যিনি নিজের ভাষাকে সহজ, প্রাঞ্জল এবং সাবলীল ভাষায় গুছিয়ে পাঠকের সামনে তুলে ধরেন তাকেই আমরা সাধারণ অর্থে লেখক বলে থাকি। একজন লেখক বরাবরই তার দৈনন্দিনের দেখা অভিজ্ঞতাগুলো পাঠকের জন্য মেলে ধরেন। লেখকের চিন্তার গতিপ্রকৃতি সব সময়ই থাকে আর দশজন মানুষের মতোই স্বাভাবিক কিন্তু তার দেখার দৃষ্টিটি থাকে অন্যদের থেকে একেবারেই ভিন্ন, একজন লেখক তার জীবন যাপনের পাশাপাশি জীবন উদযাপন করেন ভাবনা এবং লেখালেখির খরস্রোতা নদীতে বৈঠা বেয়ে। এই প্রজন্মের তেমনই কয়েকজন লেখকদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। পুরো আয়োজনটি দেখুন পরের পৃষ্ঠায়। গ্রন্থনা এবং সম্পাদনা করেছেন রিয়াদ খন্দকার ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
পা র ভে জ হো সে ন
জগন্নাথে পড়েন তখন, দেয়াল পত্রিকা তৈরি করতে হবে! দায়িত্ব পড়ল ছেলেটার উপর, লেখালেখি করেননি কখনও তিনি। তার উপর অনেকগুলো লেখা সম্পাদনা করতে হবে, স্যার শওকত আলী এগিয়ে এলেন, তিনি তখন নামকরা ছোট গল্পকার। বললেন, কাজ শুরু করতে, যাবতীয় সহযোগিতা তিনি দেবেন! কে জানত আজকের এই প্রজন্মের একজন লেখকের জন্ম সেদিন দেয়াল ম্যাগাজিন তৈরির মধ্য দিয়েই। তিনি পারভেজ হোসেন, জেমকন সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী লেখক, এ সময়ের সফল একজন কথা সাহিত্যিক।
কেউ কেউ শুনলে ঈর্ষান্বিত হবেন হয়তো, যেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অজস্র বই দেখে পড়ার শখ জাগে আমাদের, এই সময়কার অসংখ্য শিশু-কিশোরের মনে আলোকিত মানুষ হতে চাওয়ার প্রচেষ্টা যে সুবিশাল লাইব্রেরি দেখে, সেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইগুলো এক যুগেরও বেশি সময় আগলে রেখেছেন তিনি। শুধু বই, বই আর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আটকে থাকলেন লাইব্রেরিতে। তখন করতেন ‘সংবেদ’ নামে একটি প্রকাশনা। সেখানে অনেকেই লিখত তাদের সময়কার, যাদের অনেকেই এখন গল্প লিখে সুনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৮৬ সালে ‘ক্ষয়িত রক্তপুতুল’ নামের ছোটগল্পের বই দিয়ে তার সাহিত্যের জগতে প্রবেশ। এরপর এক পা দু’ পা করে হেঁটে এসেছেন সাহিত্যের জগতটা। দেখেছেন কি অসম্ভব সুন্দর আমাদের এই চারপাশ, আর তাকে ঘিরেই তো গল্পের পট, অথবা কবিতার ছন্দ। আর সেই সুধা আহরণ করতে হলে চাই শিল্পীমন, চাই শিল্পের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এভাবেই তার লেখক জীবনের পথ পরিক্রমা জানালেন পারভেজ হোসেন। এবার বইমেলাতে বের হচ্ছে তার ‘ডুবোচর’, শুদ্ধস্বরের এই বইটি গল্পের।
নিজের একটা প্রেস আছে, সেখানে তিনি বই ছাপেন। আর যে প্রকাশনাটা আছে, সেখান থেকে বই বের করেন, নিজের ভাবনাই মাঝে মাঝে কখনও গল্প হয়ে ধরা দেয় তার বইয়ের পাতায়। এই তার বইয়ের দুনিয়া! বইয়ের সাথেই কাটিয়ে দেওয়া আলোকিত এই মানুষটা তাই নিজের এই পরিচয়টাই পছন্দ করেন—একজন লেখক তিনি! একজন বইয়ের কারিগর, পেছনের মানুষ। আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে নিয়মিত বসা থেকেই এই ভালোলাগাটা শুরু।
পারভেজ হোসেন মনে বলেন, ‘সময়টা প্রযুক্তির। তাই প্রযুক্তির ছোঁয়া আর সবকিছুর মতোই প্রকাশনাতেও এসেছে। অনেকেই লেখালেখি করছেন অনলাইনে, সেটা খারাপ নয়। তবে বই কখনোই হারিয়ে যাবে না। বই সে তো অমলিন। বিশ্বে যে রাষ্ট্র যতবেশি আধুনিকই হোক না কেন, বই তো হারিয়ে যায়নি। আমেরিকাতেও বিশাল বিশাল লাইব্রেরি আছে যেখানে রোবট এসে বই দিয়ে যায়, এই তো দুনিয়া। কল্যাণের পেছনেই তো প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে, তাই না? সুতরাং দিনকে দিন আমাদের লেখার মান সমৃদ্ধ হচ্ছে, নতুন নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের সেরা লেখাগুলো খুব সহজেই পড়তে পারছি আমরা। একটা নতুন বই হাতে নিয়ে পড়তে পারার যে আনন্দ সেটা তো আর খুব সহজ হারিয়ে যাওয়ার নয়।’
নতুনদের প্রসঙ্গে পারভেজ হোসেন বলেন, ‘তারাই তো ভবিষ্যত্, তাদের দিকেই তো তাকিয়ে থাকতে হয়। আমরা যে বেঁচে থাকি, অতীতকে আঁকড়ে ধরে বটে, তবে অবশ্যই ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হয়ে। তা না হলে আর জীবনটাতে বৈচিত্র্য থাকত না।’ সুতরাং নতুনদের নিয়ে অনেক আশাবাদি তিনি।
পারভেজ হোসেনের স্ত্রী মাশফিদা আখতার মালা একজন গবেষক, আর কন্যা ফারিসা ফারজিন স্কুলে পড়ছে। এই নিয়েই তো একজন লেখকের সুখের দুনিয়া। তিনি চান, এই সুখটা যুগ যুগ অমলিন থাক, অজস্র বইয়ের মাঝেই আসুক তার জীবনের শেষ দিন।
পারভেজ হোসন
ডাকনাম :পারভেজ
জন্ম তারিখ ও স্থান :১৮ জুলাই, ঝালকাঠি
মায়ের নাম :আনোয়ারা বেগম
বাবার নাম :এলএফএ খান
প্রথম স্কুল :সাউথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রিয় উক্তি :মানুষ তার আশার সমান বড়।
প্রিয় পোশাক :পায়জামা-পাঞ্জাবি
অবসর কাটে যেভাবে :গান শুনে, বই পড়ে
সাফল্যের সংজ্ঞা :কাজ আর কাজ।
----
রা হে ল রা জি ব
প্রিয় আজিজ স্যারের তত্ত্বাবধানে শৈশবেই তার অনেক অনেক ছড়া-কবিতার বই পড়া হতো। মাঝে মাঝে কালি-কলম নিয়ে বসে যেতেন কবিতা লিখবেন বলে। লিখেও ফেলতেন অনেক কিছু। কিন্তু শিল্পের বিচারে সেটা কবিতার মানদণ্ডে পৌঁছাক বা না পৌঁছাক, তার লেখকসত্তার জন্ম তখনই। স্থানীয়ভাবে তারা একটি সাহিত্য সংগঠন করতেন, সেটার নাম ছিল ‘কবি মানুষ’। কবি মানুষ শুরু থেকেই নিয়মিত লিটল ম্যাগাজিন বের করত। সেই সূত্রেই প্রসারিত হতে থাকল তাদের সাহিত্য সম্ভাবনা। তাদের মাঝেই সেদিন ছিলেন আজকের প্রতিভাবান লেখক ও কবি রাহেল রাজিব। ১৯৯৯ সালে কবি মানুষের তত্ত্বাবধানেই বের হয় তার প্রথম কবিতার বই ‘অবচেতন মনে আগুনের ছোঁয়া’।
রাহেল রাজিব মূলত সাংবাদিকতা দিয়ে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন। তারপর থেকে সেই লেখালেখিতেই নিজেকে আটকে রেখেছেন। সময়ের এই লেখক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, পাশাপাশি করে চলেছেন লেখালেখি। এবারের বইমেলাতে আসছে তার তিনটি বই। এর মধ্যে কবিতার বই ‘রাত্রিহর্ষক’ বের করছে কথাপ্রকাশ, ছড়ার বই ‘পাকাপাকি’ নিয়ে আসছে ত্রৈবদ্য প্রকাশনী, আর এ সময়কার প্রবন্ধ ‘সমকালীন কথাসাহিত্য :পাঠ উন্মোচনের খসড়া’ প্রকাশ করছে বিভাস। এই বইগুলোর সবই তার নিজস্ব চিন্তা আর দর্শনের প্রকাশ বলে মনে করেন তিনি। লেখকের আত্মতৃপ্তি তো সেখানেই, তারা তাদের মনের ভাবটা সহজ করে তুলে ধরতে পারেন সবার জন্য।
রাহেল রাজিবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, শিক্ষক ও লেখক, কোন পরিচয়ে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? তিনি বললেন, ‘লেখক পরিচয়েই তিনি বেশি স্বচ্ছন্দ। আর তার শিক্ষকতার বিষয়ও যেহেতু বাংলা, সেখানেও সাহিত্যের বিষয় নিয়েই তাই নাড়াচাড়া হয় সব সময়।’ সবমিলিয়ে বর্তমান জীবন নিয়ে যারপরনাই সন্তুষ্ট সে। সুখে স্বস্তিতে কেটে যাচ্ছে তার দিনকাল।
প্রজন্মের এই লেখক জানালেন, নতুনদের অনেকের মাঝেই লেখালেখির প্রতি তীব্র ঝোঁক থাকে। তারা শিল্প-সাহিত্যের সাথে সব সময়ই নিজেদের সম্পৃক্ত রাখেন। আর তাদের এই যে জানার তীব্র ইচ্ছা আর লেখার প্রতি টান, এর মাঝ থেকেই তো বেরিয়ে আসবে সুন্দর সুন্দর লেখা। তিনি মনে করেন, লেখালেখিটা আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হচ্ছে আমাদের দেশে। কেউ চাইলেই একজন লেখক হিসেবে পার করে দিতে পারেন তার জীবনটা।
আর সেই সুযোগটা আস্তে আস্তে আমাদের দেশে তৈরি হচ্ছে। অনলাইনে লেখালেখি করার সুবাদেও অনেক নতুন নতুন লেখক বেরিয়ে আসছে। যুগটাই যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তির, এদের থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার কোনো সুযোগ তো নেই, আর তাই অনালাইনের বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে দেখেন তিনি। অনলাইনের লেখার ভালো দিকগুলোও আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত বলে মত দিলেন রাহেল রাজিব। তরুণ লেখকদের এই বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। তাদের প্রথম থেকেই উচিত দেশি-বিদেশি ভালো ভালো লেখার সাথে নিজেকে পরিচিত করে তোলা। একটা ভালো বই পড়লেই কিন্তু ভালো একটা কিছু লেখার তাড়া অনুভব করি আমরা, আর তাই অনেক অনেক পড়তে হবে, দু-চোখ খোলা রেখে দেখতে হবে চারপাশ, উপলব্ধি করতে হবে সবকিছু।
লেখক রাহেল রাজিবের পারিবারিক জীবনটাও বেশ সুখের। বাবা গত হয়েছেন অনেকদিন, তিনি তার অনেক বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন সব সময়। মা গৃহিণী। চার ভাইবোনের মাঝে সবার বড় বলে রাহেলের অনেক দায়িত্ব ছিল সব সময়। তার স্ত্রী উমা বণিক পূবালী ব্যাংকে কর্মরত আর একমাত্র কন্যা নৈঋতা নীড়ের বয়স সাড়ে চার মাস। এই নিয়েই এই শহরে রচিত হয় তার প্রতিদিনের সুখের দিনলিপি। আর বাকি জীবনটা এভাবেই লিখে, পড়ে আর দু’চোখ ভরে দেখে কাটিয়ে দিতে চান তিনি।
ছবি দীপঙ্কর দীপু
রাহেল রাজিব
ডাকনাম :রাহেল
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৩ অক্টোবর, দিনাজপুর
মায়ের নাম :মায়া রাণী মণ্ডল
বাবার নাম :রাম চন্দ্র মণ্ডল
প্রথম স্কুল :কাটাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :আমার শিক্ষক আজিজ স্যার এবং ওরহান পামুক
প্রিয় উক্তি :সততাই সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা।
প্রিয় পোশাক :ফতুয়া
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, ঘুরে
সাফল্যের সংজ্ঞা :সততা আর পরিশ্রম।
----
ই ক বা ল খ ন্দ কা র
গ্রামের সেই দুরন্ত ছেলেটা তখন সবে স্কুলে পড়ে। ধান কাটার মৌসুমে তাদের উঠোন ভরে যেত নতুন ধানে। সময় পেলেই ছুটে বেড়াত ধানক্ষেতের দিগন্তজুড়ে। কোনো এক সকালে কাজের লোকেরা ধানের আঁটি এনে উঠোনে ফেলছিলেন ধপাস করে। ঘরে বসে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিল ছেলেটি। নতুন ধান কিংবা পাকা ধানে ভরা মাঠের দৃশ্য দেখে সে অভ্যস্ত হলেও সেদিন কেমন যেন অন্য রকম একটা ভালোলাগা কাজ করল তার মধ্যে। সামনের খাতাটা টেনে লেখা শুরু করল যা খুশি। অনেক কাটাকুটির পর একটা ছড়া লিখে ফেলল সে। ‘নতুন ধান’ নামের এই ছড়াটাই তার প্রথম লেখা। সেই ছেলেটাই বড় হয়ে ভালোবেসে লেখালেখিকে আঁকড়ে ধরল। পাঠকদের কাছে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল পরিচিতি, দেশের প্রথমসারির পত্রিকাগুলোতে এখন নিয়মিত তার লেখা ছাপা হয়। এই ছিল প্রজন্মের মেধাবী লেখক ইকবাল খন্দকারের শুরুর কাহিনি।
চার বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে ইকবাল খন্দকার সবার ছোট। তার শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে গ্রামে। গ্রাম বলতে একেবারেই অজপাড়াগাঁ। ফলে প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। শৈশবে এতটাই শান্তশিষ্ট ছিলেন যে, মা তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাড়ির সব কাজ সেরে ফেলতে পারতেন। কৈশোরেও যে খুব একটা চঞ্চল বা দুষ্ট ছিলেন, তা কিন্তু নয়। খেলাধুলা একদমই পারতেন না। তাই মাঠে গেলেও তাকে কেউ খেলায় নিতে চাইত না। এমনিতে একটু বেশিই ঘরমুখো ছিলেন তিনি। ঘর থেকে বের হতেই চাইতেন না। যে কারণে কৈশোরের শেষ পর্যায়ে এসেও তিনি এলাকার লোকজনের কাছে তেমন পরিচিত ছিলেন না।
তিনি অন্য দশজন লেখকের মতো লেখালেখির ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োগ করেননি। তিনি লেখালেখিকে একেবারে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হওয়ার পর চাকরির অনেক ভালো ভালো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি লেখালেখিকে পেশা এবং নেশা হিসেবে বেছে নেন। তার একটাই কারণ, এখানে সৃজনশীলতা আছে। একটা লেখা ছাপা হওয়ার পর যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো আনন্দকেই তিনি তুলনা করতে পারেন না। সারাজীবন এই আনন্দ পাওয়ার ইচ্ছে আছে বলেই লেখালেখির সঙ্গে বসবাস ইকবাল খন্দকারের।
নতুনদের অনেকের লেখা পড়েই মুগ্ধ হন ইকবাল খন্দকার। কারও কারও লেখা পড়ে এতটাই বিস্মিত হন যে, মনে হয় এতদিন ধরে লেখালেখি করেও এমন ভালো একটা লেখা তিনি লিখতে পারেননি। তবে লেখালেখির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
এবারের বইমেলায় ইকবাল খন্দকার মোট ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি বই বড়দের উপযোগী। আর বাকি তিনটি কিশোরদের উপযোগী। বড়দের উপযোগী বইটির নাম ‘তরুণী তখন ঘরে একা।’ এটি একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে রোদেলা প্রকাশনী। কিশোরদের উপযোগী তিনটি বইয়ের মধ্যে একটি হলো কিশোর থ্রিলার। নাম—‘স্কুলজুড়ে আতঙ্ক’। প্রকাশ করেছে শুভ্র প্রকাশ। ভৌতিক একটি উপন্যাস প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি প্রকাশনী। উপন্যাসটির নাম—‘রক্তচোষা ভূত’। তিনি বললেন, ‘আমি বেশি লিখি রম্য। আর এই রম্য লেখা নিয়েই মুক্তদেশ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে ‘ফাটাফাটি হাসি’ নামে একটি রম্য গল্পের বই। এই বইটি কিশোরররা তো পড়তে পারবেই, বড়রাও পড়তে পারবে।’
সবশেষে তার ভবিষ্যত্ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন একটাই আমি সারাজীবন লিখে যেতে চাই। অবশ্য এই লেখালেখি নিয়ে আমার ছোট একটা স্বপ্ন আছে। আমি স্বপ্ন দেখি আমার জীবদ্দশায় আমার কোনো লেখা পাঠ্যবইয়ে স্থান পাবে। আমি জানি, এই স্বপ্ন পূরণ হওয়া অনেক বেশি কঠিন। তবু স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই!’
ছবি দীপঙ্কর দীপু
ইকবাল খন্দকার
ডাক নাম :ইকবাল
জন্ম তারিখ ও স্থান :১১ জানুয়ারি, নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার ভাবলা গ্রামে।
মায়ের নাম :আমিনা খাতুন
বাবার নাম :মরহুম মো. শামসুদ্দীন খন্দকার
প্রথম স্কুল :ভাবলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :মা
প্রিয় উক্তি :মানুষকে ঠকিও না।
প্রিয় পোশাক :পাঞ্জাবি ও জিন্সের প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :টিভি দেখে
সাফল্যের সংজ্ঞা :মেধা এবং লেগে থাকা।
----
আ নি ফ রু বে দ
‘একজন মানুষের জীবন আসলে কত বড়? পঞ্চাশ বা আশি বা একশ বছর—এমন সংখ্যার ভেতর এ প্রশ্নের উত্তরটা নেই। তাহলে কোথায় আছে? এমন প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাকে বলতে হয় এভাবে—কোনো লোককে যদি তার মৃত্যুর সময়ে তার সমগ্র জীবনের কাহিনী বলতে বলা হয় আর লোকটা তার সমগ্র জীবনের কথা ব্যক্ত করতে যত সময় নিবে সেটাই হচ্ছে তার জীবনের আয়ু। এটা হতে পারে পাঁচ বা দশ বা বিশ মিনিট। হ্যাঁ, একটা লোকের জীবনের দৈর্ঘ্য এতটুকুই। এই মিনিটের সংখ্যা যত বাড়বে তার জীবনটা তত বড়। ঠিক বেঠিকের চিন্তা না করে বিষয়টাকে আমি এভাবেই দেখি। মিনিটের এ সংখ্যাটাকে বাড়াতে পারে শিল্পসাহিত্যের রস। শিল্প সাহিত্য আমাদের জীবনকে বড় করতে সরাসরি কাজ করে।’ এভাবেই নিজের লেখক ভাবনাটা ব্যক্ত করলেন প্রজন্মের লেখক আনিফ রুবেদ।
জেমকন পুরস্কার বিজয়ী এই লেখক ছেলেবেলায় বড় হয়েছেন প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানেই শৈশবে দাদুর সাথে উঠোনে ভোরের আলোয় পড়তে বসতেন। চোখের সামনে যা দেখতেন, মুগ্ধ হয়ে যেতেন। আশপাশের জিনিস দেখেই একদিন ছড়া লিখে ফেললেন, সেই ছড়া দেখে বাবা তো রীতিমতো পুত্রপ্রতিভায় মুগ্ধ। এভাবেই সেদিন একজন লেখকের লেখালেখির জগতে প্রবেশ। তারপর লিখেছেন স্কুল-কলেজের ম্যাগাজিনে, জাতীয় দৈনিকের সাহিত্যপাতায়। ‘আজকের কাগজ’-এর সুবর্ণরেখায় তার প্রথম লেখা ছাপা হয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ‘পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র’ শিরোনামে একটা কবিতার বই লিখে আলোচনায় আসেন তিনি বছর দুয়েক আগে। আর এই কবিতা লেখার পাশাপাশি একটা চাকরি করেন বটে, তবে জগতটা তার শিল্প সাহিত্য আর এর রস আহরণ করেই কেটে যায়। এই জগতের একজন বাসিন্দা হিসেবে তাই নিজেকে বেশ সুখীই মনে করেন তিনি।
আনিফ রুবেদ তার ব্যক্তিগত ভাবনা থেকে বলেন, ‘ধর্ম, বিজ্ঞান এবং শিল্পসাহিত্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে জড়িয়ে রেখেছে আষ্টেপৃষ্টে। ধর্ম হয়তো কিছু উপকার করেছে মানুষের, বিজ্ঞানও উপকার করেছে মানুষের। তবে ধর্মের কারণে সংঘটিত যুদ্ধে যত মানুষ হত্যা হয়েছে অন্যকোনো কারণেই তা হয়নি এ ব্যাপারটা আমরা সকলেই জানি। আবার এও জানি, বিজ্ঞান উপকারের তলে তলে যত ক্ষতি করেছে পৃথিবীর সেটাও অনেক। কিন্তু শিল্পসাহিত্য দ্বারা পৃথিবীর কোনো ধরনের ক্ষতি হয়েছে তার নজির নেই। শিল্প ও সাহিত্য পৃথিবীর অভিভাবক। মানুষকে ভেতর থেকে পরিবর্তন করে পৃথিবীকে শান্তির দিকে নিয়ে যায় একমাত্র শিল্প ও সাহিত্য। চোখ থাকলে মানুষ দেখতে পায়, কিন্তু জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিটা দেয় শিল্পরস। একটা শিল্প যতটা এই বিষয়গুলোর কাছে দিয়ে যায় আমি সেই শিল্পটাকে তত বড় বলে মানি।’
তার সমসাময়িক তরুণ সাহিত্যিকরা খুব ভালো করছে মনে করেন তিনি। শুধু একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, যেকোনো কাজেই একাগ্রতা থাকা দরকার। সময় দিয়ে করলে আর তার সাথে ভালোবাসাটা মেশাতে পারলে যেকোনো কাজই সহজ হয়ে যায়।
ছেলেবেলা থেকেই শান্ত স্বভাবের ছিলেন আনিফ রুবেদ। হতে চেয়েছেন একজন ভালো শ্রোতা, একজন ভালো পাঠক, সেই সাথে গুণমুগ্ধ দর্শক। এই স্পৃহাই তাকে এতদূর এনেছে। আনিফের বাবা শিক্ষকতা করেন, মা গৃহিণী। চার ভাইবোনের মাঝে দ্বিতীয় আনিফে শৈশব-কৈশোরের পুরোটাই কেটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তিনি মনে করেন, লেখকের জীবন পরিকল্পনায় আবদ্ধ করা যায় না, শুধু লিখে যেতে চান অবিরত।
আনিফ রুবেদ
ডাকনাম :বাবু
জন্ম তারিখ ও স্থান :২৫ ডিসেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মায়ের নাম :আলেয়া রহমান
বাবার নাম :হাবিবুর রহমান
প্রথম স্কুল :চামাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
প্রিয় মানুষ :লালন শাহ
প্রিয় উক্তি :সত্য বল, সুপথে চল, ওরে আমার মন!
প্রিয় পোশাক :কালো টি-শার্ট, প্যান্ট
অবসর কাটে যেভাবে :বই পড়ে, গান শুনে
সাফল্যের সংজ্ঞা :চাওয়ার শেষ নেই, আত্মতৃপ্তির সাফল্য।
