সেই সকালের অ্যালার্মে ভাঙে ঘুম, একটু বেশি ঘুমিয়ে নিতে গিয়ে দেরি করে ফেলা, তারপর তাড়াহুড়া করে তৈরি হওয়া অফিসের জন্য। রাস্তায় জ্যামে বসে হকারের ফিরিস্তি শোনা, অফিসে গিয়ে সেই উঁচু উঁচু ফাইলের মাঝে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা! এরই মাঝে কখন যে সূর্যটা ক্লান্ত হয়ে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে, টেরই পাওয়া যায় না। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সন্তানকে বাড়ির কাজ করতে বসানো, এরপর সময়মতো বসে পড়া টিভির সামনে। ছুটির দিনে অবসরের পরিবর্তে একগাদা জমে থাকা কাজে হাত দেওয়া। এই যখন আমাদের নিত্যদিনের দিনলিপি, তখন কী আনন্দ বেঁচে থাকা যায়? ঘুরে ফিরে নচিকেতার গানে সুর মিলিয়ে ‘অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন’ গাওয়াই কি সার্থকতা? না কি জীবনে আনন্দ খুঁজে নেওয়াটাই প্রকৃত বাস্তবতা? ছোট ছোট পদক্ষেপেই বদলে যেতে পারে জীবন, আনতে পারেন বৈচিত্র্য, হয়ে যেতে পারেন নতুন যৌবনেরই দূত। একঘেয়েমি কাটিয়ে ওঠার নানা দিক নিয়ে লিখেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
বিকেল অতিক্রান্ত হলেই চলে যায় প্রাণশক্তি, প্রত্যেক দিনই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার একই অনুভূতি হয় হয়তো। আপনার ছোট্ট সোনামণি তখনও আপনার চারপাশে কি সুন্দর ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে, আর আপনি বসে আছেন নিজেকে শূন্য করে! একেই বলে অবসাদ, অনীহা, আলস্য কিংবা অবসন্নতা। এতকিছুর পর নিজেকে জাগিয়ে রাখা চাই। একঘেয়ে জীবনটাতে বৈচিত্র্য আনতে নিজের জীবনধারায় পরিবর্তন আনুন। সেই জন্যই আমাদের কিছু পরামর্শ।
পছন্দের কোনো কাজ
আমরা যখন গতানুগতিক কাজে অভ্যস্ত হয়ে যাই, তখন মন চায় কিছুটা পরিবর্তন। একঘেয়ে জীবনে অভ্যস্ততার কারণে প্রতিদিনের জীবনধারাও হয়ে ওঠে নিরানন্দের। নিজেকে তাই নিয়োজিত করতে পারেন পছন্দের কোনো কাজে। হয়তো একটা সময় গান গাইতেন খুব, এখন আর কাজের চাপে সে সুযোগটা হয়ে ওঠে না। কিন্তু আপনি চাইলেই রাতে খাওয়ার পর অথবা ছুটির দিন সন্ধ্যায় তানপুরা অথবা হারমোনিয়ামটা নিয়ে বসে যেতে পারেন পরিবারের মানুষদের নিয়ে। সুর সাধতে সাধতে আপনি হয়তো খুঁজে পাবেন সেই পুরানো দিনের স্মৃতি, মাঝে মাঝে এই স্মৃতিই আলোড়িত করে আমাদের। ছেলেবেলায় সমরেশের নতুন উপন্যাস বের হলে সবার আগে আপনার পড়া চাই, বন্ধুদের সাথে উপন্যাস নিয়ে সে কি প্রাণোচ্ছল আড্ডা, এখন আর সে সময়টা হয় না, আগ্রহটাও হারিয়ে গেছে সময়ের সাথে সাথে। তরুণ বয়সে সুনীলের কবিতা মানেই যেন রাতঘুমেও অদ্ভুত জোছনা দেখা, জয় গোস্বামীর কবিতায় কত কিছুকেই ভালো লাগিয়ে ফেলা। এই আহ্বানটুকুও নিজের মাঝেই অনুভব করেন না এখন আপনি। জীবনে কিছুটা বৈচিত্র্য আনতে শুরু করতে পারেন বই পড়া, পছন্দের কাজের তালিকায় সেটিকে এতদিন এক নম্বরে রেখে এসেছেন সব সময় আপনি। একদিন সময় করে বেরিয়ে পড়ুন বইয়ের দোকানে, এই শহরে বসবাস হলে ঢু মারতে পারেন নীলক্ষেতে। পছন্দের কিছু বই কিনে আনুন, বেছে নিতে পারেন কবিতার বই, রোমান্টিক কোনো উপন্যাস অথবা এই জীবনের কোনো উপাখ্যান নিয়ে রচিত কোনো বই। নিজের উপর আস্থা রাখতে পারেন , নিজের পছন্দের এই কাজটা পুনরাবৃত্তিতে করতে পারেন নিজের আনন্দায়ন।
নতুন শখ
সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় চারপাশ, ছেলেবেলায় কত বিচিত্র শখই না ছিল আমাদের। একটা সময় ডাকটিকিটের সংগ্রহে ভরে ফেলতাম আমাদের নোটবুক, বিদেশ থেকে কেউ এলেই বায়না ধরতাম কয়েন চাই সেই দেশের। সময়ের সাথে সবই বদলেছে। পাল্টেছে আমাদের শখের ধরন। নতুন কোনো শখে মনোনিবেশ করতে পারেন। বাসার আশপাশেই ঘরোয়া পরিবেশে অনেক জিম রয়েছে। চাইলে নিজেও চলে যেতে পারেন এ রকম কোনো জিমে, নিয়মিত যাতায়াতে আপনার শরীরটাও ভালো থাকবে, দেখা হবে অনেকের সাথে। নতুন শখে যোগ হতে পারে রান্না শেখা। ছুটির দিনে বই থেকে অথবা পরিচিতজনদের থেকে শেখা রান্নাগুলো করে দেখতে পারেন বাসায়, স্বাদে বৈচিত্র্য আসবে, আপনিও আনন্দ পাবেন নতুন খাবার তৈরি করতে গিয়ে। টিভিতেও এখন খাবারের অনেক অনুষ্ঠান হয়, সংবাদপত্রেও লাইফস্টাইল পাতাতেও ছাপা হয় নিত্যনতুন খাবারের রেসিপি। ছেলেদের জন্য এখন সাইক্লিং হতে পারে নতুন কোনো শখ, অনেক সাইক্লিং সংগঠন আমাদের দেশে। ঢাকা শহরেও প্রতি শুক্রবারের মানিক মিয়া এভিনিউতে দলবেঁধে সাইকেল চালাতে সমবেত হয় অনেক মানুষ। পাবেন নতুন বন্ধু, সাইকেলে করে ঢাকা ঘুরে দেখার আনন্দও। আর চাইলে আপনি বাসার আশেপাশে ঘোরাঘুরির কাজটা সাইকেলে করে সেরে ফেলতে পারেন। পুরান ঢাকার বংশালেই ছয় হাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দের সাইকেলটি।
বন্ধু আমার বন্ধু
কলেজে এসে প্রথমদিন রায়মার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল উনাইজার। স্কুলে তার খুব ভালো বন্ধু ছিল মেলিসা, কিন্তু রায়মা এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী। উনাইজা তার কাজের চাপে খুব আসতে পারে না রায়মার বাসায়। আর মেলিসা তো অস্ট্রেলিয়ায় সুখের পরবাসে। রায়মার তবু এখনও বন্ধু হতে নেই মানা। আপনার কাজের দুনিয়ায়, অথবা পাশের বাসার ভাবী, যে কেউই হতে পারে নতুন বন্ধু। সকালে দলবেঁধে হাঁটতে বের হলে সেখানেও হয়ে যেতে পারে অনেক বন্ধু। আর এদের সাথেই নিজের ভাবনার মতবিনিময়ে পেতে পারেন আনন্দের নতুন কোনো খোরাক। ফেসবুক তো এখন সময় কাটানোর দারুণ এক মাধ্যম। একটু ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করলে আপনার নতুন কোনো ভালো বন্ধু হয়েও যেতে পারে। সবাই যেহেতু সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমে সংযুক্ত, আপনি পেয়েও যেতে পারেন শৈশবের হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধুকে, সাইবার দুনিয়াতে সে জন্যই সুযোগ রয়েছে বন্ধুত্বের দুনিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার। আপনার দায়িত্ব কেবল বন্ধুকে চিনে নিজের ভাবনার জগতটা খুলে দেওয়ার।
শহরের সীমা ছাড়িয়ে
ঘরেই কাটিয়ে দিলেন জীবনটা? কোনো দিনও পাড়ায় যে পার্কটা আছে সেটাতেও যাওয়া হয়নি, সেখানে যেদিন গানের অনুষ্ঠান হয়, দরজা-জানালা বন্ধ করে শব্দটাকে আটকে দেন আপনি। কিন্তু সেখানে গেলে দেখতেন, কী উচ্ছ্বাসে মেতেছে সবাই! সবার জীবনেই কিছুটা দুঃখবোধ আছেই, তবুও জীবন জীবনের নিয়মেই কেটে যাচ্ছে। এর মাঝেই আনন্দে মেতে উঠুন, খুঁজে পেতে শিখুন নতুন কোনো আপনাকে। আর ছুটির দিন কাছের কোনো জায়গা থেকে ঘুরে আসাই যায়। এতে করে দেখাও হলো চারপাশ, আপনার সন্তান অথবা আপনজনদের সাথে কিছুটা সময় কাটানোও হলো। ঢাকার আশপাশেই এখন অনেক বেড়ানোর মতো জায়গা হয়েছে। আর বড় ছুটিতে অথবা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাড়ি দিন অন্য কোনো জেলার উদ্দেশে, দিব্যি দুদিন ঘুরে কাজে এসে যোগ দিতে পারবেন। এখন তো অনেক ট্যুর অপারেটর হয়েছে, তাদের জানালেই স্বল্প খরচে ঘুরে আসতে পারেন অনেক জায়গাতে। প্রতিমাসেই কক্সবাজার যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। উদ্যোগ নিয়ে দুদিন সময়েই কিন্তু ঘুরে আসতে পারেন দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির থেকে, এই শীতে চলে যেতে পারেন যশোরের কোনো গ্রামে, খেজুর রসের সাথে চিতই পিঠার আনন্দটা নতুন উদ্যমে পথ চলতে সাহায্য করতে পারবে আপনাকে।
বিশেষজ্ঞ বলেন
আমাদের নিত্যদিনের অবসাদ নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আমিনুর রহমানের কাছে, তিনি বললেন, ‘দুঃখ, ভয়, হতাশা থেকে অবসাদ আসতে পারে। কখনও মানুষ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। যেখানে সে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না এমন পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকলে অবসাদ আসতে পারে। যদি কেউ আবেগ প্রকাশ করতে না পারে অর্থাত্ তার কষ্ট ও আনন্দ কারও সঙ্গে ভাগ করতে না পারে তখন অবসাদ আসতে পারে। দীর্ঘদিন যদি কেউ একই কাজ করতে থাকে বা এমন কোনো কাজ যা তার মনের খোরাক জোগাতে পারছে না, তখন অনীহা বা একঘেয়েমি থেকেও মানুষ অবসাদগ্রস্ত হতে পারে। আর্থিক সমস্যা, অপছন্দনীয় খাবার, ঘুমের পরিবেশ পরিবর্তন, বাসস্থান পরিবর্তন, নিজস্ব জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটা, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে না পারা, কোনো ভুল সিদ্ধান্ত অবসাদের কারণ হতে পারে। এসব অবসাদগ্রস্ত হওয়ার কারণ মানসিক। নিজের প্রতি লক্ষ্য রাখলে অবসাদগ্রস্ত অবস্থা সহজেই কাটিয়ে ওঠা যায়। প্রথমে অবসাদের কারণ নির্ণয় করতে হবে। আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। এটি করা যায় কাউন্সিলরের সহায়তায়, মেডিটেশনের মাধ্যমে। নিয়মিত হাল্কা ব্যায়াম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, বাহ্যিক মেকওভার অর্থাত্ আউটলুকের পরিবর্তন করে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। নিয়মিত জিমে যাওয়া সম্ভব না হলে ঘরেই নিয়মিত হাল্কা ব্যায়াম করে হয়ে উঠুন ঝরঝরে। এতে শুধু মেদ ঝরবে না, বৃদ্ধি পাবে আপনার এনার্জি লেভেল। কল্পনাশক্তিকে বাড়ান, আপনার শখকে মনে পুষে না রেখে তা বাস্তবায়ন করুন। সময় মেনে চলুন। এটি আপনার দুশ্চিন্তা কমাবে। সপ্তাহে এক দিন শুধু নিজের জন্য রাখুন। সেদিন আপনার যা ইচ্ছে করুন। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখুন পর্যাপ্ত পরিমাণ ফল ও সবজি। প্রচুর পানি পান করুন। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম দুশ্চিন্তামুক্ত, অবসাদহীন জীবনের জন্য খুবই জরুরি। অ্যালকোহল, ক্যাফেইন, নিকোটিন থেকে দূরে থাকুন। অসীম চাহিদা আর সসীম সম্পদের দ্বন্দ্বটা আমাদের বাস্তবতার খুব পরিচিত এক চিত্র। এ কারণেই আমাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে এত ব্যবধান, যে ব্যবধান আমাদের টেনে নামাতে পারে হতাশার কালো গহ্বরে। জীবনে নেমে আসতে পারে বিষণ্নতার কালো ছায়া। তাই বিষণ্নতা নয়, জীবনে থাকুক আনন্দ ও উচ্ছলতা।
কড়চার এই আয়োজনে মডেল হয়েছেন
মুনমুন ও তার স্বামী সূর্য ছবি দীপঙ্কর দীপু
