সাঈদীর বিরুদ্ধে রায় যে কোন দিন

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:২৮
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপ-রাধে আটক জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিচার কাজ শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলির পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনের পর বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর মামলার বিচারিক কার্যক্রমের সমাপ্তি টেনে বলেন, মামলার রায় লেখার পর তা যেকোন দিন ঘোষণা করা হবে। এ নিয়ে দুটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুটি মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হলো। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে-২ গত ১৭ জানুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শেষে রায় অপেক্ষমাণ রাখে। এছাড়া গত ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃৃত সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মামলার রায় ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এদিকে, গতকাল শুনানির শেষ পর্যায়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের আনা ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার। অভিযোগের চার হাজার পৃষ্ঠার প্রতিটি পাতার প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, প্রত্যেকটি বর্ণ মিথ্যা। অন্যদিকে, যুক্তি উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছি। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছি। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। এ মামলায় সাঈদী ন্যায় বিচার পাবেন বলে আশা করছি। উল্লেখ্য, সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা দ্বিতীয়বারের মতো অপেক্ষমাণ রাখা হলো। গত বছরের ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে সর্ব প্রথম সাঈদীর মামলার বিচার শেষ হয়। ৬ ডিসেম্বর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে। ৯ ডিসেম্বর বেলজিয়াম প্রবাসী আইনজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে স্কাইপ কথোপকথনের খবর প্রকাশের পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপতি নিজামুল হক। ১৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ পুনর্গঠিত হওয়ার পর নতুন চেয়ারম্যান সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক পুনরায় উপস্থাপনের আদেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, গত ১৩ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ কার্যদিবসে রাষ্ট্রপক্ষে পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন কৌঁসুলি সৈয়দ হায়দার আলী। পরে ২০ থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত আসামিপক্ষে অভিযোগ ও ঘটনার বিষয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন সাঈদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। এরপর আরও ৩ কার্যদিবসে আইনি পয়েন্টে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। গত সোমবার আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রাষ্ট্রপক্ষে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন হায়দার আলী। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তিনি যুক্তি উপস্থাপন করেন। গতকাল আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, গত বছরের সাত ডিসেম্বর থেকে এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। সব কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটির রায় ঘোষণা জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদীর বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিত করাসহ ২০টি অভিযোগের মধ্যে ১৯টি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। বাকি একটি অভিযোগে দালিলিক সাক্ষ্য দিয়েছি। আশা করছি, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উত্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে, সাঈদীর আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এমনভাবে ব্যর্থ হয়েছে যে, তা ব্যর্থতার ইতিহাসেও সবার উপরে স্থান দেয়া যায়। তিনি বলেন, সাঈদী তিনবার অবিচারের শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রথমবার অবিচারের শিকার হয়েছেন। এরপর আমরা ১৫ সাক্ষী বিষয়ে সেফ হাউসের সমস্ত ডকুমেন্ট হাজির করে দেখিয়েছি যে, এসব সাক্ষীর অনেকে রাষ্ট্রপক্ষের হেফাজতে ঢাকায় ছিল। তাদেরকে ইচ্ছা করে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে হাজির করেনি। কিন্তু তারপরও ১৯ এর ২ ধারায় গৃহীত তাদের জবানবন্দি বাতিল করা হয়নি। এর মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বার অবিচারের শিকার হয়েছেন। এরপর বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কথোপকথন প্রকাশের পর আমরা তা ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুনরায় বিচার দাবি করেছি। কিন্তু পুনরায় বিচারের আবেদন গ্রহণ না করে তার প্রতি তৃতীয়বার অবিচার করা হয়েছে। আশা করছি, চতুর্থ বার তিনি ন্যায় বিচার পাবেন। তিনি বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান নিজামুল হক ও তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন যা কাজ করেছেন তাতে এ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নারী ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার ২০টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী ছিলেন আরবি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী এবং বাকপটু। এটাকে ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তিনি সখ্য এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেন। তার নেতৃত্বে এবং তার সহযোগিতায় পিরোজপুরের পারেরহাট বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুট, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।