মূল ফিচার

সেলুলয়েডে স্বপ্ন যাদের

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৭:৪০
ওদের আলোকপ্রক্ষেপণ যন্ত্র মানে অনেকগুলো একশ ওয়াটের ফিলামেন্ট বাল্ব! ক্যামেরা এখন ওদের হাতের ইশারা যেন বুঝতে পারে, তা না হলে নিজের ওয়েল্ডিং করে বানিয়ে ফেলা ট্রলি দিয়ে যন্ত্রটা চালানো চাট্টিখানি কথা নয়। সদ্য শৈশব পেরিয়ে তারুণ্যে পা দেওয়া এই তরুণ নির্মাতারা বন্ধুদের সাথে নিয়ে তৈরি করে ফেলেছে অসাধারণ কিছু শর্ট ফিল্ম। কেউ আবার একাই প্রযোজক থেকে শুরু করে প্রোডাকশন বয় বনে গিয়েছিলেন। চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে হয়ে যাওয়া শিশু চলচ্চিত্র উত্সবের বিজয়ী নির্মাতাদের মধ্য থেকে সিয়াম, তুষার, মাসুদ আর সুস্মিতাকে নিয়ে তরুণকণ্ঠ বসেছিল এক আনন্দ আড্ডায়, সঞ্চালনা করেছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ও ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু স্বপ্ন দেখার বয়স ছেলেটার, খুব শখ করে চাইলেন মুভি বানাবেন। সাতজন বন্ধু মিলে শুরু হলো তাদের মুভি তৈরির মিশন। কেউ পরিচালক, কেউ সম্পাদক, কেউবা শিল্প নির্দেশক! নাম ছাড়া কেমন দেখায়? ‘এ-থ্রি প্রোডাকশন’ নাম দিয়ে দেওয়া হলো। খোঁজ পাওয়া গেল, চিলড্রেন’স ফিল্ম সোসাইটি নামের একটি সংগঠন কর্মশালা করবে চলচ্চিত্র নির্মাণের উপর। স্বপ্নবাজ যে ছেলেটার কথা বলছি, তিনি তার বন্ধুকে নিয়ে হাজির হলেন কর্মশালায় অংশ নিতে। কিন্তু কর্মশালায় অংশ নিতে গিয়ে দেখা গেল বিরাট লাইন, ইন্টারভিউ নিয়ে তবেই সুযোগ দেওয়া হবে। সুযোগটা হয়েও গেল, কর্মশালায় শিখলেন অনেক কিছু। নিজেদের তখন রীতিমতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পরিচালক বলা চলে। এবার কাজ শুরুর পালা। মুভি বানাতে কতকিছুর প্রয়োজন! মুভি কেন? ছবি তুলতেই যে ক্যামেরার দরকার সেইরকম একটা ক্যামেরাও তখন তাদের হাতে নেই। অথচ তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই, মুভি একটা হবেই এবার। লতায় পাতায় বন্ধু, এমন একজনের কাছে ক্যামেরার খোঁজ পাওয়া গেল, তাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করান হলো। এবার আর পায় কে? প্রকৃত যোদ্ধার হাতে তলোয়ার চলে এলে তাকে কি কেউ আটকাতে পারে! তবে শেষরক্ষা হলো না! নির্ধারিত দিনে ক্যামেরাওয়ালা সেই বন্ধু তার দামি ক্যামেরায় এসব ‘মুভি-টুভি’ বানিয়ে সময় নষ্ট করবেন না বলে জানিয়ে দিলেন। আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, চোখের জলে স্বপ্ন থাকে, সেই স্বপ্ন ঝরে যেতে দিতে নেই। তবে কখনও কখনও হার মানতে হয়, সেদিন ছেলেটা হার মেনেছিলেন। চোখ বেয়ে গড়িয়েছিল অনেক জল! একটা ক্যামেরার জন্যই আটকে গেল সব! আমাদের কেউ বলে দেয়নি, কিন্তু আমরা জানি, যেদিন চলচ্চিত্র উত্সবের দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্রের পরিচালক হিসেবে আরিফুল ইসলাম সিয়ামের নাম উচ্চারিত হলো, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। সেদিনও তার চোখে আনন্দাশ্রু ছিল, কারণ ক্যামেরার পেছনে ধন্না দিয়ে বেড়ানো ছেলেটাও ছিল সিয়াম। সে তার বন্ধু তুষারকে নিয়ে দশ মিনিটের চলচ্চিত্র ‘একাত্তরে’ নিয়ে এবার বাজিমাত করেছে চলচ্চিত্র উত্সবে। কোনো ভালো উদ্যোগই থেমে থাকে না। সেদিন সংগঠনের মনন ভাইয়া ক্যামেরা তাদের হাতে ক্যামেরা তুলে দিয়ে সাহায্য করেছিলেন বলেই এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া তাদের বন্ধু জিমের দুর্দান্ত এডিটিংও ছিল এই সাফল্যের পেছনের কারণ। একাত্তরের এক চিঠিকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে গেছে চার মিনিটের এই ফিকশন, কাহিনী যাই হোক, নির্মাণ আর নির্দেশনা দারুণ হয়েছে এই শর্টফিল্মটার। সিয়াম হাসতে হাসতে জানালেন, মাত্র আড়াইশ টাকা দিয়ে তারা নির্মাণ করেছেন ফিল্মটি, অথচ পুরস্কার হিসেবে তারা পেয়েছেন পঁচিশ হাজার টাকা। তাদের এই প্রাপ্তি ছিল আশাতীত, যোগ করলেন তারই সহপরিচালক তুষার। সিয়াম আমাদের দেশের বাণিজ্যিক ছবি নিয়েও বেশ ভাবেন। যতই তরুন হোক তারা, তাদের চিন্তাভাবনা অনেক বেশি স্পষ্ট ও সূক্ষ্ম। তার মতে চলচ্চিত্রটা সব শ্রেণীপেশার মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। আর আর্টফিল্মকে যারা নাটক বলে, তাদেরও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। তুষার এই সময়ে জানালেন ‘একাত্তরে’র শুটিংয়ের কথা। দুইদিনে পুরো শুটিংয়ের কাজ করা হয়েছিল। আড়াইশ টাকাতে কাজ হয়েছে ঠিক, তবে তার হাজার টাকার চাদরটা লাইটিংয়ের কাজ করতে গিয়ে পুড়ে গেল। এই সবকিছু পেরিয়েই প্রথম চলচ্চিত্রেই তাদের এই অর্জনে যারপরনাই খুশি সবাই। লায়লা কবির সুস্মিতা, স্ট্যামফোর্ড কলেজে পড়ছেন তিনি। দারুণ চটপটে এই মেয়েটা সব কিছুতেই বেশ অস্থির, শৈশব থেকেই কোনো কাজে তাকে কেউ আটকাতে পারে না। আর এই অস্থিরতার পরিচয়ই কি তিনি আরেকবার দিলেন? এক মিনিটেই বানিয়ে ফেললেন চলচ্চিত্র ‘প্যারাডক্স’। আসলে তা নয়, এক মিনিটেই যখন একটা বিষয়কে সুন্দরভাবে দেখানো যায়, সেটি আরও বড় অর্জন। এবারের শিশু চলচ্চিত্র উত্সবে তার চলচ্চিত্রটি পেয়েছে বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার। এর আগেও অবশ্য তিনি এক মিনিটে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, চ্যানেল আইয়ের জন্মদিনে সেটা প্রচারও হয়েছে। তবে না, এক মিনিট নিয়েই নয়, ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রেই ক্যারিয়ার গড়বেন তিনি, তেমনটাই ইচ্ছে। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো সুযোগ আমাদের দেশে আছে কি? তিনি বললেন, আশপাশের সবকিছুর মতো এই ক্ষেত্রটাও বদলাচ্ছে, পুরোদস্তুর নির্মাতা হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া কোনো ঘটনাই না। সুস্মিতার চলচ্চিত্রে আসার গল্পটা মূলত আরেক খুদে নির্মাতা রায়হানের হাত ধরেই। সিটিএফবি’র সাথে পরিচয়ের পর থেকেই অনেকগুলো কর্মশালাও করে ফেলছেন তিনি। আর এসবের জন্য তার পড়ালেখায় কোনো ক্ষতি হয় না, সময়ের কাজ সময়ে করে ফেললে সবই সম্ভব। সুস্মিতার সব কাজে কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে সিটিএফবি। ভবিষ্যতে আরও অনেক কাজ করার ইচ্ছা তার—কোনটা রেখে কোনটা আগে করবেন, সেটাই এখন তার ভাবনার বিষয়! পরিবার থেকে অনেক সহযোগিতা পান তিনি। জানালেন, এবার পুরস্কার পাওয়ার পর রীতিমতো বড় পরিচালক হিসেবে বাসার সবাই তাকে দেখছে! চিন্তাভাবনাটা ছিল একটু অন্যরকম, ঐশ্বরিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘এপিটাফ’। আর এই চলচ্চিত্র পরিচালকও বেশ গম্ভীর স্বভাবের! তিনি হলেন এবারের উত্সবের বিশেষ পুরস্কার জয়ী আরেক চলচ্চিত্রকার মুহাম্মাদ মাসুদুল হক। তার চেহারার গাম্ভীর্যই বলে দেয়, ভাবনাটা তার কত গভীর। তার সাথে আমাদের আলোচনা হলো সমসাময়িক চলচ্চিত্র নিয়ে। তিনি জানালেন, আমাদের চলচ্চিত্র দুই ধরনের, একটা ব্যবসা করে আরেকটা পুরস্কার পায়। এই ধারা থেকে বের হয়ে আসা দরকার। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ছবির নাম উল্লেখ করে তিনি জানালেন, এগুলো পরিবর্তন নিয়ে আসছে আমাদের কাজে। এফডিসি-বিমুখ হলেই হবে না, এটাকে আরও আধুনিক করে শিল্পী-পরিচালদের একত্রিত হতে হবে, কাজের ক্ষেত্রে প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে আসতে হবে। শিল্পের খাতিরে সবার এক কাতারে আসা উচিত। এই যার ভাবনা, তিনিও কিন্তু পড়াশোনাটা ঠিক রেখেই কাজ করছেন, কারণ এই বিষয়টার গুরুত্ব সবার আগে। মাসুদ এর আগেও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশ নিয়েছেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র ফেল্টুস এক ছাত্রকে নিয়ে, নাম ‘ফেলুদা’। এবার নিজের গড়া ম্যাজিক ফিল্ম ফ্যাক্টরির ১৬ মিনিটের ‘এপিটাফ’ নিয়েই বিজয়ী হয়েছেন তিনি।