প্রান্তিক উপজেলা আড়াইহাজারে নদী-নালা ও খাল-বিলে মত্স্য সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। বড়শি বা জাল ফেললেই পাওয়া যেত নানা প্রকার মাছ। বর্তমানে তেমন একটা মাছ পাওয়া যায় না। পরিবেশগত পরিবর্তন ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ড সম্প্রসারিত হওয়ায় মাছের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে মাছের জৈবিক এবং বাস্তুসংস্থানগত সমস্যার সৃষ্টি হয় বহু জাতের মাছের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। উপজেলায় মাছের প্রধান প্রাকৃতিক উত্স মেঘনা নদী। প্রতিবছর মেঘনার ১১৯০ হেক্টর এলাকায় ৮২৮ টন মাছ পাওয়া যায়, যা উপজেলার চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
উপজেলা মত্স্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, আড়াইহাজারে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৩২৩টি পুকুর রয়েছে (১০৩৬.১ হেক্টর জলআয়তন)। বার্ষিক মাছ উত্পাদন হয় ৩২৮৩ টন। প্রাকৃতিক উেসর তুলনায় বিভিন্ন মত্স্য খামারে মাছ বেশি উত্পাদন হয়। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে সে মাছ বিক্রি করা হয় চড়া দামে। প্রাকৃতিক উত্সগুলোতে মাছ কমে যাওয়ায় সংকট সৃস্টি হয়েছে। মানুষ সহজে মাছ কিনতে পারে না। উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন জানান, আড়াইহাজার উপজেলায় আগে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। কল-কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। খাল বেয়ে শেষ পর্যন্ত শিল্পবর্জ্য গিয়ে মিশছে নদীর পানিতে। দূষিত হওয়ায় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমছে। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। বর্তমানে ৫৮ জাতের মাছ বিলুপ্তির পথে। এ নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। মাত্র ৩ জন জনবল নিয়ে চলছে মত্স্য অফিসের কার্যক্রম। জনপ্রতিনিধিরা এ বিষয়ে কোন খবরই রাখেন না। নদী দূষণসহ নানা কারণে বিলুপ্ত হতে চলেছে দারকিনি, ঢেলা, ভাগন, শরপুঁটি বা স্বর্ণপুঁটি, মহাশোল, মহাশের, কালাবাটা, শিলং, দেশিপাঙ্গাস, বইচ্চা, ঘাউরা, দেশিরিঠা, গুজিআইর, চিনুয়া (চেউয়া), বাঘাইর, দেশি বা চিতল, নেপতানি, কুমিরেরখৈল, কুচিয়া, একথোটা, গজার, গুইচ্ছা, কাসখৈয়া, ভোল, খোকসা, গইন্না, ভাগনাবাটা, গোরামুইখ্খা, কালিবাউস, কালিয়া, টাটকিনি, রানীপুতুল, রানী, মধুপাবদা, কানি, বোয়ালীপাবদা, পাবদা, গাঙমাগুর, ছিকা, কাজলী, টেংরা, খইলসা, ফলি, খল্লা, মেনি, বেদা, নাপিত কৈ, বিশতারা, চান্দা, রাঙাচান্দা, বামুস, তিতপুঁটি, তারাবাইন, চিরকা ও বইচ্চা মাছ।
উপজেলা সিনিয়র মত্স্য কর্মকর্তার মতে, প্লাবন ভূমি সংকোচন, মাছের আবাসস্থল ধ্বংস, বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহার, বিষাক্ত বর্জ্য, পানি শুকিয়ে মত্স্য আহরণ ও ক্ষতিকর মত্স্য আহরণ সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে বহু জাতের মাছের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। আগাম বর্ষা মৌসুমে প্লাবনভূমিতে মাছ প্রজনন করে বংশধারা বজায় রাখে। রাস্তা-ঘাট অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণের ফলে নদী বা জলাশয় থেকে প্লাবনভূমিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মাছের অবাধ বিচরণ বাধাগ্রস্ত এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রজননে বিঘ্ন ঘটে মত্স্য জাতের সংকোচন ঘটছে। অধিকাংশ নদীর উত্পত্তিস্থল উজানের দেশ ভারতে। প্রতিবছর উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি নদীর তলদেশে জমা হয়। এতে নদীর গভীরতা হ্রাস পায় এবং পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটে, মাছের আবাসস্থল নষ্ট হয় যা মাছের বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ। আজকের ব্রহ্মপুত্র নদ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। পার্শ্ববর্তী উপজেলা সোনারগাঁয়ের বারদী হয়ে প্রভাকরদী এলাকা আড়াইহাজার উপজেলায় ঢুকেছে ব্রহ্মপুত্র। ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বালিয়াপাড়া এলাকার পর পাঁচগাঁও হয়ে একেবারে নরসিংদী পর্যন্ত নদ শুকিয়ে গেছে। কোথাও সরু খাল, কোথাও ধান চাষ হয় নদের বুকে। বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে ব্রহ্মপুত্রের মত্স্য সম্পদ।
