তিস্তায় পানি নেই, সেচ পাম্পে বিদ্যুতের নতুন সংযোগ নেই, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে আসন্ন বোরো উত্পাদন নিয়ে নীলফামারী জেলার চাষিরা ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন। এ সংকট সমাধানে কৃষি মন্ত্রণালয় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে প্রায় দেড় কোটি টন চাল উত্পাদন ব্যাহত হওয়ার আশংকা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। গত এক সপ্তাহ ধরে এ জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি রবি মৌসুমের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ নির্ভর বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই সেচ নির্ভর বোরো চাষাবাদে দেশের সর্ববৃহত্ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের রিজার্ভারে সংরক্ষিত পানি দিয়ে ৩০ ভাগ এবং পল্লী ও পিডিবির বিদ্যুত্ সঞ্চালন সেচ পাম্পের সাহায্যে ৩৫ ভাগ ও ডিজেল চালিত সেচ পাম্পের সাহায্য নিয়ে ৩৫ ভাগ জমিতে বোরো চাষাবাদ করা হবে। চলতি রবি মৌসুমের শুরুতেই এবার ডিসেম্বরে তিস্তা নদী ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পের রিজার্ভার পানি শূন্যতায় গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। এতে তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় সেচ নির্ভর বোরো চাষিরা বেকায়দায় পড়েছেন। জলঢাকা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের কৃষিজীবী নজরুল ইসলাম জানান, সরকার নতুন সেচ সংযোগ বন্ধ থাকায় গত ১ মাস ধর্ণা দিয়েও সংযোগ পাইনি। পরে বোরো চাষাবাদে ডিজেল পাম্প ক্রয়ের প্রস্ততি গ্রহণ করি। এ প্রস্ততিও ভেস্তে গেল ডিজেলের দাম লিটারে ৭ টাকা বৃদ্ধি করায়। সরকার লিটারে ৭ টাকা বৃদ্ধি করায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে লিটার প্রতি আরো ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১১ টাকা। এতে প্রতি বিঘায় বাড়তি খরচ গুণতে হবে প্রায় হাজার টাকা। এই সেচ নির্ভর বোরো চাষাবাদের নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠা যেত যদি ন্যায্যমূল্যে ধান-চালের বাজার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতো। এ অঞ্চলের প্রধান আবাদ চলতি সেচ নির্ভর বোরো চাষাবাদ। এ ত্রিমুখী সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমির দেড় কোটি টন চাল উত্পাদন ব্যাহত হবে। এছাড়া এই শীতে কোল্ড ইনজুরিতে অনেক বোরো চারা নষ্ট হয়েছে। ফলে অনেক প্রান্তিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এর উপর বিদ্যুত্ ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকে বোরো চাষাবাদে বিমুখ হয়ে পড়েছে।
তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে তিস্তায় ৪/৫ হাজার কিউসেক ও জানুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত আড়াই হাজার কিউসেক পানির প্রবাহ ছিল। এই পানি তিস্তা সেচ প্রকল্পের রিজার্ভারে সংরক্ষণ করে প্রায় ৩০/৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হয়েছে। এবার ডিসেম্বরে ১০/১৫ তারিখের মধ্যে তিস্তার পানি প্রবাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে তিস্তা সেচ প্রকল্পের ভবিষ্যত্ নিয়ে সংশয় কাটছে না এখানকার কৃষকদের। নীলফামারী পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির দায়িত্বপ্রাপ্ত জিএম এনামুল হক প্রামাণিক জানান, বোরো চাষে নতুন সংযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে বোরো চাষের নতুন সংযোগের আবেদন পড়েছিল ৬/৭ হাজার। এসব নতুন বিদ্যুত্ সংযোগ আবেদন কার্যকর হবে কিনা তা পরিষ্কারভাবে কিছু বলতে পারছি না। বোরো আবাদের ত্রিমুখী সংকট নিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এসএম সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেচ নির্ভর বোরো আবাদ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তিস্তায় পানি নেই, বিদ্যুতের সংযোগ নেই, ডিজেলের দাম বেশি হওয়ায় বোরো চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে।
