প্র জ ন্ম মু খ

ছন্দমালার কারিগর

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৬
অনিক খান। এই প্রজন্মের তরুণদের কাছে একটি পরিচিত নাম। ছড়াকার হিসেবে তার যেমন পরিচিতি, তেমনি উন্মাদ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হিসেবেও তার ভালো কাজের সুনাম রয়েছে। তার লেখালেখির অভ্যাসটা সেই ছোটবেলা থেকেই। ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে সমগ্রসহ ১২টি গ্রন্থ। আসছে একুশে গ্রন্থমেলাতেও প্রকাশ হবে তার নতুন একটি ছড়ার বই। তাকে নিয়ে লিখেছেন খালেদ আহমেদ শৈশবে অনেকেই যেমন স্কুলের খাতার পেছনে আঁকিবুকি করে, অনিক খান তেমনি খাতার শেষ পৃষ্ঠায় ‘লেখালেখি’ করতেন। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করার সুবাদে ছাত্রজীবনে বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি দৈনিকগুলোর শিশুদের পাতাগুলোয় লেখা পাঠাতেন। কিন্তু তাতে তার মন ভরতো না। মনের ভেতর ইচ্ছাঘুড়ি উড়ত আরও কিছু লেখার জন্য। তাই তো একবার সাহস করে কিছু নিজের লেখা ছড়া ডাকযোগে পাঠিয়ে দেন ‘উন্মাদ’ পত্রিকায়। তারাও দুম করে ওগুলো ছাপিয়ে ফেলেন। এতে ফলাফল দিনি আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলেন। দ্বিতীয় কিস্তির ছড়াটাও ছাপার পর সাহস রূপ নিল দুঃসাহসে। একদিন আরও কিছু ছড়া বুক পকেটে নিয়ে ঠিকানা খুঁজে হাজির হন ‘উন্মাদ’ পত্রিকার অফিসে। এরপরে কী ঘটল তা জানতে আরও কিছু অপেক্ষা করতে হবে, কারণ তার শুরুর আজও শেষ হয়নি বলা যায়! আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনের গল্পটা জানতে চাইলে অনিক খান বলেন, ‘উন্মাদ পত্রিকার সরাসরি আশ্রয় ও সম্পাদক আহসান হাবীবের বাড়াবাড়ি প্রশ্রয়ে আমার আজকের এই অবস্থানে আসা। তার সাথে খুবই ছোট আকারে যুক্ত হয়েছে, কোন মাধ্যম বেশি জনপ্রিয় সেটাকে হিসাবে না এনে নিজে যেটা মোটামুটি ভালো পারি শুধুমাত্র সেটার পেছনে লেগে থাকার ব্যক্তিগত অভিরুচি।’ লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রন্থ রচনা মাথায় রেখে কিছু লিখি না। আমার সারা বছর বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ছড়াগুলো নিয়ে বছর শেষে আমার একটাই বই প্রকাশিত হয়। তবে যেকোনো ছড়া লেখার সময় আমার নিজস্ব বক্তব্য অর্থাত্ আমি কী বলতে চাই আর কীভাবে কোন শব্দে, ছন্দে বললে পাঠক তা আনন্দ নিয়ে সহজে গ্রহণ করতে পারবেন—এই বিষয় দুটো মাথায় রাখি।’ লেখা সম্পন্ন হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয় জানতে চাইলে অনিক খান বলেন, ‘মগজের ভেতর বিশৃঙ্খলভাবে হুটোপুটি করা শব্দগুলোর হাত থেকে রেহাই পাওয়ায় বুকের ভেতর থেকে ‘যাক বাবা, বাঁচলাম’ ধরনের একটি ছোট্ট স্বস্তির শ্বাস বেরোয়।’ তার লেখালেখির আদর্শ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কার্টুনিস্ট ও রম্য লেখক আহসান হাবীব। তিনি তার আশপাশে ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনাকে চোখের পলক ফেলার আগেই লেখার বা আঁকার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে পারেন।’ একটি বই প্রকাশের পর পাঠকদের কাছ থেকে আপনি কেমন সাড়া পান? তার ভাষ্যে, ‘যেহেতু একুশে গ্রন্থমেলা শেষে প্রকাশক মোটামুটি হাসি মুখেই কথা বলেন, মনে হয় বই প্রকাশ বিষয়ে পাঠক-ক্রেতার সাড়া ভালোই পাওয়া যায়। তবে ছড়া বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি তালির চেয়ে গালিকেই বেশি পছন্দ করি। কেউ আমার বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করলে মনে হয়, বাহ্, কেউ কেউ তো এখনও মনোযোগ দিয়ে আমার লেখা পড়ে! একযুগেরও বেশি সময় আগে দেশের একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়। সেটা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে লেখা একটি ‘খোলা চিঠি’। তবে প্রথম মৌলিক লেখা ছাপা হয় ‘উন্মাদ’ পত্রিকায়। ১৯৯৭ বা ৯৮ সালের দিকে হবে, ঠিক মনে নেই। ডাকযোগে চার লাইনের বেশ কিছু ছড়া পাঠিয়েছিলাম। সম্পাদক সেখান থেকে নির্বাচিত কিছু ছড়া ‘অনিকের শের’ শিরোনামে চিঠিপত্র কলামে ছেপে দেন। সেখানেই আমার সত্যিকারের শুরু। আমার প্রথম বই প্রকাশ করেন এক সময়ের ডাকসাইটে প্রকাশনী দিনরাত্রির মাহবুবুল আলম মাসুদ। এসএমএস কাব্যের সংকলনটির নাম ‘ভালোবাসার কয়েক লাইন’। বইটির পরপর বেশ কয়েকটি সংস্করণ বের হয়।’ এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সমগ্রসহ ১২টি। আসছে একুশে গ্রন্থমেলাতেও প্রকাশ হবে তার নতুন একটি ছড়ার বই। অনিক খানের ছাপার অযোগ্য ছড়ার সংকলন ‘অন্য অনিক’ শিরোনামে বইটি প্রকাশ করবে উন্মাদ প্রকাশনী। একজন লেখক হিসেবে পাঠকসমাজের প্রতি আপনি কী দায়বদ্ধতা অনুভব করেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের কিছু জ্ঞানী-শিক্ষিত মুরুব্বি কোথা থেকে যেন দায়িত্ব পেয়েছেন তরুণ সমাজের মগজ ধোলাই করার। তারা যা পছন্দ করছেন, যাতে লাভবান হচ্ছেন সেটাই হয়ে যাচ্ছে সুশীল ও স্টাইল। আর তারা যা পছন্দ করেন না কিংবা যা দ্বারা তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন না সেটাই যেন অনুচিত ও ‘খ্যাত’। একজন লেখক হিসেবে আমি মনে করি আমার একটি দায়িত্ব হচ্ছে তরুণদের বারবার মনে করিয়ে দেওয়া যে মহান সৃষ্টিকর্তা আপনাকেও একটি আলাদা মগজ ও হাত, পা, চোখ, কান সব দিয়ে পাঠিয়েছেন। অন্ধভাবে ভুল নায়কদের পিছু না নিয়ে নিজের বিশ্বাসগুলো বুকে আগলে ক্ষীপ্র গতিতে পথ চলুন। যদি সেই বিশ্বাস কারও সাথে মিলে যায় তো ভালো, না মিললেও ক্ষতি নেই। মিছিলের একজন হতে পারা ও নিজেই একজনের একটি মিছিল হওয়া দুটোই সমান বীরত্বের।’ গত বছরের নভেম্বরে তিনি ঢাকা আর্ট সেন্টারে আয়োজন করেছিলেন ‘এসএমএস কাব্যের এক্সিবিশন’। অনুষ্ঠানে প্রচার দর্শকের সমাগম হয়েছিল, কোনো প্রকার পাবলিসিটি ছাড়াই। জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন এবং এখনও হচ্ছেন। এবং সেসবের ওপর ক্ষেপে গিয়েই আরও এগিয়ে যাওয়ার খোরাক পাচ্ছেন। আর এই অবস্থা থেকে উত্রানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শ্রম দিয়ে সব সমস্যাই কাটিয়ে ওঠা যায়। শুধু সহযোদ্ধা ও কাছের মানুষের বিশ্বাসভঙ্গ ও অসহযোগিতার বেদনার স্মৃতি থেকে মুক্তি নেই। এসব ক্ষেত্রে একটাই উপায়, আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে কোনো পথপ্রদর্শক বা অনুগত অনুরাগীর তোয়াক্কা না করেই নিজের ভাঙ্গা পথে নিজেই ইট বিছিয়ে এগিয়ে চলা। তাই করেছি, করছি এবং করব।’ লেখালেখি এবং পেশা নিয়ে আপনার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনিক খান বলেন, ‘আমি নেশায় পেশায় দুটোতেই লেখক। এই মুহূর্তে ‘উন্মাদ’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক এবং এটিএন নিউজে ‘ইয়াং নাইট’ নামের একটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও পরিকল্পনাকারী। সেইসাথে রেডিও ফুর্তিতে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছি।’ দেশ ও সমাজ নিয়ে আপনার ভাবনা কী? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই পরিসরে বুঝিয়ে বলা অসম্ভব। তবে ছোট করে বলা যায় গায়ক মাকসুদুল হকের বাংলাদেশ নামের গানটির একটি লাইন বাংলাদেশ, আমি শত্রু চিনি মা’গো, তুমি ঘুমাও নির্ভয়ে।’