সৃজনশীলতার জগত্ এবং নারী

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৫৯
‘নারী সাহিত্যক’ কিংবা ‘পুরুষ সাহিত্যিক’ এরকম বিভাজন না থাকার কথা থাকলেও সৃজনশীলতার জগত্ থেকে নারীকে সব সময়ই দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে এমনটাই মনে করেন নারী সাহিত্যিকগন।আর সব ক্ষেত্রের মতো এখানে নারীর এগিয়ে যাওয়ায় রয়েছে নানা বাধা। তাই ভাল লিখেও হ্যারি পটারের লেখক জে .কে রাউলিং সাংকেতিক নামে লেখা প্রকাশ করতে হয়েছে। তার প্রকাশকের সঙ্কা ছিল নারী হওয়ার প্রভাব যদি এই বইএ পরে। আমাদের দেশের নারী লেখকরাও এর বাইরে নয়। শুরু হয়ে গেল বই মেলা। একুশের বই মেলাকে কেন্দ্র করে দুই প্রজন্মের এবং দুই ঘরানার লেখক জানিয়েছেন তাদের আশা-ভাবনার কথা, তাই নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদন— কাজি রোজি কবি বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা,ভালোবাসার মেলা। যারা বই পড়তে ভালোবাসেন,শব্দকে যারা ভালোবাসেন, উচ্চারণকে যারা ভালোবাসেন বইমেলার জন্য সারাবছর অপেক্ষা করে থাকেন তারা। আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারির শুরুতে দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই মেলার উদ্বোধন হওয়ার পর তা পাঠক, প্রকাশক এবং লেখকদের মিলনমেলাতে পরিণত হয়। আমার ভাবতে ভালো লাগে সেই বাহান্নর ভাষা আন্দোলন এবং শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আজো এই মেলার আয়োজন করে চলেছি। বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো মন চাইলেই মেলায় আসতে পারি না। কিন্তু মেলায় এসে যখন তরুণ-তরুণীদেরকে দেখি তখন প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। এরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যত্। আমি সবসময় তরুণদের উপচে-পড়া ঘূর্ণিতে থাকতে চাই। মেলার অর্থনৈতিক একটা লাভের দিকও রয়েছে। এখানকার বইয়ের দোকানগুলো আমাদের জীবনের দোকান। ‘নারী সাহিত্যিক’ কিংবা ‘পুরুষ সাহিত্যিক’ এরকম বিভাজনে আমি বিশ্বাসী নই। সবার আগে আমি মানুষ তারপর আমার অন্য পরিচয়। প্রতিটি মানুষ নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে। আর আমাদের দেশের নারীদের কথা যদি বলতেই হয় তাহলে আমি সবার আগে একটি কথা বলবো, আজো আমাদের নারীরা বই পড়েন উনুনের আঁচ থেকে যে আলো বের হয় সেই আলো থেকে। পুরুষরা যতোটা সুযোগ পায় কিংবা উন্নত দেশের নারীরা যে ধরনের সুবিধা পায় আমাদের নারীরা তা থেকে অনেক দূরে। বরং প্রতিনিয়ত দেখি আমাদের মা-বোনেরা স্কুল-কলেজ-রাস্তাঘাট সবখানে লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছে। তারপরও সুযোগ পেলে তারা প্রতিবাদ করে। আমাদের নারীরা সুযোগ পেলে অনেক দূর যেতে পারে। তাদেরকে সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে আমাদেরকেই। স্বাধীনতার এতো পরে এসে হলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমার প্রত্যাশা থাকবে অচিরেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হোক এবং রায় কার্যকর করা হোক। আর আমাদের দেশে বিদেশি সাহিত্যের মানসম্মত অনুবাদ নেই বললেই চলে। আমি আশা করবো বাংলা একাডেমী থেকে উদ্যোগ নেয়া হবে যাতে আমরা বেশি বেশি বিদেশি সাহিত্য মাতৃভাষায় পড়তে পারি। শিকোয়া নাজনীন চিত্রকলা সমালোচক বইমেলার জন্য সারাবছর আমি অপেক্ষা করে থাকি। কারণ বইমেলার সময়ই আমাদের দেশে সব থেকে বেশি বই প্রকাশিত হয়। আমি সবসময় অন্য লেখকদের বই সংগ্রহ করে তৃপ্তি পাই। চিত্রকলার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস আর কবিতার প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ রয়েছে। এজন্য বইমেলা শুরু হলে নিয়মিত মেলায় গিয়ে বই সংগ্রহ করি। নতুন বই মানেই আমার কাছে নতুন আকর্ষণ। তবে আমার নিজের একটি কষ্টের জায়গা হলো আমাদের দেশে চিত্রকলার উপর পর্যাপ্ত বই নেই, বের হয় না এবং হচ্ছে না। এই অবস্থাটার পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। এবারের বইমেলায় আমার একটা বই প্রকাশিত হচ্ছে। আর একটি বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে। আমার বই দু’টি হলো: জলছবি নদী আখ্যান এবং ১৯৪৩-৪৪ বলে মনে হয়। তাই এই বইমেলায় নিজের বই প্রকাশ এবং সম-সাময়িক আমার প্রিয় সাহিত্যিকদের বই সংগ্রহ করার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করেছি দীর্ঘদিন। একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমাদের দেশের নারীরা সব ক্ষেত্রেই পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে আছে। বিষয়টা এমন না যে তারা শুধু সাহিত্যে পিছিয়ে আছে। এটা অবশ্য সারা পৃথিবীতেই একই রকম। নারীরা পুরুষের তুলনায় সবসময়ই অনেক কম সুযোগ-সুবিধা পেয়ে এসেছে বলে এমনটা ঘটে আসছে। পুরুষতান্ত্রিক আমাদের এই সমাজে নারীর এই অবস্থা আদিকাল থেকেই বিরাজমান। আবার এটাও বলা যাবে না নারীরা কিছু করছে না। হাজার সীমাবদ্ধতার মাঝে থেকেও নারীরা সামনে এগিয়ে চলেছে। আর সৃষ্টিশীলতা এবং সৃজনশীলতার জগত্ থেকে নারীদেরকে সবসময়ই দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে সবসময় সেকেন্ডারী ভাবা হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। আমি আশা করবো আমাদের নারীরা সকল ক্ষেত্রে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। বইমেলাকে ঘিরে আমার আশা— ভালো ভালো বই প্রকাশিত হোক, আমাদের সাহিত্যাঙ্গন আরো সমৃদ্ধ হোক, তরুণরা বইয়ের প্রতি আরো আগ্রহী হয়ে উঠুক, বই হোক প্রতিটি মানুষের সব সময়ের সঙ্গী।