চট্টগ্রামে জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষ, তিনজন নিহত

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৮
চট্টগ্রামে গতকাল হরতাল চলাকালে তিন স্থানে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত ও শিবির কর্মীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন মারা গেছেন। এদের মধ্যে একজন শিবির কর্মী বলে দাবি করা হয়েছে। জামায়াত ও শিবিরের কর্মীরা গতকাল বিভিন্নস্থানে ব্যাপক গাড়ি ভাঙচুর করে। সংঘর্ষে সহকারী পুলিশ কমিশনারসহ আনুমানিক ৩০ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন এমরান খান, আফজাল ও মুহাম্মদ শফিক। আফজাল ইসলামী ছাত্রশিবিরকর্মী বলে মহানগর শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। নগরীর অলঙ্কার মোড়ে আধ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে দুই পুলিশসহ ১০ জন আহত হয়। পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সাত ব্যক্তিকে আটক করেছে। ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সেক্রেটারি নূরুল হক ইত্তেফাককে জানান, অলঙ্কার মোড়ে নিহত ইমরান চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তিনি শিবিরের আগ্রাবাদ শাখার সাথী। মুরাদপুরে অন্য ঘটনায় সহকারী কমিশনারসহ ১৫ পুলিশ আহত হয়েছেন। হরতাল চলাকালে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে জামায়াত ও শিবিরকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সকালে অলঙ্কার মোড়ে পুলিশের একটি পিকআপে অগ্নিসংযোগ করে হরতাল সমর্থকরা। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতা কাদের মোল্ল¬ার রায় ঘোষণার পর দুপুর থেকে হরতাল সমর্থকরা মারমুখী হয়ে ওঠে। রায়ের প্রতিবাদে দুপুর দেড়টায় নগরীর বহদ্দারহাট এলাকা থেকে জামায়াত শিবিরের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলকারীদের তাণ্ডবে বহদ্দারহাট থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় দোকান মালিকরা তড়িঘড়ি করে দোকানপাট বন্ধ করে দেন। মিছিলকারীরা বহদ্দারহাট মোড় এলাকায় বেশ কয়েকটি দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বহদ্দারহাট থেকে মুরাদপুর যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে রাখা ট্রাক, বাস, প্রাইভেট কারসহ ৩০টি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং রাস্তায় ভাসমান চায়ের দোকান পুড়িয়ে দেয়। এ সময় কয়েকটি বহুতল মার্কেটেও হামলা চালিয়ে বিভিন্ন শোরুম ভাঙচুর করে। মুরাদপুরে একটি মোটর সাইকেল পোড়ানো হয়। এ সময় মিছিলকারীরা ককটেল ফাটিয়ে পুরো এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে তারা লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে সিএমপির পাঁচলাইশ জোনের সহকারী কমিশনার শাহ মো. আব্দুর রউফ ইত্তেফাককে জানান। মিছিলকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. শাহরিয়ার আলীসহ ১৫ পুলিশ আহত হয়েছেন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় শিবিরের ৭ কর্মী আহত হয়। তাদেরও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শিবিরের আহত কর্মীরা হলো আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির আহমেদ, তানজিম উল হাসান, আবদুল ফাত্তার, মো. কবির, জিয়াউর রহমান জিয়া, ইসমাইল রাসেল ও হাসান তারেক নীরব। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বাংলানিউজের ফটো সাংবাদিক সোহেল সরওয়ার পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হন। রায়ের প্রতিবাদে দুপুরে নগরীর লালদীঘি ও ডবলমুরিং এলাকায় পৃথক সমাবেশ করে জামায়াত। এসব সমাবেশে জামায়াত নেতা সাবেক এমপি শাহজাহান চৌধুরীসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এ সময় বক্তারা বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করে জনগণ প্রমাণ করেছে এ রায় আওয়ামী লীগ ও তাদের সরকার নির্দেশিত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ রায় দেশের জনগণ মেনে নিতে পারে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে মানুষ হত্যা করে টিকে থাকতে চায়। দেশে খুন, গুম, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলীয় নেতাকর্মীরা চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং আধিপত্য বিস্তারের নামে দেশবাসীকে জিম্মি করে রেখেছে। দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করেছে। এদিকে হরতাল চলাকালে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে ওঠে। ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসরকারি অফিসে কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শহর থেকে দূরপাল্ল¬ার বাস ছাড়েনি। চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও যাত্রীসংখ্যা কম ছিল। আগ্রাবাদে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পুলিশের সঙ্গে ছাত্র শিবির সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুইজন মারা গেছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিত্সকরা আফজাল নামে এক ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেন। তার পিতা মুহাম্মদ আনিস, কর্নেলহাট নজির কমিশনারের বাড়ি। এ ঘটনায় আহত মুহাম্মদ শফিক পরে মারা যান। মুহাম্মদ শফিক সিইপিজেডের ইয়ংওয়ান গার্মেন্টসের অপারেটর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্র শিবিরের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের একটি মিছিল দেওয়ানহাট থেকে বের হয়। মিছিলটি আগ্রাবাদ বাদামতলি মোড় যাওয়ার পথে রাস্তায় বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। মিছিলটি বাদামতলি মোড়ে পৌঁছার পর পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর বাদামতলি মোড়ে সোনালী ব্যাংকের সামনে থেকে মারাত্মক আহত অবস্থায় আফজালকে উদ্ধার করে পুলিশ। তার পেটে গুলি লেগেছে।