‘একুশের দিনলিপি’ প্রকাশের পর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান কয়েকটি প্রশ্ন রেখেছিলেন। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন: প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে বাংলা না উর্দু—কোন ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন? তার মতে, কখনো কখনো নাজিমুদ্দিন বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। আমরা যতদূর জানি, খাজা নাজিমুদ্দিন ভালো বাংলা জানতেন না বা বলতে পারতেন না। বক্তৃতা দেবার মতো বাংলা তিনি রপ্ত করতে পারেননি। প্রয়োজনবোধও করেননি। বাংলা না জেনে বাংলায় বক্তৃতা না করে যদি বাংলাদেশের হওয়া যায়, তাহলে কি দরকার ঝামেলা করে বাংলা শেখা? শহীদ সোহরাওয়ার্দীও ভালো বাংলা, লাগাতার বাংলা বলতে পারতেন না। তার বক্তৃতা ছিল- ভাঙা-বাংলায়, দোআঁশলা বাংলা। সেই বক্তৃতা আমি একবার শুনেছি যখন তিনি অবিভক্ত বঙ্গের সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী।
তাই বলে পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগ নেতার বক্তৃতা শুনতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সেখানে আমি যাইনি। তবে শুনেছি, তিনি নাকি বাংলাতেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ রহস্যের ‘গুমর ফাঁক’ রয়েছে বদরুদ্দীন উমরের ভাষা-আন্দোলন বিষয়ক বইতে। তিনি লিখেছেন, ‘খাজা নাজিমুদ্দীন ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে বাংলায় বক্তৃতা করেন। কিন্তু জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার মতো বাংলা ভাষা জ্ঞান তাঁর না থাকায় তাঁর বক্তৃতাটি উর্দু অক্ষরে লিখিত ছিল। বাংলা বক্তৃতার অক্ষরান্তর করেছিলেন মিজানুর রহমান’। মিজানুর রহমান সম্পর্কে একই কথা বলেন মোহন মিয়া ও নুরুল আমিন।
এ ঘটনা অনেককে সোনিয়া গান্ধির হিন্দিতে বক্তৃতা করার কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। তবে খাজা নাজিমুদ্দিন ও মিজানুর রহমানের ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। মিজানুর রহমান ছিলেন উর্দু রাষ্ট্রভাষার কট্টর প্রবক্তা ও প্রচারক। আর নাজিমুদ্দিন সাহেবও তাই। তার ওই বক্তৃতায় আরবি হরফে বাংলাভাষার ব্যবহার যে কতোটা সফল হয়েছে সে সম্বন্ধেও তিনি কথা বলেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সময় থেকেই হরফ ষড়যন্ত্রের কর্মকাণ্ড শুরু হয়। পূর্ববঙ্গে আরবি হরফে বাংলা লেখা ও শিক্ষাদানের জন্য প্রচুর অর্থ বরাদ্দ করা হয়। সেই সঙ্গে উর্দু শিক্ষা প্রসারের চেষ্টাও চলে।
বাংলাভাষা সম্পর্কে জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল—বাংলা বিরোধী দু’ধারী তরবারির মতন। একদিকে রাজনৈতিকভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা। অন্যদিকে চেষ্টা—বলা চলে চক্রান্ত—আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যবস্থা করে বাংলাভাষার বিকৃতি ঘটানো এবং ভাষাকে পূর্বঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সেই সঙ্গে উর্দু শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এ প্রচেষ্টা সাংস্কৃতিক চরিত্রেরও বটে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বাংলা-বিরোধিতার জন্য শুধু অবাঙালি রাজনীতিবিদ বা শাসকদের ওপর দোষ দিলে চলবে না। ‘মীর জাফরের বদরক্ত’ বহনকারী তথাকথিত বাঙালিও কম দায়ী নয়। পাকিস্তানের শাসকদল মুসলিম লীগের প্রায় সব বাঙালি নেতাই ছিলেন উর্দু রাষ্ট্রভাষার পক্ষে অর্থাত্ বাংলার বিরুদ্ধে। অথচ এদের মধ্যে কেউ কেউ একসময় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, বাংলা ভক্তও ছিলেন। বাংলায় সাহিত্যচর্চা করেছেন। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের টানে তারা ভেসে গেছেন। এই দু’চারজন মধ্যপন্থীর কথা বাদ দিলে বাকি সবাই ছিলেন রক্ষণশীল ঘরানার। রাজনীতিকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের রাজনৈতিক পথ চলা। তাই আরবি হরফে বাংলা—এমন হঠকারী ও আত্মঘাতী প্রচেষ্টার শরিক হতে পেরেছিলেন তারা। তাদের অপচেষ্টা প্রতিহত করতে ওই শিক্ষিত শ্রেণীর সন্তানদের অর্থাত্ তখনকার তরুণ প্রজন্মকেই স্লোগান দিতে হয়েছিল: ‘আরবি হরফে বাংলা লেখা চলবে না’, ‘হরফ ষড়যন্ত্র রুখতে হবে’ ইত্যাদি।
শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নন, রক্ষণশীল বাঙালি মওলানাদের ভূমিকাও ছিল এদিক থেকে বাংলা-বিরোধী। তবে এদের মধ্যে কট্টর বাংলা-বিরোধী হিসাবে পরিচিত মওলানা রাগিব আহসানের উগ্র তত্পরতার প্রভাব কম ছিল না। আরবি ও উর্দু নিয়ে তার মাতামাতি এবং বাংলাকে প্রাচীন সংস্কৃতির সন্তান হিসাবে চিহ্নিত করে তা পরিশুদ্ধ করার চেষ্টায় তার তুলনা বিরল। আরবি-উর্দুর পক্ষে ও বাংলা বিরোধী প্রচারে তার উন্মাদনার প্রমাণ মেলে তার লেখায়, বিবৃতিতে ও চিঠিতে।
এমনকি ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতেও তার অপচেষ্টা অব্যহত ছিল। তাই চিঠি লিখেছেন আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে যাতে উর্দুকে বিজাতীয় ভাষা হিসাবে গণ্য করা না হয়। যাতে মোহাজির অর্থাত্ বিহারীদের ভিন্ন চোখে দেখা না হয়। এমন কথাও বলা হয়, ‘প্রাদেশিকতা প্রচার করতে প্রশ্রয় দেবেন না’। তার আরো দাবি, যাতে ভাসানী বাঙালি জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় না দেন। পরামর্শ দিয়েছেন মোহাজিরদের হূদয় জয় করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে। এমনই ছিল এদের উর্দু-আরবি প্রীতি! ভাসানী অবশ্য মওলানা হয়েও এদের কথায় কান দেননি।
লেখক:ভাষা সংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
