সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কি সংবিধান সংশোধন করা যায়? এই ইস্যু নিয়ে বিতর্ক থাকলেও দেশে এ পর্যন্ত দু’বার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। যদিও সংবিধানের বিধান অবৈধ ঘোষণার রায় মানেনি ভারতীয় পার্লামেন্ট। সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ৩২ বছর আগে অবৈধ ঘোষিত একটি অনুচ্ছেদ এখনো সংবিধানে বহাল রেখেছে দেশটির পার্লামেন্ট-লোকসভা।
এদিকে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট দুটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তি অস্বীকার করে এবং সংবিধান থেকে তা বাতিলের নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ মান্য করে সরকার সংবিধান থেকে সেগুলো মুছে দেয়। আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আদালতের নির্দেশে সংবিধান সংশোধন হলে ভবিষ্যতে দেশে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে দু’বার সংবিধান সংশোধন করে তার কপি পুনর্মুদ্রণ করা হয়। প্রথমবার এ ঘটনা ঘটে সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের শাসনামলে। এরশাদ সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম এবং বিভিন্ন জেলায় হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের জন্য সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনেছিল। অষ্টম সংশোধনী আইন পাশের পর ১৯৮৮ সালের ৩০ জুন সংবিধানের মুদ্রিত কপি প্রকাশ করা হয়। এই অনুচ্ছেদকে সংবিধান পরিপন্থি দাবি করে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের এই সংযোজনকে অসাংবিধানিক ও অকার্যকর ঘোষণা এবং ১৯৮৮ সালের ৩০ নম্বর আইনের ৫ ধারা বলে প্রতিস্থাপিত ১০০ অনুচ্ছেদকে অবৈধ ঘোষণা করে। এই রায়ের পরই ১৯৮৮ সালে ১০০ অনুচ্ছেদকে বাদ দিয়ে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে তত্কালীন সরকার।
২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে দ্বিতীয়বার সংবিধান পুনর্মুদ্রণ করে। পঞ্চম সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জের মামলায় ২০১০ সালের ২৭ জুলাই আপিল বিভাগ ওই সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর কিছুদিন পর তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক অবিলম্বে সংবিধান পুনর্মুদ্রণের নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের পর সংবিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধন হয়ে গেছে। এখন সরকারের উচিত অবিলম্বে মুদ্রিত কপি প্রকাশ করা।’ এ নিয়ে সরকারের ভেতর ও বাইরে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকার আদালতের নির্দেশে কিছু বিধান সংযোজন, বিয়োজন ও পরিবর্তন করে সংবিধান পুনর্মুদ্রণে বাধ্য হয়।
তবে ভারতে সংবিধান সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় না মানার নজির আছে। ৩২ বছরেও সংবিধানের একটি বিধান অবৈধ ঘোষণার রায় মানেনি ভারতের লোকসভা। প্রসঙ্গত, ১৯৭৬ সালে ভারতীয় লোকসভায় পাশ করা হয় সংবিধানের ৪২তম সংশোধনী। ওই সংশোধনীতে সংবিধানের ৩৬৮ অনুচ্ছেদের সঙ্গে ৪ ও ৫ দফা যোগ করা হয়। এতে বলা হয়, “৪২তম সংশোধনী এনে যা যা পরিবর্তন আনয়ন করা হয়েছে তা কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এছাড়া যেকোন বিধান পরিবর্তনের ক্ষমতাও রয়েছে সংসদের।” এই সংশোধনী আনয়নের চার বছর পর ১৯৮০ সালে তা চ্যালেঞ্জ করা হয়। যা মিনার্ভা মিলস লি. বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া নামক মামলা নামে পরিচিত। এই মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, “সংসদ যে সংশোধনী এনেছে তা অসাংবিধানিক ও মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থি ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো।” যেটি এআইআর-১৯৮০ সুপ্রিম কোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এ রায় আজ পর্যন্ত মানা হয়নি। সংসদ ৩৬৮ অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করেনি। ভারতের আইন প্রণেতারা মনে করেন, এটি সংসদের উপর বাধ্যতামূলক নয়।
প্রসঙ্গত, আমাদের দেশে সংবিধান কিভাবে সংশোধন করতে হবে তা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত রয়েছে। এ সম্পর্কে ১৪২ (১) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “এই সংবিধানে যা বলা হইয়াছে তা সত্ত্বেও (ক) সংসদের আইন দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে।” এ সম্পর্কিত ১৪২ (আ) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত না হইলে অনুরূপ কোন বিলে সম্মতিদানের জন্য তা রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপিত হইবে না।” সংবিধানের এইরূপ স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের নির্দেশে দেশে দু’বার সংবিধান সংশোধন হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে সংবিধান সংশোধিত হতে পারে কিনা এই ইস্যুতে যখন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবীদের মধ্যে বিতর্ক চলছিলো, বর্তমান স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সংবিধান সংশোধনের কর্তৃত্ব আদালতের ওপর ন্যস্ত করা হলে গণতন্ত্র ব্যাহত হতে পারে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের কাজ সংসদের। এ দায়িত্ব আদালতকে দিলে ভবিষ্যতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কেবল সংবিধান সংশোধন নয় দুটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক চুক্তিকে অস্বীকার করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এর একটি হলো—১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর তত্কালীন তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল কর্তৃক প্রণীত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা এবং সেই অনুযায়ী সংবিধানের একাদশ সংশোধন আইন প্রণয়ন।
ওই সংবিধান সংশোধন আইনে জাতীয় পার্টি ছাড়া দেশের সকল রাজনৈতিক দল সমর্থনসূচক ভোট দিয়েছিলো। ওই বিলে বলা হয়েছিলো, “যেহেতু অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক সরকার অপসারণ করিয়া একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য হন; এবং যেহেতু দলমত নির্বিশেষে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-কর্মচারী, পেশাজীবী সংগঠন, প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল ও সর্বস্তরের জনগণের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর তিনটি প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল ও প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান...।”
এটি সংবিধানের চতুর্থ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু ক্রান্তিকালীন বিধান হিসাবে তা সংবিধানে সংযোজনকে আপিল বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। এর পর সরকার সংবিধান থেকে তা ফেলে দিয়েছে।
একইসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো। আপিল বিভাগ তা অবৈধ এবং সংবিধান পরিপন্থি ঘোষণা করায় তাও সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।
