। জন্মের পর তাঁর মস্তিস্কে জটিল রোগ ধরা পড়ে এবং ছয় মাস বয়সে শল্যচিকিত্সার মাধ্যমে রোগমুক্ত হন। স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করার সময় অন্যান্য ছাত্রদের কাছে তিনি হরহামেশা নাজেহাল হতেন। তাই স্থানীয় স্কুল ছেড়ে কুড়ি মাইল দূরে অবস্থিত রিয়ারডন হাইস্কুলে ভর্তি হন। তিনি ১৯৮৫ সালে বৃত্তি নিয়ে স্পোকানের গনজাগা ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরবর্তীসময়ে গনজাগা ইউনিভার্সিটির আইন ছেড়ে ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে ভর্তি হন। সেখানে তিনি আদিবাসীদের কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থের মধ্যে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ছোটগল্পের সংকলন ‘দ্য লৌন রেঞ্জার অ্যান্ড টন্টো ফিস্টফাইট ইন হ্যাভেন’ একটি। পরবর্তীসময়ে ১৯৯৮ সালে চলচ্চিত্র (স্মৌক সিগন্যাল) নির্মাণ করা হয় এবং তিনি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা ও প্রযোজনা করেন। একই বছর চলচ্চিত্রটি ‘অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অ্যান্ড ফিল্মমেকার ট্রফি’ অর্জন করে। আমেরিকার উল্লেখযোগ্য পনেরটি উপন্যাসের মধ্যে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘রিজারভেশন ব্লুজ’ ১৯৯৬ সালে ‘আমেরিকান বুক অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। প্রথম কিশোর উপন্যাস ‘দ্য অ্যাবসলিউটলি ট্রু ডায়েরি অব অ্যা পার্ট-টাইম ইন্ডিয়ান’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি একই বছর ‘ইউএস ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ইয়ং পিপলস্ লিটারেচার’ এবং ছোটগল্প ও কবিতা সংকলনের জন্য ২০০৯ সালে লাভ করেন ‘পেন/ফকনার অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন’। ‘দ্য টাফেস্ট ইন্ডিয়ান্স ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ (১৯৯৭) এবং ‘টেন লিটল ইন্ডিয়ান্স’ (২০০৪) তাঁর অন্য ছোটগল্প সংকলন। তিনি নয়টি কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা। এছাড়া তিনি ‘২০১৫ বেস্ট আমেরিকান পোয়েট্রি’ সংকলনের অতিথি সম্পাদক ছিলেন। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে আমেরিকার আদিবাসীদের জীবনের হতাশা, দারিদ্র্য, উগ্রতা এবং তাদের অত্যধিক মদ্যপান করার প্রবণতা। বর্তমানে তিনি সপরিবারে সিয়েটলে বসবাস করেন।

গল্পসূত্র : ‘প্রতিমাপূজা’ এবং ‘নির্ধারিত আয়’ গল্প দুটি শারম্যান আলেক্সির ‘আইডোলট্রি’ এবং ‘ফিক্সড্ ইনকাম’ গল্পের অনুবাদ। ‘প্রতিমাপূজা’ গল্পটি প্রথমে ‘ন্যারেটিভ ম্যাগাজিন’-এর ২০১১ সালের বসন্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীসময়ে গল্পটি লেখকের ‘ব্লাসফেমি’ গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে ‘নির্ধারিত আয়’ গল্পটি ২০১৬ সালের ১৯ নভেম্বর ‘দ্য রামপাস’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে।