প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা আবারও ব্যক্ত করেছেন বিএনপি নেতারা। তারা বলেছেন, এ সরকার যদি নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে না নেয়, তাহলে যথাসময়ে আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। আর এর মধ্য দিয়ে রাজপথেই এ সংকটের সমাধান হবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কারাবন্দি সকল নেতা-কর্মীর মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার বিকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর বিএনপি আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তারা একথা বলেন।
সমাবেশে বিএনপির সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম বলেন, এ সরকারে ওপর এক দলীয় প্রেতাত্মা ভর করেছে। তারা মনে করছে র্যাব-পুলিশ সব তাদের, কেউই তাদের সরাতে পারবে না। এ প্রতাত্মা দূর করতে পাড়া-মহল্লায় দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, সব স্বৈরাচারই মনে করে-মেয়াদের একদিন আগেও ক্ষমতা ছাড়বে না, কিন্তু তারা টিকতে পারে না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, পরিষ্কার বলে দিতে চাই, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে না, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতেও দেয়া হবে না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকারের পতন ঘটানো হবে। তিনি বলেন, সরকার নার্ভাস হয়ে পড়েছে। মির্জা ফখরুলকে একটির পর একটি মামলায় আটকানো এবং রুহুল কবীর রিজভীকে দলীয় কার্যালয়ে অন্তরীণ রাখার ঘটনায়ই সরকারের নার্ভাসনেস প্রমাণ করে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌকায় ভোট চাচ্ছেন। দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন অবাধ হবে না, তা প্রধানমন্ত্রীই প্রমাণ করে দিয়েছেন।
মওদুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, শুধু ওবামা নয়, আপনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নামও মুখে আনবেন না। কারণ তারা কেউ আপনার সরকারের মত এত দুর্নীতি ও বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন করেনি, প্রশাসনকে আপনার মত দলীয়করণ করেননি। তিনি বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যেই মির্জা ফখরুল মুক্তি পাবেন।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার বলেন, দেশে এখন কোনো সরকার নেই। আছে একটি সন্ত্রাসী-লুটেরা গোষ্ঠী, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, তারা ফ্যাসিস্ট পার্টি। এ পার্টি আইনের শাসনেও বিশ্বাস করে না।
‘আগামী নির্বাচনেও জয়ী হয়ে ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপন করব’- সম্প্রতি খুলনায় এক জনসভায় দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্য সম্পর্কে এম কে আনোয়ার বলেন, আপনার এই প্রহসনের নির্বাচনের স্বপ্ন পূরণ হবে না, ইতিহাস দেখুন। আপনি যদি এতই জনপ্রিয় হন, এতই ভালো কাজ করে থাকেন, তাহলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন করতে এত ভয় কেন?
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, আওয়ামী লীগের আমির হোসেন আমু বলেছেন ‘বিএনপি কোনো রাজনৈতিক দলই নয়’, আমু ঠিকই বলেছেন, কারণ আওয়ামী লীগেই একসময় তার সম্পর্কে একটি স্লোগান ছিল ‘ছাত্রলীগ খাইছি, এবার আওয়ামী লীগকে খামু, আমি আমির হোসেন আমু’। আব্বাস বলেন, অনেকে বলেন আমরা নাকি আন্দোলন করতে জানি না। আন্দোলন বলতে যদি লগি-বৈঠা ও চাপাতি দিয়ে মানুষ হত্যা করা বুঝায়, তাহলে সেটি আমরা জানি না। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আন্দোলন করে কিভাবে স্বৈরাচারকে হটাতে হয় তা আমরা জানি। আন্দোলন কত প্রকার ও কি কি, বিএনপি উপযুক্ত সময়েই তা বোঝাবে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, এ সরকার জানে আগামীতে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের জামানতও বাঁচবে না। এজন্য একটি একতরফা নির্বাচন করে তারা আবার ক্ষমতায় যেতে চায়।
আওয়ামী লীগকে ‘চাপাতি বাহিনী’ আখ্যায়িত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই চাপাতি বাহিনীর হাতে দেশ ও গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। বিশ্বজিতের মত একদিন এদের হাতে গণতন্ত্রও নিহত হবে। তাই এখন থেকে দৌড় না দিয়ে এদের মোকাবেলা করার জন্য তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা। তিনি অবিলম্বে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের কারাবন্দি সকল নেতা-কর্মীর মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আব্দুল্লাহ আল নোমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আমান উল্যাহ আমান, ফজলুল হক মিলন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও আব্দুস সালাম প্রমুখ।
সমাবেশে বক্তৃতাকালে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব আমানউল্যাহ আমান একাত্তরে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মুক্তি দাবি করেন।
