শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণীর আঘাত মোকাবেলায় দেশের উপকূলীয় এলাকাজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই মোংলা ও চট্টগাম বন্দরের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখা রয়েছে। বহির্নোঙ্গরে পাঠানো হয়েছে সকল জাহাজ। সাগর প্রচণ্ড উত্তাল হয়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ রুটে সকল প্রকার নৌযান চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে তীরে ভিড়ছেন জেলেরা। উপকূলীয় এলাকায় লাল পতাকা টানিয়ে মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন আশপাশের নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। এতে আতঙ্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে উপকূলবাসীর মধ্যে। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বেড়িবাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টার বা আশ্রয় কেন্দ্র এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বনবিভাগসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং উপকূলবর্তী ১৯ জেলায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সকল কর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আব্দুল আজিজ আহমেদ বলেছেন, ঘূর্ণিঝড় ফণী মোকাবেলায় সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সকালে সাভার সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর বার্ষিক ফায়ারিং প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি নিয়ে ইত্তেফাক অফিস, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো আরো খবর:
চট্টগ্রাম অফিস: ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ছাড়াও সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর, রেড ক্রিসেন্ট, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলো নানা প্রস্তুতি নিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ মূল জেটি থেকে সব জাহাজ বহির্নোঙ্গরে পাঠিয়ে দিয়েছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের গভীর এলাকায় অবস্থানরত জেলেরা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার নিয়ে নগরের ফিশারি ঘাটসহ কর্ণফুলী তীরবর্তী বিভিন্ন ঘাটে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে।
বরিশাল অফিস: ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সবধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে বরিশালের বিভাগীয় প্রশাসন। এ লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে একটি কন্ট্রোল রুম। বরিশাল-ঢাকা রুটসহ অভ্যন্তরীণ সকল নৌ-রুটের যান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি প্রস্তুতিমূলক সভা করে সরকারের সকল বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
পটুয়াখালী: জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুপুরে দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় লাল নিশান উড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতামূলক সংকেত প্রদর্শন করা হচ্ছে। মাছধরা জেলে নৌকা ও ট্রলার উপকূলের বিভিন্ন খালে নিরাপদে আশ্রয় নিচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বরগুনা (উত্তর):জেলায় ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘূর্ণিঝড় উপকূল অতিক্রম না করা পর্যন্ত জেলার সকল সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবী কর্মী ও ৩৩৫টি আশ্রয় কেন্দ্র। এ দিকে, মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সর্বশেষ প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে ও পরামর্শ দিতে বিকেলে বরগুনার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলছেন।
বাগেরহাট: ফণীর প্রভাবে মোংলা বন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের নিজস্ব এলার্ট-থ্রি জারি করা হয়েছে। আর এই বিপদ সংকেত জারির পর থেকে মানুষের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মোংলা বন্দরে পণ্য ওঠা-নামার কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্দর জেটি ও আউটার অ্যাংকরেজে অবস্থানরত ১৬ জাহাজসহ সব ধরনের পণ্যবাহী লাইটার জাহাজকে বন্দরের পশুর চ্যানেল থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
খুলনা অফিস: ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার ৩২৫টি আশ্রয় কেন্দ্র ও ৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। পাশাপাশি জেলার সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
নোয়াখালী:ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপকূলীয় তিন উপজেলা হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জে ২৫১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র ও ৬ হাজার ৫৫৫ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২১০টি মেডিক্যাল টিম, সাড়ে চার হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার। জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস জানান, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় লাল পতাকা উত্তোলন ও মাইকিং করা হয়েছে।
ভোলা:জেলার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। খোলা হয়েছে ৭টি কন্ট্রোল রুম, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৮৩টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। ভোলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের দক্ষ ৫ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ মুহূর্তে শুকনো খাবার পরিবেশনের জন্য চিড়া ও গুড় মজুদ রাখা হয়েছে।
সাতক্ষীরা: জেলায় ১৩৭টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অফিসে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ফোন নম্বর ০৪৭১৬৩২৮১। জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, উপকূলীয় এলাকার জেলে-বাওয়ালীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় ৩২শ প্যাকেট শুকনা খাবার, ১১৬ টন চাল মজুদ করা আছে। জেলা দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ সভায় ১৫-২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা করে বলা হয়, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর সতর্ক সংকেত আসলে উপকূলীয় মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিতে হবে।
পিরোজপুর অফিস: বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে পিরোজপুর পৌর এলাকাসহ উপজেলা পর্যায়ে মাইকিং করে ঘূর্ণিঝড়ের বিপদসংকেত প্রচার করা হচ্ছে। জেলার সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিলসহ ২২২টি সাইক্লোন শেল্টার ও ১২৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। ৩৪৫ টন খাদ্য শস্য, ৪৮ বান্ডিল ঢেউটিন, ৭ লাখ ৪৫ হাজার নগদ টাকা, ২০০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ওষুধ ও ৬৫টি মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ভাণ্ডারিয়া:উপজেলা প্রশাসন এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে সকালে উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে সুপার সাইক্লোন ফণী মোকাবিলার জন্য আগাম প্রস্তুতি বিষয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ইউএনও ও পৌর প্রশাসক মো. নাজমুল আলমের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলাম মিরাজ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আওলাদ হোসেন, ইউপি চেয়ারম্যান হুমায়উন প্রমুখ।
