নবম জাতীয় সংসদে এ পর্যন্ত মোট ৫১টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি হচ্ছে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংসদের চার বছরে স্থায়ী কমিটিগুলো সর্বমোট বৈঠক করেছে এক হাজার ৬০৭টি। এ সময়ে ৩৬টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। এরমধ্যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আছে ২৮টি। অপরদিকে কমিটির বৈঠকে প্রায়ই কোরাম সংকট দেখা গেছে। তাছাড়া বৈঠক নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা বলেছেন।
কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী প্রতিটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে মাসে কমপক্ষে একটি করে বৈঠক করার কথা। বিধি মেনে চললে চার বছরে শুধু ৪০টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা এক হাজার ৯২০টি। সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী বৈঠক হয়েছে এক হাজার ২৮৮টি। অর্থাত্ ৬৩২টি বৈঠক কম হয়েছে। অপরদিকে মন্ত্রণালয়ের বাইরে বাকি ১১টি স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে ৩১৯টি। এসব কমিটি ৬৫টি কম বৈঠক করেছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা বলছেন। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সরকার দলীয় কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রথমদিকে কমিটির বৈঠকের প্রতি যে আগ্রহ ছিলো শেষদিকে এসে তাতে অনেকটা ভাটা পড়েছে। এর কারণ হচ্ছে, কমিটি যেসব সুপারিশ করে তার অধিকাংশই কাগজ-কলমে আটকে থাকে। কমিটির সুপারিশ ও পরামর্শ মন্ত্রণালয়গুলোর আমলে নেয়ার তেমন নজির নেই। তাছাড়া দীর্ঘ বৈঠকে উপস্থিত থেকে প্রায়ই ফলাফল শূন্য আসায় বৈঠকের প্রতি সদস্যদের এক ধরনের অনীহা দেখা দিয়েছে।
সংসদ অধিবেশনে কোন বিল উত্থাপিত হলে সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। আর সে বিল নিয়ে সদস্যরা কমিটির বৈঠকে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে রিপোর্ট চূড়ান্ত করেন। সরকার দলীয় সদস্যরা আরও জানান, সাধারণত বিলের ক্ষেত্রে দেখা যায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। বিলের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনার সময় বৈঠকে বিরোধী দলের সদস্যরা উপস্থিত থেকে তাদের মতামত দেন। বিলের রিপোর্ট চূড়ান্ত করার পরও তারা সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। কিন্তু সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত না থাকার কারণে তাদের দেয়া সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বিল পাসের সময় উত্থাপিত হয় না।
অবশ্য এ বিষয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা ভিন্নমত পোষণ করেন। বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বিরোধী দলীয় সদস্য বিএনপির ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ইত্তেফাককে বলেন, স্থায়ী কমিটি বিলের রিপোর্ট চূড়ান্ত করলেও তারা যেসব বিষয়ে আপত্তি করেন সেসব অগ্রাহ্য করা হয়। আর এ কারণে সংসদে পাসের জন্য বিল উপস্থাপনের সময় তারা সংশোধনী প্রস্তাব দেন। কিন্তু সংশোধনী প্রস্তাব দেয়ার পরও সংসদ অধিবেশনে না থাকার ব্যাপারে তিনি জানান, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার যেকোন বিল সহজেই পাস করিয়ে নেয়। যেখানে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলের রিপোর্ট চূড়ান্ত করার সময় বিরোধী দলের সদস্যদের মতামত উপেক্ষিত হয়, সেখানে বিল পাসের সময় সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থেকে কোন সুফল পাওয়া যাবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিলের ওপর বিরোধী দলের সদস্যদের আনীত সংশোধনী প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যাবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সর্বশেষ জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির দিন স্থায়ী কমিটির পূর্বনির্ধারিত বৈঠক কোন কারণ ছাড়াই স্থগিত করা হয়। পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর দিনে স্থায়ী কমিটির বৈঠক না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কমিটির সরকার দলীয় সদস্যরা। তাছাড়া কমিটির বৈঠকে বিলের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ কোন এজেন্ডা থাকে না। কুইক রেন্টাল খারাপ নাকি ভালো সে বিষয়ে বৈঠকে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, অপরদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তির ব্যাপারে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়েছিলো। আমরা চুক্তির কপি দেখতে চেয়েছি। ধন্যবাদ প্রস্তাব আসবে। কিন্তু চুক্তির কপি আসবে না। জনপ্রতিনিধিরা জানতে পারবেন না এমন বৈঠক থেকে কি আশা করা যায়? তারপরও সংসদকে কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সদস্যরা স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সরকার দলীয় সদস্য এবং শ্রম মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. ইসরাফিল আলম ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, বিএনপির সদস্য মাহবুব উদ্দিন খোকন নিয়মিত বৈঠকে আসেন না। তিনি আইন পেশায় ব্যস্ত থাকেন। আইন প্রণয়ন কাজে দিনভর সংসদে থাকার চেয়ে আদালতে থাকলে বেশি লাভ হবে এমন ধারণা থেকে তারা মাঝে-মধ্যে কমিটির বৈঠকে আসেন।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৪৮ বিধিতে বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেকটি স্থায়ী কমিটি মাসে অন্ততপক্ষে একটি বৈঠকে মিলিত হইবে।’
অর্থাত্ প্রতি মাসে কমপক্ষে একটি করে বৈঠকে বসার কথা সংসদীয় স্থায়ী কমিটির। আর সে হিসাবে প্রতিটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বছরে ১২টি করে চার বছরে ৪৮টি বৈঠক হওয়ার কথা। সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী মাত্র ১২টি মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রণালয়ের বাইরে তিনটি কমিটি কার্যপ্রণালী বিধি অনেকটা মেনে বৈঠক করেছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ৫৯টি বৈঠক করেছে, অর্থ এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ৫২টি, ৪৭টি মুক্তিযুদ্ধ, ৪৬টি পরিকল্পনা, খাদ্য এবং বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ ৪৩টি, তথ্য, বাণিজ্য এবং স্বরাষ্ট্র ৪২টি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত ৪১টি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটি ৪০টি করে বৈঠক করেছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের বাইরে ১০৬টি সরকারি হিসাব, ৭৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ৪০টি সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে।
সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী সবচেয়ে কম বৈঠক করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। মাত্র ১৪টি বৈঠক করেছে এ কমিটি। এর পরেই আছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, বৈঠক ১৮। প্রতিরক্ষা করেছে ২২টি বৈঠক। ২৪টি করে সংস্কৃতি, জনপ্রশাসন ও শিল্প, ২৫টি করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ২৬টি প্রবাসী কল্যাণ, ২৭টি শ্রম, ২৮টি সমাজ কল্যাণ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, ৩০টি পানি সম্পদ, ৩১টি যোগাযোগ, পরিবেশ ও বন, শিক্ষা, ৩৩টি যুব ও ক্রীড়া, ৩৫টি মত্স্য ও প্রাণি সম্পদ, অনুমিত হিসাব, ৩৬টি ধর্ম, ৩৭টি কৃষি, মহিলা ও শিশু, ৩৮টি বিমান ও পর্যটন, নৌ পরিবহন এবং ৩৯টি ভূমি।
নতুন মন্ত্রণালয় গঠন করার পর সেসবের মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও গঠন করা হয়। তথ্য ও যোগাযোগ পাঁচটি, রেলপথ দু’টি এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা কমিটি একটি বৈঠক করেছে। এছাড়া ১৯টি কার্য উপদেষ্টা, ১৭টি সংসদ লাইব্রেরি, ১৪টি সংসদ কমিটি এবং ১২টি বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে।
