আর যেন একটি নদীও হারিয়ে না যায়

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৪
ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যায় পড়ার সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে অনেক নদ-নদী দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সারাদেশে নদ-নদীগুলোর ওপর যে দখল, দূষণ ও অত্যাচার চলছে তা দেখে বিস্মিত হয়েছি। এছাড়া পত্রপত্রিকায় নদ-নদী দখল-দূষণের খবর পাওয়া যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ছোটবেলায় পড়েছি এদেশে প্রায় ৭৩০টিরও বেশি নদ-নদী আছে। এদেশ নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু এখন নদীর সংখ্যা এবং নদীমাতৃক এদেশের বর্তমান অবস্থা কী তা ভেবে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। গৃহস্থালি ও কলকারখানার বর্জ্যে, নাব্যতা সংকটে চর পড়ে, নদীর তীরে বালু ব্যবসা, পাথর উত্তোলন ও দখলদারদের থাবায় নদ-নদীগুলো বিপন্ন হতে চলেছে। খুুলনার পাইকগাছা উপজেলার শিবসার শাখা গাংরখী নদীর এক কিলোমিটার দখল করে বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এতে কৃষকেরা নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে কয়েক হাজার বিঘা জমি কয়েক বছর ধরে অনাবাদি পড়ে রয়েছে। চর পড়ে বাগেরহাটের এক সময়ের খরস্রোতা রামপাল নদ এখন মৃতপ্রায়। নাব্যতা সংকটে নদের এমন অবস্থা হয়েছে। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারীতে ধরলা নদীর তলদেশ থেকে পাথর আর বালু তুলে নদীর বুকেই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এখানকার সিঙ্গিমারী নদী থেকে পাথর তোলার কারণে নদীটি মৃতপ্রায়। কলকারখানা, আবাসিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যের কারণে কর্ণফুলী ও প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হালদা নদীর দূষণ বেড়েই চলেছে। রংপুরের ঘাঘট নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা কয়েক ফুট দীর্ঘ বাঁধ দিয়েছেন। ফলে নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়া ছাড়াও কয়েকটি ইঞ্জিন দিয়ে বালু তোলায় সেখানকার তীরবর্তী ফসলের খেত ভেঙে যাচ্ছে। বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীর দখল করে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। নদীর তীর জেগে ওঠার আগেই তা দখলদারদের আয়ত্তে চলে যাচ্ছে। ফলে নদী ছোট হয়ে যাচ্ছে। যতোই দিন যাচ্ছে অবৈধ দখলদারদের থাবায় বগুড়া শহরের করতোয়া নদী তার প্রশস্ততা হারাচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের কবজায় গেছে নদীর অনেক জায়গা। এছাড়া বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছিতে সেতুর নিচের বাঙ্গালী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলা হচ্ছে। ফলে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। সিলেটের কানাই ঘাটের সীমান্ত নদী লোভাছড়ার তীর খুঁড়ে অবৈধভাবে পাথর তোলা হচ্ছে। ফলে নদীভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদী চর পড়ে মরা খালের মতো হয়ে গেছে। মূলত নাব্যতা সংকটে নদীটির এ অবস্থা। বরগুনার বিষখালী নদীর মোহনা হট ভাটার দখলে চলে গেছে। এছাড়া চরের জমি দিনের পর দিন দখলের ফলে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়ে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। নরসিংদীর পলাশে শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বালু মহাল। এতে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খনন কার্যের অভাবে কপোতাক্ষ নদের অবস্থা সংকটজনক। নদের পানিধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রতিবছর বন্যায় পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষের দীর্ঘসময় ধরে দুর্ভোগে থাকতে হচ্ছে। দখল আর দূষণে বুড়িগঙ্গা নদীর জীববৈচিত্র্য ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। শিল্পবর্জ্যে আর গৃহস্থালির বর্জ্যে বুড়িগঙ্গার পানি বিষ হয়ে গেছে। কলকারখানার বর্জ্যে, পলিথিন ও মনুষ্য বর্জ্য জমা হয়ে বুড়িগঙ্গার তলদেশে প্রায় ১০-১২ ফুট স্তর জমেছে। কয়েকদিন আগে পত্রিকায় পড়লাম নাব্যতা হ্রাস পাওয়ায় গত সাত বছরে খুলনা বিভাগের ১১টি নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে খনন না হওয়ায় পলি জমে এগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। যাতে নৌপথে চলাচলকারী এই বিভাগের চার জেলার প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এর ফলে সড়কপথে মালামাল পরিবহন ও যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকাও হুমকির সম্মুখীন । পলি পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের অবস্থা মরা খালের মতো। ফলে পরিবেশসহ কৃষি আবাদে নেমে আসছে চরম বিপর্যয়। ক্ষমতাশালী এক শ্রেণির মানুষের নদী দখলের লোভ-লালসা, দীর্ঘদিন ধরে খননকাজ না হওয়ার ফলে নাব্যতা সংকট এবং মানুষের অসচেতনতার ফলে নদ-নদীগুলোর এই অবস্থা। দেশের নদী, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাভূমি দখল ও দূষণের শিকার হচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। প্রাকৃতিক পরিবেশ এভাবে কত যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেই ক্ষতির নেতিবাচক প্রভাব যে কত বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী—এ নিয়ে জনসচেতনতার বড় অভাব দেখা যাচ্ছে। অনেক শিল্পকারখানার বর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই, কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। অনেক সময় বর্জ্য নিষ্কাশনের এই সুবিধার কথা ভেবেই বুঝি কলকারখানাগুলো স্থাপন করা হয় নদীর তীরে। মনে রাখা দরকার , প্রাকৃতিক সম্পদ নদ-নদীগুলো সুপেয় পানির উত্স, ব্যবসা-বাণিজ্যের উত্স, মত্স্য সম্পদের উত্স, চাষাবাদের উত্স, ভ্রমণের উত্স, যোগাযোগের উত্স, এককথায় জীবনধারণের উত্স। সুদূর ভবিষ্যতে জনপদ নগরগুলোর বিপুল পানির চাহিদা পূরণ করতে হবে নদীগুলো থেকে। কারণ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনক মাত্রায় অনেক নিচে নেমে গেছে। লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারীসহ সর্বস্তরের নাগরিকদের মধ্যে নদী রক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি ও চেতনায় পুরোপুরি শুদ্ধতা না এলে নদ-নদী রক্ষার কার্যক্রম দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে। জীবন-জীবিকা, কৃষি আবাদসহ সর্বোপরি এই অঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে নদ-নদীগুলো বাঁচানো জরুরি। আর যেন একটি নদীও হারিয়ে না যায়—এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা দরকার। আসুন নদী বাঁচাই আমরা বাঁচি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়