সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশের লক্ষ্যে সৃজনশীল ও মননশীল বই প্রকাশের অঙ্গীকার নিয়েই মূলত বই প্রকাশনীগুলো যাত্রা শুরু করে। বাংলা সাহিত্যের সবক’টি বিষয়ে বই প্রকাশ করে বিশেষ করে শিশুসাহিত্য এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের প্রকাশের মাধ্যমে এই প্রকাশনীগুলো বাংলা সাহিত্য জগতে রাখছে তাদের অনন্য অবদান। আসছে বইমেলায়ও থাকবে এই স্বনামে খ্যাত বই প্রকাশনীগুলো বইয়ের সমাহার। তাই এবার আমরা এ প্রজন্মের কয়েকজন প্রকাশকদের নিয়ে সাজিয়েছি আমাদের এবারের সংখ্যা। পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। আয়োজনটি গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
র বী ন আ হ সা ন
স্বত্বাধিকারী, শ্রাবণ প্রকাশনী
শুরুটা তার ছড়া লেখা দিয়েই। চারটি ছড়ার বইও তখন বেরিয়েছে। সাংবাদিকতা করেছেন। ডিজাইন ও স্কিন প্রিন্টের কাজ করেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাথে ‘তৃণমূল’ পত্রিকায় সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। এসবের মধ্যে থেকে প্রকাশনায় আসা। ১৯৯৮ সালে ‘শ্রাবণ’ প্রকাশনীর যাত্রা শুরু। প্রথম থেকেই অন্য ধরনের প্রকাশনী হিসেবে দাঁড়াতে চেয়েছেন। ফলে রাজনীতির বই বা রাজনীতিক ধারার বই, অর্থনীতির বই অর্থাত্ আলাদা রকমের বই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশক হওয়ার আগে নিজে একজন ভালো পাঠক ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন তার আদর্শ প্রকাশক। এই পর্যন্ত ৩০০টির মতো বই প্রকাশ করেছেন। ২০১২ সালের একুশে বইমেলায় বের হচ্ছে ‘বদরুদ্দীন উমর রচনাসমগ্র’, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সংবাদ লেখা :শৈলী ও কৌশল’, ‘টেলিভিশন সাংবাদিকতা টেকনিক ও টেকনোলজি’, ‘মিনার মাহমুদের রচনা সংগ্রহ’। রবীন বলেন, ‘আমি লেখার মানের উপরেই পাণ্ডুলিপি নির্বাচন করি। আর পাঠক লেখকের বয়স দেখে বই কিনে না, বই কিনে লেখার মান দেখে। আর আমি রাজনৈতিক ধারার বই বেশি করি, আমার প্রকাশনী থেকে গণমাধ্যমের উপর বই বেশি প্রকাশ হয়েছে।’
এই প্রজন্মের প্রকাশক রবীন প্রজন্মকে বলেন, ‘বইয়ের বিচিত্রতা থাকা দরকার। সেটা আমাদের নেই। আমাদের এখানে ঔপন্যাসিক অনেক। কবিও অনেক। এর বাইরে লেখকের অভাব আছে। আর বই বিক্রির তেমন নেটওয়ার্ক নেই। ফলে বই বের করতেও ভয় পাচ্ছি। আর যেসব মননশীল বই মানুষের দরকার তা পাইরেট হয়ে যাচ্ছে। এতে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তবুও তরুণদের আমরা সুযোগ করে দিচ্ছি, আজকের যারা তরুণ লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তাদের অধিকাংশের প্রথম বই শ্রাবণ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে।’ আমাদের এখানে লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব মনোভাব গড়ে না ওঠার কারণ কী বলে মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘লেখালেখির ক্ষেত্রে যেটুকু সময় দেওয়ার কথা তরুণরা আজ সে সময় দিচ্ছে না। ফলে তরুণদের থেকে ভালো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যাচ্ছে না।’ বই প্রকাশনা শিল্পের জন্য যা করা দরকার তা আমরা করতে পারছি না বলে জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের প্রকাশকদের যে সংগঠন তাদের অনেক নেতারাই প্রকাশনাকে শিল্প হিসেবে দেখতে চায় না। তাই আজকে প্রকাশনা আমার কাছে তৃতীয় স্থানে। আগে গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তারপর প্রিন্টিং, তারপর প্রকাশনা।’ সাধারণ পাঠকদের কোন ধরনের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বেশি? উত্তরে বলেন, ‘আমাদের এখানে সাধারণ পাঠক খুব কম। এমনিতে উপন্যাসের পাঠক বেশি—এটা শুধু এখানে নয়, সারা পৃথিবীতে। আমার পাবলিকেশনের ধারাটাই অন্যরকম এবং সেটা আমি ধরে রাখতে চাই’। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বই বিক্রি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারি। ফেসবুক, ই-মেইল ইত্যাদিতে বইয়ের প্রচ্ছদ বই দামসহ নানারকম তথ্য দিয়ে এক ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়। আর আমাদের এখানে চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে যে একুশে বইমেলা সেই বইমেলার এখন আর আগের মতো পরিস্থিতি নেই। ’৯২ সালে যেখানে ঘুরে-ফিরে আড্ডা দিয়ে বইমেলা দেখেছি সেখানে এই ১৮ বছরে বই মেলার জায়গাটা আরও ছোট হয়ে গেছে। মানুষ বেড়েছে অনেক।’ রবীন মনে করেন, লেখক-পাঠক মত-বিনিময় হবে এজন্য অনেক বড় জায়গায় বইমেলার হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই বই যাতে সহজে মানুষ পায়। শিশুরা যাতে মজা পায়, অভিভাবকরা যাতে শিশুদের বই কিনে দেয়। তা ছাড়া শ্রাবণ বই বন্ধু সংঘ নামে একটা সদস্য সংঘ করছি। যাতে এক হাজার টাকা দিয়ে সদস্য হলে শ্রাবণ প্রকাশনীর বই সারা বছর ৩০% দামে কিনতে পারবে এবং অন্যান্য প্রকাশনীর বই ২৫% দামে কিনতে পারবে। সব প্রকাশনীর সেরা বইগুলো নিয়ে একশ বইয়ের বা আরও বেশি কিছু বইয়ের তালিকা নিয়ে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে বই বিপণনের জন্য প্রচারণা চালানো উচিত। এবং প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বই যাতে একজন পাঠক সহজেই কিনতে পারে সেই ব্যবস্থা করা উচিত।’
রবীন আহসান
ডাকনাম :রবীন
জন্ম তারিখ ও স্থান :২০ জুন, বরিশাল
মায়ের নাম :লুত্ফন নাহার
বাবার নাম :আব্দুর রাজ্জাক
প্রথম স্কুল :বরিশাল বিএম স্কুল
প্রিয় মানুষ :শামসুর রাহমান
প্রিয় পোশাক :জিন্স, টি-শার্ট
অবসর কাটে যেভাবে :লেখালেখি করে
সাফল্যের সংজ্ঞা :কাজ করে যাও, সফলতা আসবেই।
----
জ হি রু ল আ বে দী ন জু য়ে ল
প্রকাশক, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
অধুনালুপ্ত বাংলার বাণীর সাংবাদিক ছিলেন তিনি, কাজ করতেন পাহাড় আর চায়ের শহর শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে লিখতে লিখতে অনেক বন্ধুবান্ধব তৈরি হয়ে গেল তার ঢাকায়। এমনকি তার লিটল ম্যাগাজিনেও সারাদেশ থেকেই লেখকরা লেখা পাঠাতেন। এভাবেই এই সময়ের একজন সফল প্রকাশক জুয়েলের যাত্রা শুরু। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ঢাকায় এসে বন্ধু আদিত্য অন্তরকে সাথে নিয়ে শুরু করেন ইত্যাদি প্রকাশনা। প্রথম তারা বের করেছিলেন কবিতার বই। ওমর আলীর ‘রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’ এবং তানভীর আহমেদ হূদয়ের ‘পদচিহ্ন’ দিয়ে প্রকাশনার জগতে তাদের পথচলা শুরু। ২০০০ সালের শেষের দিকে জুয়েল ঢাকায় আসেন। চাকরি নেন বনানীর একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে। চাকরিতে মন বসাতে পারেন না জুয়েল। সারাক্ষণই সৃষ্টিশীলতা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সাহিত্যের ভাজপত্র ‘ইত্যাদি’ ও ‘নবযাত্রা’ ততদিনে লিটলম্যাগে উন্নীত হয়েছে। চাকরি করলেও ‘ইত্যাদি’র প্রকাশনা কিন্তু বন্ধ করেননি জুয়েল। ঢাকার বাংলাবাজারের একটি প্রেস থেকে লিটলম্যাগটি ছাপা হয়। বাংলাবাজারে সস্তায় ছাপা যায়, তাই বন্ধু আদিত্যের ‘নবযাত্রা’ও বাংলাবাজার থেকে ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেন জুয়েল। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? চাকরি যে আর ভালো লাগছে না জুয়েলের। বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকে জানালেন, তিনি আর চাকরি করবেন না, ব্যবসা করবেন। কিন্তু বাবা-মা তাতে সম্মতি দেয় না। তাদের এক কথা, ‘হয় চাকরি কর, নয় চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আস, কিন্তু ব্যবসা করার নামে টাকা নষ্ট করা চলবে না।’ আদিত্যের বাবা-মারও সম্মতি নেই ব্যবসার ব্যাপারে।
অনেকটা বিষাদক্লিষ্ট মনে ওরা দু’বন্ধু বাড়ি থেকে চলে আসেন। আগ-পিছু না ভেবে, বিকল্প কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে চাকরি ছেড়ে দিলেন জুয়েল।
চাকরি তো ছেড়ে দিলেন, কিন্তু কী করবেন এখন! সারাদিন বাংলাবাজারে আড্ডা দেন, রাতে মেসে এসে ঘুমান। এ ছাড়া আর কাজ নেই। এভাবেই চলছে তাদের দুজনের দিন।
২০০৩-এর জুলাই। জুয়েল তার ইচ্ছার কথা জানালেন বন্ধু আদিত্যকে। তা হচ্ছে, দু’জনে মিলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। আদিত্যও এ প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন। তখন মৌলভীবাজার থেকে এক লেখক এলেন একটি পাণ্ডুলিপি নিয়ে। পরামর্শ চাইলেন, তার পাণ্ডুলিপিটি বই আকারে কীভাবে বের করা যায়। জুয়েল ও আদিত্য সিদ্ধান্ত নেন, বইটি তারাই বের করবেন। সেদিন রাতেই মৌলভীবাজারের আরেক কবি বন্ধু মুজাহিদ আহমদের উপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিক হলো তার লিটলম্যাগের নামে—ইত্যাদি প্রকাশন। স্লোগানও ঠিক করা হলো, ‘আপনার সন্তানের হাতে বই তুলে দিন, সে বিকশিত হবে ফুলের সৌরভ নিয়ে।’ প্রথম বইটিতে প্রকাশনার নাম ছিল ‘ইত্যাদি প্রকাশন’। কিন্তু পরবর্তীতে এ নাম পরিবর্তন করে ‘ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ’ রাখা হয়। সেই থেকেই শুরু ইত্যাদির পথ চলা। ইত্যাদির লক্ষ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রকাশনাজগতে নতুনমাত্রা যোগ করে লেখক-প্রকাশকদের সম্পর্কের ভিত্তিতে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের হাতে মানসম্মত সৃজনশীল ও মননশীল বই তুলে দেওয়া। নবীন-প্রবীণ সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাধিক। ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল—এ দীর্ঘ সময়ে নানা ধরনের প্রকাশনার জন্য ইত্যাদির অর্জনও অনেক। বাংলা একাডেমী কর্তৃক ২০০৯ সালে সেরা মানের গ্রন্থ সম্মাননা এবং ২০১১ সালে সর্বাধিক মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশের জন্য শহীদ মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে প্রকাশিত বই দু’বার এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ লেখক পুরস্কার, একবার ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার জিতেছে। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ২০০৪ সাল থেকে নিয়মিত অংশগ্রহণ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বইমেলাতেও রয়েছে ইত্যাদির অংশগ্রহণ। ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকার নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক বাংলা উত্সবে এবং লন্ডনে বাংলা একাডেমী আয়োজিত বইমেলায় অংশগ্রহণ করে। এই হচ্ছে ইত্যাদির পথচলার গল্প।
জহিরুল আবেদীন জুয়েল
ডাকনাম :জুয়েল
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৯ ডিসেম্বর, মৌলভীবাজার
মায়ের নাম :সুরজাহান বেগম
বাবার নাম :জয়নাল আবেদীন
প্রথম স্কুল :আছিদ উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার বাবা-মা
প্রিয় উক্তি :মানুষ হয়ে বাঁচো
প্রিয় পোশাক :শার্ট ও প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে ও গান শুনে
সাফল্যের সংজ্ঞা :জীবনটা সার্থক করা, ন্যায়ের সঙ্গে বেঁচে থাকা।
---
মো. শা হা দা ত হো সে ন
স্বত্বাধিকারী, অন্বেষা প্রকাশনী
প্রকাশনা জীবন প্রথম শুরু করেছিলেন চার বন্ধু মিলে। কিন্তু দুই-তিন বছর যেতে না যেতেই নিজেকে সরিয়ে নিতে হয় তাদের কাছ থেকে। উদ্দেশ্য ছিল নিজের মেধাটাকে সৃজনশীলতায় আরও বেশি করে কাজে লাগানো। সেই থেকেই অন্বেষা প্রকাশনীর কথা চিন্তা করেন এর বর্তমান প্রকাশক মো. শাহাদাত হোসেন। ২০০৪ সালে প্রথম যাত্রা শুরু হলেও ২০০৫ সালে আহসান হাবিবের লেখা ‘লিখতে লিখতে লেখক’ বইয়ের মাধ্যমেই অন্বেষার প্রকাশনা কর্মকাণ্ডের শুরু হয়। তারপর একই বছর আরও প্রায় ডজনখানেক বই বের করে এর গতিকে বাড়িয়ে দেন এই প্রকাশক। তারপর থেকে এই কয়েক বছরে এই প্রকাশনী থেকে বের হয় প্রায় সাড়ে তিন শ’রও অধিক বই। ২০১৩ সালের জন্যও ইতোমধ্যেই ৪০টি বইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরির ‘রাষ্ট্রতন্ত্রের সমাজদ্রোহিতা’, সরদার ফজলুল করিমের আত্মজীবনী, সুরমা জাহিদের ‘একাত্তরের নির্যাতিত নারীদের ইতিহাস’-এর কাজ শেষ করে ফেলেছেন। বাকিগুলোর কাজ আসছে বইমেলার পূর্বেই সমাপ্ত করবেন বলে জানান এই প্রকাশক। পরিবারের কেউ এ ব্যবসায় জড়িত না থাকলেও মাধ্যমিক স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বাংলা বাজার বইয়ের দোকানগুলোতে প্রায়ই ঘুরতে যাওয়া হতো তার। এরই মাঝে বিভিন্ন লেখকদের সাথেও দেখা হয়ে যেত মাঝে মাঝে। সেটা ছিল শাহাদাত্ হোসেনের জন্য স্বপ্নের মতো। অনেক সময় অনেক লেখকের অটোগ্রাফের জন্যও যেতেন বিভিন্ন সংস্থাগুলোতে। সেই থেকে এ পেশার প্রতি ভালোলাগা, ভালোবাসার টান জন্ম নেয় এই প্রকাশকের মধ্যে। তারপর যখন আরও বেশি বুঝতে শিখলেন তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন প্রকাশনার সাথে জড়িত হবেন। লেখকরা যেমন সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন, তেমনি এই দর্পণকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেন প্রকাশকরা। এই ভাবনা থেকে পারিবারিকসূত্রে পাওয়া কাপড়ের ব্যবসা থেকে নিজেকে আলাদা করেন প্রকাশনা পেশাতেই জড়িয়ে পড়েন মো. শাহাদাত হোসেন। যদিও প্রকাশনা পেশাগতভাবে এখনও জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি তবুও এর ভবিষ্যত্ অনেক ভালো হবে বলেও স্বপ্ন দেখেন তিনি। প্রকাশনার এ জায়গায় বর্তমান সময়ে যেসব তরুণরা আসছেন তারা অনেক বেশি মেধাবী এবং সৃজনশীল বলে মনে করেন তিনি। সমাজকে, সমাজের মানুষকে ভালো কিছু দেওয়ার বোধ নতুনরা রাখে এবং তারা একটি বই প্রকাশনার প্রতিটি ক্ষেত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তাই এ ক্ষেত্রগুলোতে বর্তমানে অনেক বেশি মেধাবীদের আগমন ঘটছে। তবে সবকিছুর মাঝে প্রকাশনা বিষয়ের উপর কোর্স করার কোনো প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে নেই এই অভাব মনের মধ্যে তাড়া করে সব সময় এই প্রকাশকের। সেজন্য নতুনরাও যে উদ্যমে কাজ করার ক্ষমতা রাখে তার দিক থেকে অনেকটা পেছনে পড়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। দিন দিন আমাদের এ দেশে শিক্ষার হার বেড়ে চলছে তার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে ভালো বইয়েরও চাহিদা বাড়ছে। তবু এই বিক্রির হার প্রত্যাশাকে ছুঁতে পারছে না এমন ঘটনার পেছনের কারণগুলোর কথা তুললে প্রকাশকদের শতভাগ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মো. শাহাদাত হোসেন। লাইব্রেরিগুলোতে সৃজনশীল বই ছড়িয়ে দিয়ে এই অন্তরায়ের পরিসমাপ্তি সম্ভব হবে বলে মনে করেন অন্বেষা প্রকাশনীর এই কর্ণধার। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশনার উপর কোনো ডিগ্রি খোলার আহ্বান জানান শাহাদাত হোসেন। স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে সাজানো পারিবারিক পরিমণ্ডলে ভালো বই প্রকাশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নেশা জাগে তার মধ্যে প্রতিনিয়ত। তাই তো বইয়ের দোকান থেকে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে এটাকে একটা ইন্ডাস্ট্রির মতো করে গড়ে তোলার স্বপ্ন খেলে যায় এই প্রকাশকের চোখেমুখে। এ ছাড়াও লাইব্রেরি আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় তার মধ্যে সব সময় কাজ করে। সেজন্য অবশ্য তিনি এরই মধ্যে লাইব্রেরি আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করেছেন।
মো. শাহাদাত হোসেন
ডাকনাম : শাহাদাত
জন্ম তারিখ ও স্থান :৩০ সেপ্টেম্বর, মুন্সীগঞ্জ
মায়ের নাম :সানু বেগম
বাবার নাম :নূর মোহাম্মদ খন্দকার
প্রথম স্কুল :গাউদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :হুমায়ূন আহমেদ
প্রিয় উক্তি :পরিশ্রমেই সফলতা।
প্রিয় পোশাক :শার্ট ও প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :ভ্রমণ করে ও বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :এই ব্যাপারটা আপেক্ষিক, হয়তো প্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছানোকেই সাফল্য বলে।
----
এ কে এ ম তা রি কু ল ই স লা ম
প্রকাশক, তাম্রলিপি প্রকাশনী
সাহিত্যের একটা জগত্ আছে, সৃজনশীল মানুষদের এই জগতে আনাগোনা! সেই জগতের একজন বাসিন্দা সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ, তার ভাগ্নে ছেলেটা। ছোটবেলা থেকেই দারুণ দুষ্টু। পরীক্ষা এলে অবশ্য সবকিছু পালটে যায়, ক্লাসের সেরা ছাত্র সে তখন। মামার হাত ধরেই প্রকাশনার আদ্যোপান্ত দেখেছেন তিনি। দেখেছেন সেই সময়ের নামকরা লেখকদের। একটা সময় বড় হয়ে যোগ দিলেন মামার সাথে। সময় প্রকাশনীর হয়ে কাজ করলেন অনেকদিন। তারপর নিজেই শুরু করেন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাম্রলিপি। তিনি তারিকুল ইসলাম, এই প্রজন্মের একজন প্রকাশক।
তার শুরুটা একটু অন্যরকম। গণিত অলিম্পিয়াডের মুনীর হাসানের সাথে পরিচয় হলো বছর পাঁচেক আগে, তার উত্সাহে গণিত আর বিজ্ঞানের কিশোর উপযোগী কিছু বই দিয়ে যাত্রা শুরু তার। গণিত উত্সবে স্টল দিতেন তিনি, তারপর একসময় ছোটদের অনেক প্রিয় বইয়ের প্রকাশক হয়ে উঠলেন তিনি। তারপর বইমেলা। শিশু-কিশোরদের আগ্রহেই তাদের নিয়ে অনেক ধরনের বই প্রকাশ করা শুরু করলেন। এখন তারিকের খুব ভালোই লাগে যখন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মেলার বাইরেও তার বইয়ের খোঁজ করে। এবারও বইমেলায় জনপ্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘ইস্টিশন’, আনিসুল হকের ‘দখিন হাওয়ার দখিনা বারান্দা’, আহসান হাবীবের ‘ভয়ংকর একটা গল্প’; রকিব হাসানের বেশ কয়েকটা বই, এ ছাড়াও নতুন লেখকদেরও অনেক বই মিলিয়ে আসছে ত্রিশটারও বেশি প্রকাশনা। এত জমকালো ক্যারিয়ারের হাতছানি থাকা সত্ত্বেও তারিকুল বেছে নিলেন প্রকাশনার এক নির্মল বিনোদনের জায়গা। কেনই বা এই পেশা? কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি? বললেন, এই পেশায় সৃজনশীল আর সুন্দর মনের মানুষদের সাথে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আর যখন তিনি সময় থেকে কাজ করার প্রক্রিয়াটা দেখলেন, খুব আগ্রহ নিয়েই মামার উত্সাহ অনুপ্রেরণায় শুরু করলেন তাম্রলিপি। সেদিনের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, আজকের সফল অনেক প্রকাশনাই তার বড় প্রমাণ।
এই প্রজন্মের তরুণরা চাইলেই আসতে পারেন প্রকাশনাতে। খুব সুযোগ রয়েছে এখানে কাজ করার। সৃষ্টিশীল চেতনায় শিক্ষিত তরুণরা যতই এগিয়ে আসবে ততই সমৃদ্ধ হবে এই জগত্। নতুনদের অনেকেই খুব ভালো কাজ করছে। মান আর লেখার প্রয়োজনীয়তার মাপকাঠিতে বিচার করতে হবে সব পাণ্ডুলিপিকে। সুযোগ দিতে হবে জনপ্রিয়র পাশাপাশি নতুন লেখকদেরকেও। কী বই, কেন আর কাদের জন্য প্রকাশ করা হবে এই বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা কর উচিত। মনে রাখা দরকার একটা জাতির মৌলিক সত্তা তাদের ভাষা, আর সেই ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে অসাধারণ কিছু বই। এই মাধ্যমে কাজ করে যে কেউ খুব সহজেই দেশের জন্য কাজ করতে পারেন, কাজ করতে পারেন আমাদের আত্মমুক্তির জন্য, নতুন চেতনায় নবপ্রজন্মকে জাগানোর জন্য। তরুণ এই প্রকাশকের ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরে। শৈশবে আর বাচ্চাদের তুলনায় বেশ দুষ্টুই ছিলেন বলতে হয়। দিনমান কেটে যেত খেলার মাঠে। সান্ধ্য আইন ছিল বাড়িতে, সন্ধায় ঘরে ফিরে পড়তে বসতেন নিজেই। বাবা কৃষিকাজে নিয়োজিত আর মা গৃহিণী, এই পর্যায়ে আসার পেছনে তাদের অবদান অনেক। পরিবারের বর সন্তানকে তারা সাধ্যমতো সবটুকু দিয়ে চেয়েছেন প্রতিষ্ঠিত করতে। আজ তাদের প্রয়াস অনেকটাই সফল। আর এখন যিনি প্রতিদিন তার স্বপ্নের বুননের সাথে চলেছেন তিনি স্ত্রী তাসনুভা আদিবা সেঁজুতি। তাম্রলিপির একজন পরিচালকও তিনি।
তারিক স্বপ্ন দেখেন, এ দেশের শিশু-কিশোরদের জন্য অনেক অনেক বই বের হবে, তারা সেগুলো পড়বে, ঋদ্ধ হবে মাতৃভাষার অনন্যতায়। আমরাই সে পথ গড়ে দেব অনাগত আগামীর জন্য, তাম্রলিপি সে পথের অগ্রপথিক হবে, সেই কামনা নিরন্তর।
একেএম তারিকুল ইসলাম
ডাকনাম :রনি
জন্ম তারিখ ও স্থান :৬ জুন, টাঙ্গাইল
মায়ের নাম :রহিমা ইসলাম
বাবার নাম :একেএম জহুরুল ইসলাম মনি
প্রথম স্কুল :বাবুয়াটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :মুহম্মদ জাফর ইকবাল
প্রিয় উক্তি :আমাদের তিনটি মা—মা, মাটি ও মাতৃভাষা
প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :যদি কোনো ভালো কাজ করে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় সেটাই সফলতা।
