ফেনী নদীতে ২৬টি পাম্প বসিয়ে ৫০ কিউসেক পানি নিচ্ছে ভারত

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৩
বাংলাদেশের সাথে কোন ধরনের চুক্তি ছাড়াই ভারত দক্ষিণ ত্রিপুরার সাবরুম মহকুমার ১৭টি সীমান্ত পয়েন্টে নোম্যান্সল্যান্ডে ২৬টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্চালিত লো লিফট পাম্প মেশিন স্থাপন করে ফেনী নদী থেকে প্রায় ৫০ কিউসেক পানি তুলে নিচ্ছে। সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে স্থাপিত পাম্প হাউজের মাধ্যমে একতরফা পানি তুলে নেয়ার ফলে পানি শুকিয়ে এখন ফেনী নদী ধুধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। মৃতপ্রায় এ নদী থেকে ভারত চুক্তির মাধ্যমে আরো ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তুলে নেয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে সম্মতি দেয়া হয়েছে। এদিকে ফেনী নদী থেকে এভাবে ভারত পানি প্রত্যাহারের কারণে মীরসরাই ও সোনাগাজী এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘মুহুরি প্রজেক্ট’ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। কারণ মুহুরি সেচ প্রকল্পের প্রায় ৭০ ভাগ পানির উত্সই হচ্ছে ফেনী নদী। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩১ জানুয়ারি ও ১ এবং ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠেয় যৌথ নদী কমিশনের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ফেনী নদীর পানি বণ্টন ইস্যু নিয়েও আলোচনা হবে। সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা যায়, ভারত দক্ষিণ ত্রিপুরার শিলাছড়ি থেকে আমলিঘাট পর্যন্ত ফেনী নদীর দুই দেশের অভিন্ন অংশের ১৭টি স্থানে সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে প্রায় ২৬টি লো লিফট পাম্প মেশিন বসিয়ে শুষ্ক মৌসুমে ফেনী নদী থেকে একতরফাভাবে প্রায় ৫০ কিউসেক পানি তুলে নিয়ে ব্যবহার করছে। ১১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফেনী নদীর বাংলাদেশ ভারতের সীমান্ত অংশ রয়েছে প্রায় ৭০ কিলোমিটার। দেখা যায়, নদীর জলপ্রবাহ থেকে ৩০-৫০ গজ দূরে ঢেউটিন দিয়ে তারা স্থায়ীভাবে পাম্প হাউজ নির্মাণ করে সেখানে বিদ্যুত্চালিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটর বসিয়ে নদী থেকে পানি তুলে নিচ্ছে। মোটর চালানোর জন্য প্রতিটি পাম্প হাউজে বিদ্যুত্ লাইন স্থাপন করে ট্রান্সফর্মার বসানো হয়েছে। মানুষের নজরে না আসার জন্য অধিকাংশ পাম্প হাউজ মাটির নীচে টিন অথবা পাকা দেয়াল তৈরি করে স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া পাম্প হাউজ থেকে নদীর পানি পর্যন্ত খনন করে মাটির নীচ দিয়ে ৬-৮ ইঞ্চি সিআই পাইপ বসানো হয়েছে। এসব পাম্প মেশিনের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করে সাবরুম মহকুমার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার একর ফসলী জমিতে সেচ দেয় ভারত। রামগড় পৌরসভার ফেনীরকূলের মারমা পাড়ার বিপরীতে ভারতের সাবরুমের দোলবাড়ি এলাকায়ও এ ধরনের টিনের তৈরি একটি পাম্প হাউজ রয়েছে। কাঁটাতারের বাইরে নোম্যান্সল্যান্ডে অবস্থিত এ পাম্প হাউজের পাশেই একটি উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার রয়েছে। ফেনীরকূলের বাসিন্দা আতাপ্রু মারমা বলেন, লোকজন যাতে বুঝতে না পারে সেজন্যই মাটির নীচ দিয়ে নদীতে পাইপ বসিয়েছে তারা। পাম্প মেশিনের মাধ্যমে অবিরাম পানি প্রত্যাহার করায় শুষ্ক মৌসুমে নদীটি প্রায় শুকিয়ে যায়। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে রামগড়স্থ ১৬ বিজিবি’র অধিনায়ক লে:কর্ণেল মোহাম্মদ নাঈম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে যেকোন স্থায়ী অবকোঠামো নির্মাণ অবৈধ।’ ১৯৮২ থেকে ২০০২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এ পাম্প হাউজগুলো স্থাপন করা হয়েছে। তখন ভারত কীভাবে এগুলো স্থাপন করেছে তা তার জানা নেই বলে জানান। তবে তিনি তার দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় ভারতের এ পাম্প হাউজগুলোর ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন বলে জানান। ফটিকছড়ির বাগানবাজার ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান একরামুল হক বাবুল বলেন, ‘ভারত জোর করেই নদী থেকে পানি তুলে নিচ্ছে। ২০০৩ সালের আগস্টে বাগানবাজারের সীমান্তবর্তী যতীরচরের বিপরীতে সাবরুমের ছোটখীল নামক স্থানে নদীর জলসীমা থেকে মাত্র ৩০ গজের মধ্যে নোম্যান্সল্যান্ডে বিএসএফের প্রহরায় একটি পাম্প হাউজ নির্মাণ করে। সীমান্ত আইন পরিপন্থি এ নির্মাণ কাজে তত্কালীন বিডিআর বাধা দিলে বিএসএফ তাদের ওপর গুলিও চালিয়েছিল।’ পাউবো’র খাগড়াছড়ির উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ভারত ফেনী নদীর পানিপ্রবাহের মাঝখানে ৫ মিটার ডায়া এবং ২০ মিটার গভীর পাকা কূপ নির্মাণ করে সিসি পাইপ বসিয়ে পাম্প মেশিনের সাহায্যে প্রথমে ঐ ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি তুলে নিতে চাইলেও বাংলাদেশ এ পদ্ধতিতে পানি দিতে আপত্তি জানায়।