জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় আজ মঙ্গলবার ঘোষণা করা হবে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন এবং বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক শাহিনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করবেন। গতকাল সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই তথ্য জানান যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার এ কে এম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ। রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
এ ব্যাপারে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী কৌঁসুলি মোহাম্মদ আলী বলেন, আমার বিশ্বাস মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। তার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তির আরজি জানিয়েছি।
সংবাদ সন্মেলনে রেজিস্ট্রার বলেন, দুই পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৭ মে মামলাটির রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এটা হবে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় মামলার রায়। রায় ঘোষণার পরে রেজিস্ট্রারের অফিস থেকে আদেশ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরবর্তী সময় জানানো হবে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ২১ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত রুকন পলাতক আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকাজ শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালে একই অপরাধে আরো সাতজনের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
মামলার শুরু যেভাবে
মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম মোস্তফা নামে এক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা হয়। ওই মামলাটি করেন কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই মামলার প্রথম সাক্ষী মোজাফফর আহমেদ খান। ২০০৮ সালে পল্লবী থানায় আরো একটি মামলা হয় কাদের মোল্লাসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই তাকে গ্রেফতার করা হয়। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু হয় ২০১০ সালের ২১ জুলাই। ঐ বছরের ২ আগস্ট এ মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর তদন্ত শেষ হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। ২৮ ডিসেম্বর অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। এর পর গত বছরের ২৮ মে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ শুরু হয়।
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মিরপুরের আলোকদি গ্রামে ৩৪৪ জন এবং কবি মেহেরুননিসাকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি অভিযোগ গঠন করা হয়। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, কাদের মোল্লার নির্দেশে তার সহচর আখতার একাত্তরের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যা করেন। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৭ মার্চ কাদের মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেন। তৃতীয় অভিযোগ হলো, ২৯ মার্চ বিকেলে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে অপহরণ করে মিরপুরের জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন। চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লা ও ৬০-৭০ জন রাজাকার রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থানার খানবাড়ি এবং ঘটেরচর (শহীদনগর) এলাকায় মোজাফ্ফর আহমেদ খান এবং দুজন নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গনি ও গোলাম মোস্তফাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এছাড়া তারা হামলা চালিয়ে শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করেন। পঞ্চম অভিযোগ অনুসারে, ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের একটি হেলিকপ্টার মিরপুরের আলোকদি গ্রামের পূর্ব দিকে নামে। কাদের মোল্লা অর্ধশতাধিক অবাঙালি ও রাজাকার নিয়ে গ্রামের পশ্চিম দিক থেকে ঢোকেন এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকেন। ওই ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি মারা যান। ষষ্ঠ অভিযোগ হলো, একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা মিরপুরের ১২ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর কালাপানি লেনের বাসায় ঢুকে হযরত আলীকে গুলি করে হত্যা করেন। একই সঙ্গে তার স্ত্রী আমিনা এবং দুই মেয়ে খাদিজা ও তাহমিনা, দুই বছরের ছেলে বাবুকেও হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় কাদের মোল্লার ১২ সহযোগী হযরতের ১১ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করেন। হযরতের আরেক মেয়ে মোমেনা ওই সময় আত্মগোপন করে সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন।
কাদের মোল্লার জবানবন্দি
রাষ্ট্রেপক্ষের অভিযোগের বিরুদ্ধে আবদুল কাদের মোল্লা নিজেই নিজের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ট্রাইব্যুনালে তার জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের আমিরাবাদ চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই তিনি গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। গ্রামে অবস্থানকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও হাইস্কুলের প্রায় ৩০ জন ছাত্রের সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। ২৩ মার্চ থেকে ১ মে ১৯৭১ পাকিস্তান সেনাবাহিনী ফরিদপুরে পৌঁছার দিন পর্যন্ত অন্যদের সাথে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যান। জবানবন্দিতে তিনি আরো বলেন, এতদিন আমার বিরুদ্ধে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। যাদের সাথে এতদিন রাজনীতি করলাম, মিছিল-মিটিং করলাম, সম্পর্ক রাখলাম, তারা এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ট্রাইব্যুনালে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছে। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা ছিল না বা নেই। গত ৪০ বছর সময়ের মধ্যে কোনো পত্র-পত্রিকায় বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট, কাল্পনিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে তিনি দাবি করেন।
ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
রায় প্রদান উপলক্ষে গতকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপক জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের রমনা জোনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ট্রাইব্যুনালের সবগুলো প্রবেশপথ ও আশেপাশের পুরো এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের মূল প্রবেশপথে অবস্থান নিয়েছে সোয়াত বাহিনীর সদস্যরা। আর র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা রয়েছে শিশু একাডেমীর সামনে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় গেটসহ সংলগ্ন এলাকায়।
এছাড়া শিক্ষা ভবন, কদম ফোয়ারা, পুরানো হাইকোর্ট ও দোয়েল চত্বরসহ পুরো এলাকায় আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নিয়েছেন। রাজধানীর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়কেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে।
