মিয়ানমারের ওপর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো অবরোধ তুলে নেয়ায় দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। নতুন বিনিয়োগের অধিকাংশই তৈরি পোশাক শিল্পখাতে। ফলে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভবিষ্যত্ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শীর্ষ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, বাংলাদেশ এবং ভিয়েতনামের চেয়ে মিয়ানমারের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কম। তাই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন। চলতি বছরের মে মাসের মধ্যে বিখ্যাত ডেল্টা ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ মিয়ানমারে তাদের ৫০টি গার্মেন্টস কারখানায় উত্পাদন শুরু করবে। ইতিমধ্যে দেশটি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পথ সহজ করায় পশ্চিমা দেশগুলো সেখানে বিনিয়োগ শুরু করেছে। গত একবছরে মিয়ানমারের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। মিয়ানমার পূর্ব এশিয়ার দেশ হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের বিচারে অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে, মিয়ানমারের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ উঠে যাবার ফলে দেশটি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা পেতে পারে। ১৯৯৭ সালে ইউরোপ মিয়ানমারের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নিলেও দেশটির গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর এখন সে সুবিধা বহালের চিন্তা-ভাবনা চলছে। উল্লেখ্য, ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা ভোগ করে আসছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন বলেন, তৈরি পোশাক খাতে মিয়ানমার খুব শিগগিরই বাংলাদেশের প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারবে না। কারণ গত ৩০ বছরে আমরা যে জায়গায় পৌঁছেছি, সেখানে পৌঁছাতে মিয়ানমারের সময় লাগবে। তবে তিনি বলেন, আাাগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ যদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে, তাহলে হয়তো আমরা দেশটির কাছে কিছু বাজার হারাবো।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ডক্টর জায়েদ বখতও মনে করেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যে মিয়ানমার বাংলাদেশের প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারবে না। তবে, আমাদের মনে রাখতে হবে, মাঠে একটি নতুন প্রতিযোগী নেমেছে। জায়েদ বখতের মতে, উত্পাদন খরচের দিক থেকে মিয়ানমার আমাদের পেছনে থাকবে। তবে সেখানকার অবকাঠামো যত উন্নত হবে ততই দেশটির রপ্তানি বাড়বে। এ বিচারে বাংলাদেশের অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, মিয়ানমার সরকার সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তাতে দেশটির তৈরি পোশাক খাতের উত্তরণের ইঙ্গিত রয়েছে। দেশটির জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন মন্ত্রী ডক্টর কান জো সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, মিয়ানমারে বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগে মোট ২৫টি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। এসব কারখানা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগের যে নীতিমালা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে এশিয়ার দেশগুলো মিয়ানমারে আরো বেশি গার্মেন্টস শিল্প স্থাপনে উদ্বুদ্ধ হবে বলে কান জো আশা প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, বর্তমানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং হংকং মিয়ানমারে বিনিয়োগের দিক থেকে এগিয়ে আছে। জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থ বছরের প্রথম ৫ মাসে মিয়ানমার মোট পাঁচশ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। কান জো সে দেশের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর তৈরি পোশাক রপ্তানি সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে।প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১৫ সালের মধ্যে মিয়ানমারে তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়াবে সাতশটি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় একলাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে দেশটির সরকার। এ বছরের মে মাসের মধ্যে বিখ্যাত ডেল্টা ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ মিয়ানমারে ৫০টি গার্মেন্টস কারখানায় উত্পাদন শুরু করবে। ইয়াংগুনের কাছে পাথেইন টাউনশিপে স্থাপতি এসব কারখানা থেকে সহজেই পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে।
মিয়ানমার গার্মেন্টস এন্ড টেক্সটাইল এসোসিয়েশনের নেতা খায়িং নিউ মনে করেন, খুব শিগগিরই পশ্চিমা নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো মিয়ানমারে তৈরি পোশাকের দিকে আগ্রহী হবে। তিনি বলেন, বেশ কিছু অবকাঠামোগত অসুবিধা থাকলেও বিরাট কর্মশক্তি পশ্চিমা কোম্পানিগুলোকে মিয়ানমারের দিকে আকৃষ্ট করবে। তার মতে, শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলো যেমন, বাংলাদেশ, চীন এবং ভিয়েতনামের চেয়ে মিয়ানমারে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কম। এখানে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ৪০ ডলারের নীচে। তবে খায়িং নিউ মনে করেন, মিয়ানমারের ওপর থেকে পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়াই শুধু নয়, বিদেশি বিনিয়োগের নীতি সহজ করায় এখানে বিনিয়োগ বাড়বে।
