মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তির জন্য বাছাই প্রক্রিয়া

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:২৯
অনেক বছর ধরেই সরকারি মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজগুলোর জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার প্রচলন চলে আসছে। গত কয়েক বছরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেখানেও এক ধরনের বাছাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। এমতাবস্থায় ২০১১-তে সরকারি এবং বেসরকারি সকল মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির জন্য সরকারিভাবেই একটি ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। সেই পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা এবং পছন্দক্রম অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাগ করে দেয়া হয়। ফলে এই পরীক্ষার পরিধি আরো বিস্তৃতিলাভ করে। ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে গত বছর মেডিক্যাল ও ডেন্টালে নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থিগণ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবি ছিল তারা ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং হঠাত্ করে পদ্ধতি পরিবর্তন করলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। এ দাবি আদায়ে তারা আন্দোলনে নামেন এবং শেষ পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই সে বছর শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভর্তি পরীক্ষার দিন বলেছিলেন, বিষয়টি নিয়ে আরো পর্যালোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সময়ের জন্য ভর্তির বাছাই প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হবে। পাবলিক বিশ্বদ্যািলয়গুলোতে প্রচলিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি হয়রানিমূলক হিসেবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে সমালোচিত। মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে এ ধরনের কোনো অভিযোগ শোনা যায় না। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বা কোচিং সেন্টারগুলোর দৌরাত্ম্য নিয়ে কথা উঠলেও এজন্য পরীক্ষা পদ্ধতিকে দায়ী করা চলে না। বিপুল সংখ্যক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়াটা দুর্ভোগ বলে বিবেচিত হলে সেটিও সহজেই দূর করা সম্ভব। ‘ভর্তি পরীক্ষা’ নাকি ‘নম্বরের ভিত্তিতে’ শিক্ষার্থী বাছাই করা হবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সামগ্রিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো, শহর-মফস্বল নির্ভেদে বাছাই প্রক্রিয়ায় যেন সবচে মেধাবীরাই স্থান পায়। পদ্ধতিটি হতে হবে স্বচ্ছ, নিপীড়নমুক্ত এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে গ্রহণযোগ্য। গত বছর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় (১০ নভেম্বর ২০১২) আমি যে হলের দায়িত্বে ছিলাম সেখানে পরীক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাই (মেডিক্যালে ভর্তি পদ্ধতির আলোচিত ইস্যুটি মাথায় রেখে) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোন পদ্ধতি-‘ভর্তি পরীক্ষা’ নাকি ‘নম্বরের ভিত্তিতে’ তাদের পছন্দনীয়। উত্তরে ৮০ ভাগ ছেলে-মেয়ে ভর্তি পরীক্ষা এবং ২০ ভাগ নম্বরের পক্ষে হাত তুলেন। মেডিক্যাল ও ডেন্টালে ভর্তির প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তনের আগে তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। আমি মনে করি, বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রচলিত পদ্ধতিটি সঠিক। তবে এ পদ্ধতির আরো উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। গত ভর্তি পরীক্ষার দিনে মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরীক্ষার্থীদের যে দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন, তা মেডিক্যাল বা ডেন্টালে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের বেলায় তেমন প্রযোজ্য নয়। বরং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের অসংখ্য পরীক্ষায় অংশ নিতে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সেটি সর্বমহলে সমালোচিত। সবচে বড় সংস্কার এখন সেখানেই প্রয়োজন। মেডিক্যালে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি উন্নয়নে যা করণীয়: এই পদ্ধতিতে যেহেতু ভর্তি পরীক্ষার ফলের ওপরই চূড়ান্তভাবে একজন শিক্ষার্থীর মেধা নির্ধারিত হয়, তাই একে আরো কার্যকরী করা প্রয়োজন। পরীক্ষার প্রচলিত সময় ১ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৩ ঘণ্টা করা উচিত। প্রশ্নের সংখ্যা বৃদ্ধি ও গুণগত মানোন্নয়নের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশ্নের ধরন পাল্টে এমসিকিউ পদ্ধতিতেই একজন শিক্ষার্থীর পঠিত বিষয়ে জ্ঞানের পরিধি আরো গভীরভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব। পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয়ে ছোট ছোট অঙ্ক জাতীয় প্রশ্ন দেয়া যেতে পারে, যেখানে সঠিক উত্তর পেতে একজন শিক্ষার্থীকে সমস্যার সমাধান করতে হবে। অর্থাত্ এমসিকিউ পদ্ধতি হলেও শুধু মুখস্থ করে উত্তর দেয়া যাবে না। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের গুরুত্ব বিবেচনা করে মোহাম্মদ কায়কোবাদ প্রশ্ন তৈরির ওপর রীতিমত গবেষণা করার সুপারিশ করেছেন (একটি পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে)। তার পরামর্শ বিবেচনার দাবি রাখে। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। গত বছর প্রায় সাড়ে ৮ হাজার আসনের জন্য ৫৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। এইচএসসি’র রেজাল্টের ভিত্তিতে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫ হাজারে নিয়ে আসাটা যৌক্তিক। কারণ, এইচএসসি’র রেজাল্ট অনুযায়ী ৩০ বা ৩৫ হাজারের নিচে যাদের অবস্থান তাদের পক্ষে ওপরের দিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে ডিঙিয়ে মেধা তালিকায় স্থান করে নেয়া প্রায় অসম্ভব। পূর্বের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর রেজাল্ট বিশ্লেষণ করলে এ বিষয়ে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। ভর্তির নীতিমালায় সবচে গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তনটি প্রয়োজন তাহলো এই পরীক্ষা শুধুমাত্র চলতি সেসনে পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমিত রাখা। আগের বছর পাস করেছেন এমন শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়ার প্রথা বন্ধ করা জরুরি। শুধুমাত্র এই ব্যবস্থাটির কারণে সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এক চরম অদক্ষতার সৃষ্টি হয়েছে। যারা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন তারা এর উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। আমি অঙ্কের হিসাবেই বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। অনেকেই হয়ত জানেন না, প্রতি বছর মেডিক্যাল বা ডেন্টালে যারা ভর্তি হন তাদের অর্ধেকের বেশি আগের বছর এইচএসসি পাস করা। ধরা যাক ২০১২-তে ভর্তিকৃত সাড়ে ৮ হাজারের মধ্যে এরকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ হাজার (সঠিক সংখ্যাটি বের করা সম্ভব)। এরা শিক্ষাজীবনের শুরুতেই এক বছর হারিয়েছেন এবং এদের কাছ থেকে চিকিত্সক হিসেবে দেশও এক বছরের কম সেবা পাবে। উপরন্তু এ সকল শিক্ষার্থী আগের বছর (২০১১) দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো না কোনো বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন এবং সেসব আসন খালি করে ২০১২-তে মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওই খালি আসনগুলো আর পূরণ করা সম্ভব হয় না। প্রতি বছরই এরকম সংখ্যক আসন খালি করে মেডিক্যালে শিক্ষার্থীরা চলে যান। অন্যভাবে বলা যায়, এদের কারণে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। শুধুমাত্র চলতি সেসনে পাস করা শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিধান থাকলে এ সমস্যাগুলো হতো না। মনে হতে পারে এ প্রথা তুলে দিলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার মাধ্যমে যারা ভর্তি হচ্ছেন তারা বঞ্চিত হবেন। ব্যাপারটি মোটেই তা নয়। ২০১২-তে যারা দ্বিতীয়বারে সুযোগ পেলেন তারা আসলে ২০১১-তে বঞ্চিত হয়েছিলেন তার আগের বছরের শিক্ষার্থীদের কারণে। ২০১১-তে যদি ৪ হাজার পুরোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না করা হতো তাহলে ২০১২-এর পুরোনো শিক্ষার্থীরা ওই বছরই (২০১১-তে) ভর্তির সুযোগ পেতেন। পদ্ধতিগত কারণেই তাদের এক বছর পর ভর্তি হতে হচ্ছে। এটি নানাভাবে জাতীয় অপচয়, যা অতিসত্বর বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে, বুয়েটে শুধুমাত্র চলতি সেসনে পাস করা শিক্ষার্থীদেরই ভর্তি করা হয়। এতে কারো কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। লেখক:অধ্যাপক, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।