মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের শীর্ষপদে পরিবর্তন- হিলারীর সাফল্য ও ব্যর্থতা

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:১০
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধনী দেশের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্থান দখল করলেন ম্যাসাচুসেটসের দীর্ঘদিনের সিনেটর কয়েক দশক ধরে পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে দায়িত্বরত জন কেরি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতির সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত, তাই তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জন কেরির মতো অভিজ্ঞ কূটনীতিকের প্রয়োজন এই পদে। জন কেরি সম্পর্কে বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন যথার্থই বলেছেন,“মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব দক্ষ হাতেই পড়েছে। দায়িত্ব ছেড়ে দিতে কষ্ট হলেও তার বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কূটনীতিক হিসেবে চমত্কার কাজ করবেন তার উত্তরসূরী জন কেরি। এ দপ্তর দক্ষ হাতেই পড়েছে। জন কেরি সফল সিনেটর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও সাফল্য পাবেন। তাঁর বিবেচনাবোধ, অভিজ্ঞতা ও দর্শন রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজের পারিবারিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর বাবাও এ দপ্তরে কাজ করেছেন। তিনি জানেন কূটনীতিতে কি প্রয়োজন হয়।” যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন শেষ অফিস করেন ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ । তিনি বিদায়ের আগের দিন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনকে বলেন,“২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র দু’টি যুদ্ধে জড়িয়েছিলো। অর্থনৈতিক মন্দা ছিল। মার্কিন বন্ধুপ্রতিম কয়েকটি ছোট দেশ বিগড়ে গিয়েছিলো। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেয়ার সামর্থ্য নিয়ে গুঞ্জন উঠেছিলো। চার বছর পর পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। যদিও বিপজ্জনক ও জটিল পরিস্থিতি এখনো রয়েছে কিন্তু এই সময়ে আমরা মার্কিন কূটনীতিতে জোরদার ও বন্ধুপ্রতিম জোটগুলোকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করতে সমর্থ হয়েছি।” হিলারীকে মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বা জেমস বেকারের সমপর্যায়ের বলে মনে করেন অনেকে। এই তালিকায় আছেন বারাক ওবামা। ওবামা বলেন- হিলারীর মেধা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম করার মানসিকতার কারণেই তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন তিনি। তিনি প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন আর মার্কিন স্বার্থকে এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। বিশ্ব পরিস্থিতির এক কঠিন সময়ে হিলারী দায়িত্ব পান এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে পররাষ্ট্রনীতিকে একটি দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে আসেন। ওবামার প্রথম মেয়াদের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মন্ত্রী হিসেবেই অবসরে গেলেন হিলারী। এই সাফল্যই তাকে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থিতার লড়াইয়ে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থানে নিয়ে গেছে। তিনি অবশ্য এ ব্যাপারে এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিলারীর সাফল্য ও ব্যর্থতাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন,“ হিলারীর বিরামহীন চেষ্টা বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সময়ে তিনি ২১ শতকের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এজেন্ডা নিয়েও কাজ করেছেন। আমি একে মানবতাবাদের কাজ বলব।” মিলার ছয়জন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেছেন, তাদের কাজের বিচার করার সুযোগ পেয়েছেন। নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাকইটস ওয়াচের ওয়াশিংটন শাখার উপ-পরিচালক সারাহ মারগন বলেন,“হিলারী পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয়ভাগে নিয়ে এসেছিলেন নারী অধিকারের বিষয়টিকে। তাঁর আগ্রহের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছিলো। তিনি সুধী সমাজের নানা গোষ্ঠীর সঙ্গে মত বিনিময় করতেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, পররাষ্ট্রনীতি শুধু সরকারগুলোর মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব বিষয়ই এর আওতায় পড়ে। সাব-সাহারন আফ্রিকার সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক জেনিফার কুক বলেন,“কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ব্যাপারে জবাবদিহিতার প্রতিষ্ঠায় চাপ দেন। কেনিয়া, আইভরি কোষ্ট, সেনেগাল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ ধরনের বিষয় নিয়ে কাজ করে যাওয়ার দরুন কূটনীতিক প্রচেষ্টার চিহ্ন রেখেছেন তিনি। লিবিয়ার স্বৈরশাসক গাদ্দাফিকে উত্খাতের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সেনা পাঠানোর ব্যাপারেও হিলারীর নেয়া উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। গত ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি মিয়ানমার সফর করেন। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা, ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তিনি সফলতা দেখিয়েছেন। ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের সংগে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। তিনি তৃতীয় নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ১১২টি দেশ সফর করেন, মেডিলিন অলব্রাইট ৯৮টি দেশ সফর করেছিলেন অর্থাত্ হিলারীই সবচেয়ে বেশি দেশ সফর করেন। মিয়ানমারকে গণতন্ত্রের পথে নেয়া, চীনের ভিন্ন মতাবলম্বী নেতা চেন গুয়াং জেকে মুক্ত করা, এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব বাড়ানো এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায় হিলারীর অন্যতম সাফল্য। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে- হিলারীর সময়ে ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। তবে লিবিয়ার বেনগাজীতে মার্কিন কনস্যুলেটে হামলায় রাষ্ট্রদূতসহ চার মার্কিন কর্মকর্তার মৃত্যু তার সময়ের একটি বহুল আলোচিত ব্যর্থতা। হিলারী অস্থিতিশীল সিরিয়া, আরব বসন্তের পর সৃষ্টি হওয়া নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্য শান্তি-প্রক্রিয়া নিয়ে বলার মতো কাজ করতে পারেননি। এসব ইস্যুতে তিনি খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেননি। পারেননি ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত বন্ধে সত্যিকার অর্থে কার্যকরী কোন ভূমিকা রাখতে। তবে মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি নেয়ায় দেশটির নারীদের ভবিষ্যত্ নিয়ে ওয়াশিংটন এখনো ভীষণ উদ্বিগ্ন। হিলারী সাংবাদিকদের বলেন- তিনি মার্কিন-আফগান নারী পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি নিজে মনে করেন সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর জীবন ও কাজের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। এ কাজেই তিনি এবার পূর্ণ মনোনিবেশ করবেন। তাঁর ভাষায়,“দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পশ্চাতে ফেলে শক্তিশালী অর্থনীতি নির্মাণ বা স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। বেশির ভাগ দেশেই আজও নারীদের ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বলে মনে করা হয়। আর যেসব দেশে সম্মান দেয়া হয় সেখানেও নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের চেয়ে বেশি মর্যাদা জোটে না। তাদের রাজনৈতিক অধিকার নেই। ভয়াবহ সহিংসতা সহ্য করেও মুখ বুঁজে থাকতে হয়।” নারীদের প্রতি হিলারীর এই মমতা, সহমর্মিতা এবং তাদের জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি সত্যিই তাঁকে একজন সত্যিকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বিশ্বে নতুন স্থানে বসাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন জন কেরি। দেশের সর্বোচ্চ কূটনীতিক হিসেবে কেরিকে শপথ করান যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি এলেনা কাগান। গত চার বছর সিনেটের শক্তিশালী পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কেরি। গতমাসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেশের ৬৮তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সিনেটে ১৯৮৪ সাল থেকে দায়িত্ব পালনকারী জন কেরির নাম ঘোষণা করেন। ম্যাসাচুসেটসের দীর্ঘদিনের সিনেটর কয়েক দশক ধরে পররাষ্ট্র সম্পর্কবিষয়ক কমিটিতে দায়িত্বরত ছিলেন। ২০০৪ সালে ডেমোক্র্যাট থেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কেরি চার বছর কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমরা আশা করব হিলারী মানব কল্যাণে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কিন্তু সমাপ্ত করতে পারেননি, জন কেরি সেই অসমাপ্ত কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করবেন এবং গোটা পৃথিবীতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বন্ধে সত্যিকারের ভূমিকা রাখবেন। পৃথিবীর মানুষ যুদ্ধ চায় না, শান্তি চায়। এই সত্যই প্রতিষ্ঠিত হোক জন কেরির সময়কালে। লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ইমেইল: [email protected]