আমাদের দেশের গ্রামের নারীদের জীবনে উপার্জনের এক নতুন ধারা সংযুক্তির মধ্যে দিয়ে তাদের জীবনে নতুন স্বপ্নের সূচনা ঘটালেন অন্যতম নারী উদ্যোক্তা সাদেকা হাসান সেজুতি। ই-কমার্সের সাহায্যে গ্রামের অপরিচিত নারীদের দিলেন এক নতুন পরিচয়। তাদের ‘ফিউচার সলিউশন ফর বিজনেস (এফ.এস.বি)’-এর ওয়েবসাইট ‘আমার দেশ আমার গ্রাম’-এর মাধ্যমে দেশে, বিদেশে নিজেদের পণ্য বিক্রি করার সুযোগ এনে দিলেন গ্রামের ঘরে ঘরে। ফলে বাংলাদেশ এক নতুনরূপে প্রকাশিত হল সারা বিশ্বের কাছে। সাদেকা হাসান সেজুতি স্থাপত্য বিদ্যায় তার পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন। তিনি ও তার স্বামী আতাউর রহমান এবং তাদের কিছু বন্ধু মিলে লন্ডনে ই-কমার্স ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান। সেখানে সফলতা পেলেও নিজ দেশের জন্য কিছু করার অনুপ্রেরণাই তাকে দেশে ডেকে আনে। ঘরে বসে গ্রামের নারী-পুরুষরা যেন তাদের নানা পণ্য বিক্রি করতে পারে সে লক্ষ্যে দাঁড় করান ‘আমার দেশ আমার গ্রাম’ প্রকল্প। এটিই বাংলাদেশে প্রথম ই-কমার্স ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, আমাদের দেশের গ্রামের ঘরে ঘরে নারীদের অনেক সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। নানা জেলার নারীরা নানা প্রকারের কাজে দক্ষ। প্রযুক্তির এ যুগে শুধুমাত্র যোগাযোগের অভাবে তারা যদি তাদের কাজের সঠিক মর্যাদা না পায় তা হবে খুবই দুঃখজনক। সেজন্য ‘আমার দেশ আমার গ্রাম’ মানুষের কাছে তাদের সুপ্ত প্রতিভা তুলে ধরেছে। সব ধরনের পণ্যের বিক্রেতাদের কাছে এনে দিয়েছে তার সঠিক প্রাপ্য। তাদের এই ওয়েবসাইট থেকে ই-কমার্সের সাহায্যে নকশি কাঁথা, জামদানি থেকে শুরু করে মধু, মাছ, সবজি সব ধরনের পণ্যই কেনা সম্ভব। এই ওয়েবসাইটে বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার উত্পাদকের পনের হাজারের মত পণ্য রয়েছে। যাদের বেশিরভাগই উত্পাদন করে নারী। যখন প্রথম ২০০৯ সালে সাদেকা হাসান সেজুতি ই-কমার্স ভিত্তিক এ প্রকল্প শুরু করেন সেসময় তার কাছে মনে হয়েছিল এটি তাদের জন্য হবে অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা। বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানকে সফল করতে হলে গ্রামের ঘরে ঘরে নিয়ে আসতে হবে প্রযুক্তির হাওয়া। কম্পিউটারে ডাটা এন্ট্রি থেকে শুরু করে কম্পিউটার চালানোর জন্য সব ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে তাদের, তবেই তার স্বপ্ন পূর্ণ হবে। গ্রামের ঘরে বসে যারা নকশিকাঁথা বানাচ্ছে তারা বুঝবে যে দেশে ও বিদেশে তাদের শিল্পের কি মূল্য। যে সত্য প্রযুক্তির এ যুগেও তাদের কাছে পরিষ্কার নয় তা প্রকাশিত হবে। তাই তাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নারী-পুরুষদের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামে গ্রামে ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রশিক্ষণের। পঞ্চাশ জনের বেশি নারীর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে যারা বর্তমানে গ্রামে গ্রামে অন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে সাহায্য করছে। ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের নারীরাও শিখছে বাংলা টাইপিং, ডাটা এন্ট্রি থেকে শুরু করে সবকিছু। নিজ হাতে লিখছে তাদের পণ্যের মূল্য, বুঝে নিচ্ছে তাদের প্রাপ্য। সাদেকা হাসান সেজুতি বলেন, শুরুতে এমন একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা যতটা কঠিন হবে মনে হয়েছিল সে তুলনায় প্রায় কিছুই হয়নি, কেননা স্থানীয়দের সহযোগিতা ও তাদের জানার আগ্রহ আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে সাতটি উপজেলায় ‘আমার দেশ আমার গ্রাম’ প্রকল্পটির ই-শপ চালু রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামের গৃহবধূরা যখন তার তৈরি শাড়ি বিক্রির মধ্যে দিয়ে তার প্রাপ্য অর্থ পেল, তখন ধীরে ধীরে তাদের এ ব্যাপারে আগ্রহ ও বিশ্বাস বাড়তে থাকল। এই কেনা-বেচায় তাদের সংস্থা পাঁচ শতাংশের মতো লাভ করে। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের সকল ই-শপ পর্যবেক্ষণ করছেন। এ পর্যন্ত তাদের প্রকল্প অনেক পুরস্কার পেয়েছে। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবে ‘পাওয়ার টু উইমেন’-এর আওতায় জাতিসংঘের যুব পুরস্কারও পেয়েছেন তারা। ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে সাদেকা হাসান সেজুতির স্বপ্ন, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় স্থাপিত হবে তাদের ই-শপ। প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকবে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস। যা একদিকে যেমন সময় বাঁচাবে, তেমনি গ্রামে গ্রামে নারীদের জন্য আয়ের দরজা খুলে দিবে। ই-শপ থেকে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, মাস্টার কার্ড এমনকি বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাহায্যেও যে কোন ধরনের পণ্য কেনা সম্ভব। তিনি বলেন, তাদের মোট ক্রেতাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ প্রবাসী বাঙালি। তাদের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজ দেশীয় পণ্য— হস্তশিল্পের চাহিদা তৈরি হচ্ছে বিদেশিদের কাছেও। বাংলাদেশের পণ্য বিলেত-আমেরিকার ক্রেতারা কিনে হবে ধন্য। আমাদের দেশের গ্রামের নারীদের পণ্যের বাজার নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা পাবে। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। এদেশের গ্রামের প্রকৃত নারী শিল্পীরা পাবে তাদের উপযুক্ত মর্যাদা এবং বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে সারা বিশ্বের কাছে। এটিই তার স্বপ্ন।
