শিক্ষাজীবন শেষে হওয়ার সাথে সাথেই নিজেকে যুক্ত করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)-তে। বেলা তখন মাত্র যাত্রা শুরু করেছে। পরবর্তীতে ‘কমনওয়েলথ বৃত্তি’র সুযোগ হাতছাড়া করে বেলার প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন। বেলার হাত ধরেই লড়ে চলেন পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী নানা চক্র আর ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। জাহাজ ভাঙা শিল্পের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনা ব্যবসায়ীদের বিপক্ষে লড়াই শুরু করেন। এ ছাড়াও জলাশয় ভরাট করে আবাসন তৈরি, পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার, পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, চিংড়ির ঘের, সেন্টমার্টিনস দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে যেখানেই পরিবেশের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে বা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানেই তিনি এবং তার নেতৃত্বে বেলা পরিবেশ রক্ষায় আইনিভাবে এগিয়ে এসেছে। বলছিলাম প্রজন্মের সাহসী নেতৃত্ব এশিয়ার নোবেলখ্যাত র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড-২০১২ জয়ী বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সম্পর্কে। তাকে নিয়ে লিখেছেন আসিফুর রহমান সাগর
‘পৃথিবীতে তিন শ্রেণীর মানুষ আছে। এক শ্রেণী যারা চেয়ে চেয়ে দেখে কী ঘটছে। আর এক শ্রেণী যারা দেখে বুঝার চেষ্টা করে কীভাবে ঘটছে। আরেকটি শ্রেণী রয়েছে যারা ঘটনা ঘটায়। আমি সব সময় এই তৃতীয় গোত্রের মানুষ হতে চেয়েছি’, বলছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। যারা রিজওয়ানার কাজের খবর রাখেন তারা জানেন তিনি তা করে দেখিয়েছেন। কখনও শক্তিমানদের বিরুদ্ধে, কখনো রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন অকুতোভয় এক যোদ্ধার মতো। সে লড়াই ব্যক্তিগত স্বার্থের লড়াই নয়। সমষ্টির জন্য, দেশের জন্য, মানুষের জন্য। তিনি নিজেই বললেন, ‘সত্যকে আমি কখনও ভয় পাই না। আর সত্যের জন্য লড়ে যাওয়াই তো একজন আইনবিদের কাজ, আমি সেটাই করি।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। পরিবেশ রক্ষায়, সত্য প্রতিষ্ঠায় রিজওয়ানার লড়াই শুধু তাকে বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়েই বাংলাদেশের সোচ্চার এক কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের ৪০ জন ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’-এর একজন হিসেবে বিবেচিত হন। ২০১২ সালে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার জিতে শুধু নিজের নয়, দেশের জন্যও সম্মান বয়ে এনেছেন। ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে ‘বেলা’র অফিসে বসে কথা হয় তার সঙ্গে। নিজের উপলব্ধির কথা, আইন লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন এ সময়ের তারুণ্যের প্রতীক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
রিজওয়ানা বলছিলেন, কার্ল মার্কসের একটি কথা আছে, ‘যখন মানুষ মনে করে টাকা ছাড়া আর কিছু সম্ভব না তখনই দুর্নীতির শুরু হয়।’ আরেকটি উদ্ধৃতি দিলেন তিনি, ‘যখন মানুষের সৃষ্টিকে ধ্বংস করা হয় তখন সেটা অরাজকতা। আর যখন স্রষ্টার সৃষ্টিকে ধ্বংস করা হয় তখন সেটা উন্মাদনা।’ আমার কাজ শুরু এই দুই উদ্ধৃতিকে অবলম্বন করে।
সে কারণেই কী প্রথাগত ওকালতির পথে না গিয়ে অন্যপথে হাঁটা। স্বীকার করলেন তিনি। বললেন, ওকালতি আমি পছন্দ করি। কিন্তু কখনোই ওকালতির প্রথাগত পথে চলে টাকা আয়ের কথা ভাবিনি। আমি চেয়েছি আইনকে মানুষের, দেশের সহায়তার জন্য কাজে লাগাব। জনসেবা করতে চেয়েছি।
‘জন্মসূত্রেই আমি জনকর্মী। আমার বাবা সৈয়দ মহিবুল হাসান প্রকৃত অর্থে একজন জনসেবক ছিলেন। তিনি রাজনীতি করতেন, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ছিলেন। মানুষ তাকে একজন পরোপকারী মানুষ হিসেবেই জানত। এটা আমি জন্ম থেকে দেখে দেখে বেড়ে উঠেছি। আমার জীবনে বাবার একটা বড় প্রভাব রয়েছে। আর একজনকে দেখে খুব অনুপ্রাণিত হয়েছি, তিনি আমার মা সুরাইয়া হাসানের চাচা সুলতানউদ্দিন আহমেদ। একজন পরোপকারী মানুষ ছিলেন তিনি। মানুষের জন্য তার মমত্ব আমি সেই ছোটবেলা থেকেই অবাক হয়ে দেখতাম। এই দুজন মানুষের ব্যক্তিত্ব আমাকে প্রভাবিত করেছে। আরেকজন আমাকে প্রভাবিত করেছেন আমার জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে, তিনি বেলার প্রধান প্রয়াত মহিউদ্দিন ফারুক।’
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের জন্ম ১৯৬৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নরপতি গ্রামে। জন্মেছেন ঢাকায়। বিয়ে করেছেন আইনবিদ আবু বকর সিদ্দিককে। এক মেয়ে নেহলা ও দুই ছেলে যাবির ও জিদান। রিজওয়ানা হাসান ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হলেও আইনের প্রতি আগ্রহ থেকে পরে বিভাগ পরিবর্তন করে আইন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে ফেলোশিপ করেছেন তিনি। ১৯৯৩ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতিতে (বেলা)। ১৯৯৭ সালে সংগঠক ও প্রধান মহিউদ্দিন ফারুকের মৃত্যু হলে তিনি বেলার প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেন।
বেলাকে আশ্রয় করেই তিনি লড়াই করে চলেছেন দখলদার, পরিবেশের ক্ষতি যেসব প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা করে চলেছে তাদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা পুরোনো ঢাকায় অন্যায়ভাবে পরিবেশ আইন না মেনে প্রচার চালাচ্ছিলেন। বেলার মাধ্যমে জনস্বার্থে আদালতে মামলা করে রিজওয়ানা একটি মাইলফলক সৃষ্টি করলেন। আদালত এই কাজকে জনস্বার্থের পরিপন্থী বলে রায় দেয়। এরপর থেকে নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন পরিবেশের ক্ষতির কাজ বন্ধে উদ্যোগ নেয়। সেই থেকে শুরু, এরপর তার একেকটি উদ্যাগ নতুন নতুন পালক যুক্ত করেছে রিজওয়ানার মুকুটে।
রিজওয়ানা জাহাজ ভাঙা শিল্পের মাধ্যমে পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনা ব্যবসায়ীদের বিপক্ষেও মামলা শুরু করেন। বেলার মাধ্যমে ২০০৩ সালে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেন। এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা এবং এ শিল্প থেকে বর্জ্য নিঃসরণ রোধ ও নিয়ন্ত্রণ, বিষাক্ত পণ্যবাহী জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধের দাবিতে। সে বছরের মার্চে আদালতের রায়ে ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ ছাড়া জাহাজ ভাঙার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ ছাড়াও জলাশয় ভরাট করে আবাসন তৈরি, পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার, পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, চিংড়ির ঘের, সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণসহ যেখানেই পরিবেশ ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে বা আশঙ্কা রয়েছে বেলা তার নেতৃত্বে আইনি লড়াই চালিয়েছে।
রিজওয়ানা বলছিলেন, ‘আমি মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছি। মধুমতি মডেল টাউনের বিরুদ্ধে যখন জলাশয় ভরাট বন্ধ করার মামলা করি। সেটা সাড়ে আট বছর চলেছিল। কিন্তু কখনোই হার মানিনি। আমার বিরুদ্ধে নানাভাবে প্রচারণা চালিয়েছে। অনেক মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি পিছে হটিনি। কারণ আমি সত্যের জন্য লড়ছি। যারা ভুল পথে থাকে তারা মনে মনে দুর্বল থাকে। তখনই ভয় দেখিয়ে সত্যের পক্ষে যে রয়েছে তাকে নিষ্ক্রিয় করতে চায়। আমি তো সত্যের পক্ষে, তাই আমার তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
রিজওয়ানা হাসান শুধু বেলার প্রধান নির্বাহীই নন জড়িত রয়েছেন আন্তর্জাতিক বেশকিছু সংস্থার সঙ্গেও। তিনি একাধারে ফেডারেশন অব এনজিওস ইন বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, এনজিও আরডিআরএস-এর সভাপতি। এ ছাড়া তিনি ‘নিজেরা করি’ সংগঠন ও এসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড ডেভলপমেন্টের একজন সদস্য। বেসরকারি এসব কাজ ছাড়াও তিনি সরকার কর্তৃক গঠিত বিভিন্ন কমিটির সদস্য। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিকভাবে ফ্রেন্ডস অব আর্থ ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী সদস্য; এনভায়রনমেন্টাল ল এলায়েন্স ওয়ার্ল্ডওয়াইড এবং এনভায়রনমেন্টাল ল কমিশন অব দ্য আইইউসিএন-এর সদস্য। তিনি দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করছেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অব এনভায়রনমেন্টাল এক্টিভিস্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা তৈরির কারণে বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০৭ সালে ‘পরিবেশ পুরস্কার’-এ ভূষিত করে। তার পরিচালিত সংগঠন বেলা ২০০৩ সালে জাতিসংঘের এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামে ঘোষিত গ্লোবাল ৫০০ রোল অব অনার্স পুরস্কারে ভূষিত হয়। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০৯ সালে তিনি অর্জন করেছেন ‘পরিবেশের নোবেল’ হিসেবে খ্যাত ‘গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ’। তার এসব অর্জনের কারণে ২০০৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনের বিবেচনায় বিশ্বের ৪০ জন ‘হিরোজ অব এনভায়রনমেন্ট’-এর একজন হিসেবে বিবেচিত হন রিজওয়ানা।
কখনও রাজনীতি করবেন? রিজওয়ানা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘এ প্রশ্ন কেন? আপনি মানুষের অধিকারের রক্ষায় কাজ করছেন। রাজনীতিও তো তাই। মানুষের অধিকার রক্ষাই তো রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।’ উত্তর দিলেন প্রশ্ন দিয়েই, ‘নীতি-আদর্শ মেনে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল পরিচালিত হয় কী? আমাদের রাজনীতির যে গতিপ্রকৃতি তাতে খুব দ্রুত এ ধারায় পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। ফলে দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সরকারের, রাজনীতির বলয়ের বাইরে থেকেই কাজ করে যেতে চাই।’
