এই সময়ের জনপ্রিয় এক লেখার জাদুকরের নাম সুমন্ত আসলাম। যিনি তার লেখার মাধ্যমে মুহূর্তেই স্পর্শ করেন পাঠকের হূদয়, আন্দোলিত করেন কঠিন খোলসের ভেতরে থাকা আমাদের কোমল মনুষ্যত্ববোধকে। যুক্তি এবং আবেগ সমৃদ্ধ তার লেখা সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। প্রতিদিনের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমাদের বলতে না পারা কথাগুলোকেই তিনি উপজীব্য করে তোলেন তার লেখায়। প্রজন্মের এই জনপ্রিয় লেখককে নিয়ে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
বই পড়ার আবহের মাঝেই বড় হয়েছেন এই প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক সুমন্ত আসলাম। পরিবার থেকেই তিনি বই পড়ার অভ্যাসটি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছেন। ঘরেই একটা বড় আলমারি ছিল বইয়ে ভর্তি। ১৯৮৮’র বন্যায় আলমারিটি নষ্ট হয়ে গেলেও পরিবারের সদস্যদের বই পড়ার আগ্রহ কমেনি এতটুকু, বরং অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বাবা মরহুম সোহরাব আলী বৃদ্ধ বয়সে এসেও ছাড়তে পারেননি বই পড়ার এই তমুল নেশা। জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তিনি নিজের ভালো থাকার খোরাক খুঁজেছেন বইয়ের কাছ থেকেই। বড় ভাই ব্যবসায়িক কাজে যখন ঢাকায় আসতেন, তখন আর যাই হোক একটি করে বই কিনে নিতে তিনি কোনোদিনই ভুল করতেন না। ওই সময় মূলত পশ্চিমবঙ্গের লেখকদেরই বেশি প্রাদুর্ভাব ছিল বইয়ের জগতে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নিহারঞ্জন গুপ্ত, নিমাই ভট্টাচার্যের মতো লেখকদের বই যখন বড় ভাই ঢাকা থেকে কিনে বাড়িতে নিয়ে যেতেন, তখন বইগুলো পড়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের মাঝে একপ্রকার প্রতিযোগিতা শুরু হতো। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সবার পড়া শেষে একসময় বইগুলো সুমন্ত আসলামের হাতেও আসত। বইগুলো পড়তে পড়তে একসময় তার মনে হতে লাগল গল্প বলাটা খুব সহজ কাজ নয়—এটা একটা সুনির্দিষ্ট কৌশল, এক ধরনের সূত্রের মতোই গল্প ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় ফলাফলের দিকে। এই ভাবনাগুলোকে উপজীব্য করে জীবনযাপনের পরিক্রমায় সুমন্ত আসলাম চলে এলেন ঢাকায়। তখন এত পত্রপত্রিকা ছিল না বা লেখার জন্য এত সুযোগ ছিল না। হাতেগোনা কয়েকটি দৈনিক ছিল, যেখানে কোনোভাবে একটা লেখা ছাপাতে পারলেই জীবনটা ধন্য হয়ে যাবে বলে মনে হতো তার। সেবা প্রকাশনীর ‘কিশোর পত্রিকা’ ছিল তখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন এর সম্পাদক ছিলেন টিটু কিবরিয়া। তিনি সুমন্তকে ডেকে যত্ন করে বুঝিয়ে দিলেন, কীভাবে লিখলে লেখাটা আরও ভালো হয়। সেই থেকেই তার এই লেখালেখির জগতে পদচারণা শুরু।
তখন ‘মৌচাকে ঢিল’ নামে আরও একটি জনপ্রিয় পত্রিকা বের হতো। সেখানে পাঠকরা নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। সুতরাং ‘মৌচাকে ঢিল’-এর নিয়মিত পাঠক হতেও সুমন্ত বেশি দেরি করলেন না। পত্রিকাটি নিয়মিত পড়তে পড়তে একসময় তার মনে হলো তিনিও এ রকম গল্প বা এরচেয়ে ভালো গল্প লিখতে পারেন। যেই ভাবা সেই কাজ... শুরু করলেন লেখা। তারপরই মাথায় চাপল ‘ভোরের কাগজ’-এর পাঠক ফোরাম। পাঠক ফোরাম প্রতি মঙ্গলবারে বের হতো। সেখানে বিভিন্ন ফিচার লেখা হতো যেমন ‘একটুর জন্যে’ এই শব্দটি দিয়ে দুই শ’ শব্দের একটি ফিচার লিখতে হবে। তো সুমন্ত আসলাম এই ফিচার লেখার আগে পাঠক হয়ে একটি গল্প লিখে পাঠিয়ে দিলেন পাঠক ফোরাম বরাবর। গল্পটিও প্রকাশের পর অনেকেরই খুব ভালো লাগে। অনেকেই তাকে সাধুবাদ জানান গল্পটির জন্য। এই অনুপ্রেরণাগুলো নিয়েই তিনি এগিয়ে যান তার পরবর্তী লক্ষ্যে। তারপর একে একে তিনি ‘ভোরের কাগজ’, ‘কিশোর পত্রিকা’, ‘মুক্তকণ্ঠ’, ‘সাপ্তাহিক পূর্ণিমা’ ইত্যাদি পত্রিকাগুলোতে গল্প লেখা শুরু করেন। তখন ‘ভোরের কাগজ’ ভেঙে যায়, নতুন পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ‘প্রথম আলো’। তখন জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক তাকে বললেন, ‘নতুন একটা ফান ম্যাগাজিন করব। আপনি কাজটা করবেন কী না।’ সেই থেকেই তিনি শুরু করেন ‘প্রথম আলো’র জনপ্রিয় ফান ম্যাগাজিন ‘আলপিন’-এর সম্পাদনার কাজ।
এবারের বইমেলায় সুমন্ত আসলামের প্রায় আটটি বই প্রকাশ পাচ্ছে, বইগুলো হচ্ছে, সময় প্রকাশন থেকে ‘অনুভব’, অন্যপ্রকাশ থেকে ‘নিনির সবুজ জ্যোত্স্না’, পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে ‘ফানিম্যান দন্ত্যন রুহমান’ ও ‘বাউণ্ডুলে। ১২’, কাকলী প্রকাশনী থেকে ‘স্বপনচারিণী’ ও ‘জিনিয়াস জিনিয়ান’, অন্যপ্রকাশ থেকে ‘মহাবিপদে পাঁচ গোয়েন্দা’, সময় প্রকাশন থেকে ‘চার প্রিয়তমেষু’। এ ছাড়া তার স্ত্রী ফারজানা ঊর্মিরও এবারের বইমেলায় দুইটি বই প্রকাশ পাচ্ছে, বইগুলো হচ্ছে, সময় প্রকাশন থেকে ‘আমার আকাশ নীল’, কাকলী প্রকাশনী থেকে ‘স্বপ্নসখা’।
সুমন্ত আসলামের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার জনপ্রিয় সৃষ্টি বাউণ্ডুল-এর সৃষ্টির পেছনের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় সম্পর্কে, উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাউণ্ডুলে হচ্ছে সাধারণ মানুষের সমসাময়িক জীবন যাপনের না বলা বা বলতে না পারা কথাগুলো বাউণ্ডুলে ভাষায় বলা।’ স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়েই সুমন্ত আসলামের পারিবারিক বলয়। অনেকেই বলেন সাংসারিক জীবন একজন লেখকের ভাবনাগুলোকে নির্দিষ্টতায় বেঁধে ফেলে। কিন্তু সুমন্ত আসলাম নিজের পরিবার থেকেই লেখার অনুপ্রেরণা পান। যখন লিখতে বসেন তার সাথে সাথেই বসেন তার ছোট্ট মেয়েটি। মেয়েকে যখন বলেন, ‘মা এখন ডিস্টার্ব করা যাবে না।’ তখন মেয়ে আধো আধো ভাষায় বলে, ‘এখন ডিস্টার্ব করব না।’ অবসরের পুরোটা সময়ই তিনি কাটান তার মেয়ের সাথে। জীবনের অন্যান্য সুখগুলোর অনুভূতি তিনি খুঁজে পান নিজের মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে। এই প্রজন্মের যারা লেখালেখিতে যুক্ত রয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই জনপ্রিয় লেখক বলেন, ‘এই প্রজন্মের লেখকদের গল্প পুরোটাই অন্য ধরনের, তাদের লেখার ট্রেকই থাকে একেবারে ভিন্ন। তাদের কাছে এখন রয়েছে প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের সুযোগ। এর মাধ্যমে তারা তাদের পারিপার্শ্বিক ঘটনাগুলো খুব সহজেই কাছে থেকে দেখতে এবং শুনতে পারছে। আর বড় কথা হলো আমাদের সময় একটা বই পড়তে যে কষ্ট করতে হতো, এখন শুধুমাত্র হাতে একটা ব্ল্যাকবেরি মোবাইল ফোন থাকলেই চলে—পুরো পৃথিবীর গ্রন্থভাণ্ডার হাতের মুঠোয়। সুতরাং নতুন প্রজন্মের লেখার মূল উপজীব্য বিষয়গুলো হয়ে উঠে তাদের দৈনন্দিনের আধুনিক চিন্তাভাবনার পরিশীলিত বিষয়াবলি। সবশেষে তার ভবিষ্যত্ নিয়ে ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে যা কিছু হবে বা যা কিছুর আবির্ভাব হবে সবই যেন লেখার মাধ্যমে হয়। আমি নিজেকে একজন লেখক হিসেবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করি এবং এটাই আমার আসল পরিচয়।’
