সমাবর্তন বক্তৃতা

জে. কে রাউলিং

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৯:০২
হ্যারি পটারখ্যাত ব্রিটিশ সাহিত্যিক জে.কে রাউলিং ২০০৮ সালে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হন। সেই ভাষণে তিনি মানুষের জীবনে ব্যর্থতা এবং কল্পনা শক্তির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন—মেহেদী হাসান ‘কোনো ব্যর্থতা ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব যদি না কেউ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জীবনযাপন করে থাকে; যা কারো পক্ষেই পুরোপুরি সম্ভব না। তার অর্থ স্বভাবতই সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ।’ প্রথমে হার্ভাডের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারণ আপনারা আমাকে এখানে ডেকে শুধু সম্মানিতই করেননি, পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিলন মেলার অংশ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। সমাবর্তন বক্তৃতা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ একটি কাজ। আজ আমার নিজের গ্রাজুয়েশনের সমাবর্তন বক্তার কথা মনে পড়ছে। ওইদিন বক্তা ছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক ব্যারোনোস মেরি ওয়ামোক। তাঁর সেই বক্তৃতা আমার আজকের এই বক্তৃতা লিখতে অনেক সাহায্য করেছে। আজকে যারা গ্রাজুয়েশন শেষ করলে, তোমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত আত্মোন্নয়ন। আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি আজ আমার কী বলা উচিত তোমাদেরকে। আজ আমি ব্যর্থতা এবং কল্পনাশক্তি সম্পর্কে বলবো। বাস্তব জীবনে কল্পনাশক্তির প্রয়োজনীয়তা অসীম। বাস্তব জীবন আর কল্পনা— কথা দু’টি স্ববিরোধী মনে হতে পারে তোমাদের কাছে। আমি যখন গ্রাজুয়েশন শেষ করি তখন আমার বয়স ২৪। সেই সময় আমার নিজের লক্ষ্য-আকাঙ্ক্ষা এবং আমার আপনজনদের আশার মাঝে দোদুল্যোমান ছিলাম আমি। আজ ভেবে খুশি হই যে, সারা জীবন ধরে আমি লেখক হতে চেয়েছি। আমার বাবা-মা খুব একটা শিক্ষিত ছিলেন না এবং আমার লেখালেখি সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল এটা শুধুই আমার স্বপ্ন, তা বাস্তবে রূপ পাবে না এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে এর কোনো ভবিষত্ নেই। তারা চাইতেন আমি কোনো ভকেশনাল কোর্স করি। আমি ভাষা তত্ত্বের উপর পড়াশুনা করেছিলাম। তারা এটা জানার পর খুশি হননি। এর জন্য অবশ্য আমি তাদেরকে দোষ দিই না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর সন্তানের ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে বাবা-মাকে আর দোষ দেয়া যায় না; যখন তুমি উপযুক্ত হবে তখন তোমার দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত। আমার বাবা-মা চাইতেন না আমি দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করি। তারা নিজেদের জীবনে দরিদ্র হওয়ার ফল ভোগ করেছেন। দরিদ্রতা মানুষের মনে ভয়, পীড়ন এবং হতাশার জন্ম দেয়। কিন্তু নিজের চেষ্টায় দারিদ্র্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে গর্বিত হওয়াই যায়। আর বোকারাই দারিদ্র্যতাকে রোমান্টিকরূপে উপস্থাপন করে। তোমাদের বয়সে আমি সব থেকে বেশি ভয় পেতাম ব্যর্থতাকে। এই বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি শ্রেণিকক্ষে কম আর ক্যাফেতে গল্প লেখার পেছনে বেশি সময় ব্যয় করতাম। কিন্তু পরীক্ষাগুলো পাস করার ব্যাপারে সবসময় সচেতন ছিলাম। যেহেতু তোমরা হাভার্ড থেকে পড়াশুনা শেষ করছো তাই বলা যায় ব্যর্থতা তোমাদেরকে সে ভাবে স্পর্ষ করতে পারেনি। তোমরা হয়ত সফলতার পেছনে যতটা ছোটো ব্যর্থতা থেকে ততোটা ভালো। আমরা আমাদের নিজেদের মতো করে আমাদের ব্যর্থতার সংগা তৈরি করি। কিন্তু প্রকৃতিও তার নিজের মতো করে আমাদের জন্য একটি ব্যর্থতার সংগা রচনা করে। গ্রাজুয়েশন শেষ হওয়ার সাত বছর পর অনেক বড়ো মাপের একটি ধাক্কা খাই আমি। অত্যন্ত স্বল্পসাথী একটি বিয়ের সম্পর্কের অবসান, বেকারত্ব, একা সন্তানের অভিভাবক এবং নিজের ঘরে থেকে ব্রিটেনের সর্বনিম্ন স্তরের দারিদ্র্যতা-এইসব একত্রে আমাকে চেপে ধরেছিল। যেকোনো বিচারে আমি ছিলাম সবথেকে ব্যর্থ একজন মানুষ। আজকের এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আমি বলবো না যে ব্যর্থতা মজার কোনো বিষয়। ওইটা আমার জীবনের সবথেকে অন্ধকার অধ্যায়। আমি জানতাম সেই অন্ধকারের সুড়ঙ্গ কতোটা দীর্ঘ এবং বিশ্বাস করতাম একদিন আলোর সন্ধান পাবোই। যদিও সেই সময় এমন আশা কল্পনার মতো ছিল। এবার বলি কেনো ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলছি; স্বাভাবিকভাবেই ব্যর্থতা অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে দূরে রাখে। আমি সেই সময় অর্থাত্ আমার জীবনের অন্ধকার সময়টাতে ভাল না করে নিজের যেটা করতে ভালো লাগত, যে কাজটা করে শান্তি পেতাম সেটাই করতাম। সেই সময় নিজেকে একেবারে মুক্ত মনে হতো। কারণ জীবনের সবথেকে কঠিন সময়টাতে ছিলাম এবং আমার হারানোর কিছুই ছিল না। আমার কাছে সবথেকে বড়ো বিষয় ছিল যে আমি তখনো বেঁচে ছিলাম এবং আমার সন্তান এবং পুরোনো টাইপ রাইটারটা ছিল আমার সাথেই। এটার উপরই আমার জীবনকে গড়ে তুলেছি নতুনভাবে। আমি যে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি তার মধ্য দিয়ে হয়তো তোমাদেরকে যেতে হবে না, কিন্তু কিছু ব্যর্থতা প্রতিটি মানুষের জীবনেই আসে যেটা অবধারিত। কোনো ব্যর্থতা ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব যদি না কেউ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জীবনযাপন করে থাকে; যা কারো পক্ষেই পুরোপুরি সম্ভব না। তার অর্থ স্বভাবতই সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ। ব্যর্থতা আমাকে এমন কিছু জিনিস শিখিয়েছে যা অন্য কিছুই পারতো না। আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে আমার নিজের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল, যতোটা আমি মনে করতাম তার থেকেও বেশি এবং সেই সময় আমার কিছু বন্ধু ছিলেন যাদের মূল্য পৃথিবীর যে কোনো মূল্যবান বস্তুর থেকেও বেশি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, জীবন সফলতা-ব্যর্থতার ব্যালেন্সশীট না। তোমার বায়োডাটা এবং যোগ্যতাই জীবনের সব না। যদিও এটা নিয়ে তোমার মধ্যে বা অন্যের দ্বারা তুমি দ্বিধান্বিত হতে পারো। জীবন অত্যন্ত কঠিন, জটিল এবং সর্বোপরি নিজের আয়ত্বের মধ্যে নয় পুরোপুরিভাবে। আর কল্পনাশক্তিকে আমি অনেক বড়ো মাপে দেখি। এর দ্বারা অনেকের দর্শন এবং জীবনকে আমরা বুঝতে পারি যাদেরকে আমরা কখনো দেখিনি বা যাদের সাথে কখনো মিশিনি। হ্যারি পটার আমার জীবনের এরকমই একটি কল্পনা যেটি আমার প্রথম চাকরি জীবনের একটি কল্পনা। সেই সময় কাজের ফাঁকে লাঞ্চ ব্রেকে আমি গল্প লিখতাম। সেই সময় দেখেছি সাধারণ আফ্রিকানরা কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হতো। নারীদেরকে ধর্ষণ করে ফেলে দেয়া হতো, এরকমও দেখেছি গুম করে কোনো হদিস ছাড়া হত্যা করা হয়েছে এবং এ নিয়ে কারো মাঝে কোনো প্রকারের বিকার ছিল না। সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করায় অনেকের জীবনে এরকম বিপর্যয় নেমে আসতো। যখন আমি এই কাজ করতাম তখন নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম এই কারণে যে, আমার দেশে নির্বাচিত সরকার আছে, যেখানে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে এবং প্রতিটি মানুষের মানবাধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত মানুষের হিংস্ররূপ দেখতাম তখন। তখন আমি যা দেখতাম তা নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি এবং লিখতে থাকি। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাথে আফ্রিকানদের জন্য সেই সময় যে অল্প একটু কাজ করেছিলাম তা আমার জীবনের সবথেকে প্রেরণাদায়ক অংশ বা কাজ। মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন না করেও শিখতে পারে। তারা নিজেকে অন্যের জায়গায় কল্পনা করতে পারে। এটা প্রতিটি মানুষের একটি ক্ষমতা। অনেকে আছেন যারা নিজেদের কল্পনাশক্তির ব্যবহার করতে চান না মোটেও এবং তাদের আশপাশের এ ধরনের ঘটনা না দেখার এবং শোনার ভান করে থাকেন যেগুলো তাদেরকে স্পর্শ করে না। আমার ধারণা এইগুলো নিয়ে তারা আমার থেকে কম দু:স্বপ্ন দেখেননি। এভাবে জীবন ধারণ করলে মুক্তস্থান নিয়ে তাদের নিজেদের মনে সংশয় তৈরি হয় এবং নিজেদের মধ্যেই এক ধরনের অশান্তি বিরাজ করে এবং তারা সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকেন। আমার বয়স যখন ১৮ তখন পড়েছিলাম, ‘অন্তরাত্মার অর্জন বাইরের জগত্টার বাস্তবতায় পরিবর্তন আনে। আজ তোমাদের মধ্যে যারা এই হাভার্ড থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করছো তারা সকল প্রকারের ভেদাভেদ ভুলে তোমাদের মেধা দিয়ে মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির নাগরিক হওয়াতে তোমাদের জীবনাচারণ, তোমাদের কর্মকাণ্ড, তোমাদের ভোটাধিকারের ফল বর্ডারের ওপারের মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এবং করবে। এটা একদিকে যেমন তোমাদের সুবিধা তেমনি দায়িত্বও বটে। তোমরা যদি তোমাদের শক্তিকে, তোমাদের মেধাকে তাদের জন্য কাজে লাগাও তাহলে শুধু তোমাদের পরিবারই না পুরো মানব জাতিই তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। পৃথিবীতে পরিবর্তন আনার জন্য জাদুর প্রয়োজন পড়ে না। মানুষের নিজের মধ্যে যে ক্ষমতা আছে তা ব্যবহার করলেই চলে। এজন্য আমাদেরকে আরো ভালো জিনিসের কল্পনা করতে হবে। আমি প্রায় শেষ করে ফেলেছি। তোমাদের কাছে আমার আশা থাকবে, আমি যাদের সাথে গ্রাজুয়েশন শেষ করে সমাবর্তনে অংশ নিয়েছিলাম তারা আমার সারা জীবনের সেরা বন্ধু। আমরা সেই সময় সবাই মিলে দলগতভাবে যে ছবি তুলেছিলাম তাদের মাঝে কেউ যদি প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য লড়েন বা নির্বাচিত হন তাহলে সেই ছবিটির গুরুত্ব অসীম। তাই আমি চাইবো, তোমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। তোমাদের সকলের মঙ্গল এবং উন্নত জীবনের কমনা করে এখানে শেষ করছি।