২৪ বছরে পুড়ে মরেছে ৪২ যাত্রী ঢিলেঢালা তদন্ত, কারো বিচার হয়নি

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:২৮
রাজধানীতে গত ২৪ বছরে হরতালের সময় যানবাহনে আগুন লাগিয়ে ৪২ যাত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় যে মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই। এসব ঘটনায় কাউকে গ্রেফতারও করা হয়নি। এসব মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, অনেক মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কয়েক দফা বদলি হয়েছেন। নতুন কর্মকর্তা এসেছেন আবার চলেও গেছেন। এসব কারণে তদন্তের তেমন একটা অগ্রগতি হয়নি। কেউ কেউ বলেন, মামলা ফাইলবন্দি হয়ে আছে। এক সময় হয়তো ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া হবে। ১৯৮৯ সালে সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন লাগিয়ে দেয় হরতাল সমর্থনকারীরা। মুহূর্তে বাসটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ২৭ জন যাত্রী পুড়ে যান। তখন রাজধানীসহ সারাদেশে এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। ঘটনাটি এখানেই শেষ। ওই মামলায় কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। পুলিশ মামলার একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট দিলেও পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলা পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর এ মামলার তদন্ত কর্মকাণ্ড চলে যায় হিমাগারে। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি জানান, মামলাটির ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। মামলাটির ব্যাপারে তিনি খোঁজ খবর নিবেন বলে জানান। এই ২৭ যাত্রী হত্যা মামলার অন্যতম আসামি সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পরিবহন নেতাসহ সকল আসামি অব্যাহতি পায়। ২০০৬ সালে খিলক্ষেত এলাকায় র্যাবের ক্রসফায়ারে পরিবহন নেতা মুন্না নিহত হয়। ২০০৪ সালের ৪ঠা জুন (হরতালের আগের দিন) রাত ৮টায় শেরাটন ক্রসিং-এ (রূপসী বাংলা হোটেল) যাত্রীবাহী বিআরটিসি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতালকারীরা। ঘটনাস্থলে একই পরিবারের চারজনসহ নয়জন পুড়ে মারা যায়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর আরও দুই যাত্রী মারা যায়। রমনা থানায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ কিছুদিন তদন্তের নামে নিরীহ মানুষকে গ্রেফতার করে হয়রানি নির্যাতন এবং গ্রেফতার বাণিজ্য করে মোটা অংকের টাকা কামিয়েছে। প্রকৃত আসামি গ্রেফতার হয়নি কিংবা তদন্তের কোন অগ্রগতি হয়নি। স্বজনহারারা জানতেও পারলো না কারা এ জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এ চাঞ্চল্যকর মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করেছিল। ডিবিও তদন্তের নামে একই বাণিজ্য করেছে। কিন্তু কোন কূল কিনারা করতে পারেনি। ২০০৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর কাউকে অভিযুক্ত না করে উক্ত হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ৭ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ১১ যাত্রী পুড়িয়ে হত্যা মামলা তদন্তভার সিআইডিতে ন্যস্ত করা হয়। সিআইডির সিনিয়র এএসপি খন্দকার আব্দুল হালিমকে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে জানান, এ মামলায় মিজানুর রহমান নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বিআরটিসি বাসটি লিজ নিয়ে চালাচ্ছিলেন। ঘটনার পর এ বাসের কন্ডাক্টর সুমন বিদেশে পালিয়ে গেছে। তিনি বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন। তাকে দেশে আনতে পারলে এ মামলার কিছুটা অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি জানান। ২০১০ সালের ১ জুলাই মগবাজারে যাত্রীবাহী ট্যাক্সিতে হরতালকারীরা আগুন লাগিয়ে দেয়। যাত্রী ফারুক হোসেন (২০) আগুনে পুড়ে মারা যান। সুমন নামে এক যাত্রী আগুনে ঝলসে যায়। এ হত্যার ঘটনায় রমনা থানায় মামলা হয়। জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এ মামলার তদন্ত চলছে বলে এক কর্মকর্তা জানান। গত বছর ২১ এপ্রিল খিলগাঁও ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশে ঈগল পরিবহনের বাসে হরতাল সমর্থনকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। বাসে ঘুমন্ত চালক বদর আলী বেগ (৪৮) পুড়ে মারা যান। এ হত্যা মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে। এ মামলার প্রকৃত আসামি কেউ গ্রেফতার হয়নি। তবে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি তদন্তকারী কর্মকর্তার। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে উত্তরা আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাত্রীবাহী বাসে হরতালকারীরা আগুন ধরিয়ে দিলে ব্যাংক কর্মকর্তা রাসেল মাহমুদ পুড়ে ছাই হয়ে যান। একই বাসে তার পিতা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামও ছিলেন। তিনি জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে যান। এ হত্যা মামলায় উত্তরা (পূর্ব) থানার পুলিশ শিবিরের রোকন সাইফউদ্দিন ও কর্মীসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে। ওসি জানান, জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ বলেন, আগুনে পুড়িয়ে বাসযাত্রী হত্যার সকল মামলা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেফতারে কোন ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি জানান। রাজধানীর বাইরে ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিলেট শহরের দক্ষিণ সুরমা এলাকায় হবিগঞ্জ এক্সপ্রেস নামের একটি যাত্রী বাসে হরতালকারীরা আগুন লাগিয়ে দেয়। কাজী নাসির নামে এক যাত্রী পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ১২ জন যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল। এ ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় মামলা হয়েছে। ইত্তেফাক সিলেট অফিস জানায়, উক্ত হত্যা মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারা সকলে জামিনে রয়েছে। এ হত্যা মামলায় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক নিখোঁজ ইলিয়াছ আলীও আসামি। এ হত্যা মামলার প্রকৃত আসামি কেউ গ্রেফতার হয়নি। তদন্ত আসলে হিম ঘরে রয়েছে। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার মত জঘন্য ঘটনা ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রতিটি মামলা মনিটরিং সেলের আওতায় এনে তদন্ত কার্যক্রম চলবে। জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।