ইকোনোমিস্টের নিবন্ধ

দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে পদ্মা সেতুর জন্য ধৈর্য ধরতে হবে

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৪২
লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনোমিস্ট-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি মাসেও দাতাদের সহায়তায় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বৃহত্তম প্রকল্প ছিল বাংলাদেশের পদ্মাসেতু। ১০ কি.মি দৈর্ঘ্যের পদ্মাসেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এর ভাগ্যে বিপর্যয় ঘটেছে। বাংলাদেশ সরকার গত ৩১ জানুয়ারি দাতাগোষ্ঠী বিশ্বব্যাংককে সেতুটি নির্মাণে করা অনুরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বিশ্ব ব্যাংক এই প্রকল্পে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে চেয়েছিল যেটি ঋণদানের ক্ষেত্রে কোনো একটি দেশকে এযাবতকালে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় সহায়তা। বিশ্ব ব্যাংককে অনুরোধ প্রত্যাহার করার পর অন্যান্য অংশিদার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) প্রকল্প থেকে সরে যায়। সরকারের অনমনীয় মনোভাবের কারণে দেশটির তিন কোটি মানুষকে (দক্ষিণাঞ্চলের) ঢাকা থেকে সড়কপথে বিচ্ছিন্নই থাকতে হবে। এজন্য তাদেরকে আরো ধৈর্য ধরতে হবে। বর্তমানে সরকার অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নতি করতে চাচ্ছে। গত বছর দেশটি মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত মাসে সরকার প্রথমবারের মতো একটি সাবমেরিন কেনার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাশিয়ার সহযোগিতায় এটি করা হবে। রাশিয়া ৫শ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। বিদ্যুত্ প্রকল্পের মূল শক্তি ইউরেনিয়ামও সরবরাহ করবে রাশিয়া। স্বাধীনতার আগে এই প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। যদি এটা ভালভাবে চলে তাহলে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ায় সপ্তম পারমাণবিক বিদ্যুত্ প্রকল্পের অধিকারী হবে। গত মাসে রাশিয়ার তৈরি অস্ত্র কেনার জন্য দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। রাশিয়া এক্ষেত্রে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিবে। নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়, সাম্প্রতিককালের পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, ২০১৩ সালে দেশটি অভ্যুত্থানের ঝুঁকিতে রয়েছে । বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যুত্ প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন আর কোনো দেশে হতে হয় না। বিদ্যুত্ সুবিধার ক্ষেত্রে ১৮৫টি দেশের মধ্যে সবার নিচে অবস্থান বাংলাদেশের, ১৮৫তম। দেশটির ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ এখনও বিদ্যুত্সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ সমস্যার সমাধানে দুই হাজার মেগাওয়াটের পারমাণবিক কেন্দ্র বেশ ভালো উদ্যোগ। এর ফলে একদিকে যেমন দেশের বর্তমান বিদ্যুত্ ঘাটতি দূর হবে, তেমনি ২০২০ সালের মধ্যে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের যে পরিকল্পনা রয়েছে সেক্ষেত্রে বড় একধাপ এগিয়ে যাবে সরকার। দেশে বর্তমানে বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুত্ উপাদনের মূল উত্স গ্যাসের পর্যাপ্ত মজুদ নেই। এছাড়া বিদ্যুত্ সমস্যার সমাধানে অস্থায়ী তেলভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কয়লাখনি থাকলেও এর উপর অনেক মানুষের বসতির জন্য উত্তোলন খুবই কঠিন। তাই, দেশের বিদ্যুত্ সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান হতে পারে পারমাণবিক শক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কোনো বিষয়ে একমত হতে না পারলেও পারমাণবিক শক্তির ব্যাপারে তাদের সম্মতি আছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ হওয়ায় প্রকল্পে পরিবেশগত কিছু সমস্যা আছে। কোনো কোনো বছর দেশের দুই-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বিদ্যুত্ উত্পাদনে সমস্যা তৈরি হলে বিকল্প জ্বালানির অভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বিদ্যুত্ ব্যবস্থা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রটি পদ্মা নদীর তীরে তুলনামূলক নিরাপদ স্থানেই স্থাপন করা হচ্ছে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ ইউরেনিয়াম পরিবহনের সময়ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর রূপপুর ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতও এর নিরাপত্তা চাইবে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে যে দীর্ঘ রাস্তা পার হয়ে ইউরেনিয়াম পদ্মাতীরে আসবে, সেটি বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক রাস্তা। আবার এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহন জনবহুল ঢাকার ভেতর দিয়ে যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সময়সাপেক্ষও। তবে ঢাকাকে পাশ কাটিয়ে যাতায়াত করতে হলে পদ্মা পার হতে হবে। আর সেক্ষেত্রে পদ্মাসেতুর বিকল্প নেই। তাই পদ্মাসেতু তৈরিতে সরকার যদি দ্রুত চীনকে সহযোগিতার কথা না বলে তাহলে দেশের প্রথম তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোকে হয়তো ঝুঁকি নিয়েই নৌপথে পার হতে হবে।