যমুনা পাড়ের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪২
ভাঙ্গন-প্লাবনে সর্বস্বান্ত সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চর ও গ্রামাঞ্চলের প্রায় ২৫ হাজার দরিদ্র নারী-পুরুষ কাজ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রায় ৭৮০২টি গৃহহীন পরিবার পেয়েছে বন্যা যাতে ছুঁতে না পারে এমন স্থানে বতসভিটা। বলার অপেক্ষা রাখে না এ কাজ ও বসতভিটা তাদের প্রাত্যহিক জীবন-যাপনকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। জানা গেছে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)-এর আর্থিক সহায়তায় মানব মুক্তি সংস্থা (এমএমএস) নামক স্থানীয় একটি এনজিও দুঃস্থ ও অসহায় মানুষদের জন্য এ ব্যবস্থাগুলো করে দিয়েছে। তারা ‘ইনহ্যান্সিং রেজিলিয়েন্স টু ডিজাস্টার এন্ড দ্য ইফেক্ট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি দুটি পর্বে পরিচালিত হচ্ছে। একটি হলো ফুড ফর এ্যাসেট এবং অপরটি হল ফুড ফর ট্রেনিং। যে সমস্ত নারী-পুরুষ দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বাস করত এবং দীর্ঘ দিন ধরে নানাবিধ দুর্যোগ যেমন-বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের সাথে লড়াই করে আসছিল, কেবল তাদেরই এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে করে তারা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পায় এবং বিভিন্ন দুর্যোগকালে দুর্যোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়। সূত্র মতে, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ, কাজীপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, কামারখন্দ, বেলকুচি, শাহজাদপুর এবং চৌহালী উপজেলার কমপক্ষে ২৪ হাজার নারী-পুরুষকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ছয় মাসের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণকালে তাদের প্রত্যেককে মাসে ১৩শ’ টাকা করে প্রদান করা হয়। পরে তাদের মাটি কাটা ও বাড়ির আঙ্গিনায় সবজি চাষসহ বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসব নারী-পুরুষের অনেকেই বিভিন্ন এলাকায় কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। নিজেদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে তাদের অনেকেই সংসারের খরচ চালাচ্ছেন। কেউ কেউ বাড়তি আয় করতেও শুরু করেছেন। সদর উপজেলার মহেশকাঙ্গলা চরের একটি গুচ্ছগ্রামের নূরজাহান বেগম (৩৫) বললেন, এক সময় আমি এবং আমার স্বামী দু’জনেই বেকার ছিলাম। ফলে আর্থিক অনটনে পড়ে প্রায়ই আমাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকত। স্বামীর নিয়মিত কাজ না থাকায় স্বল্প আয়ে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া চালানো সম্ভব হত না। এতে করে আমরা ভীষণ অসুখী জীবন-যাপন করছিলাম। কিন্তু বর্তমানে আমার আর সেই দুর্ভোগ নেই। কারণ আমি বিভিন্ন কাজের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। ফলে মঙ্গাকালেও আমি কর্মহীন থাকি না। সারা বছরই আমার হাতে কিছু না কিছু কাজ থাকে। মাটি কাটার কাজ করে আমি প্রতিদিন ১৭৫ টাকা অথবা তার সমমূল্যের খাদ্যদ্রব্য পেয়ে থাকি। পাশাপাশি বাড়িতে শাক-সবজি চাষ করেও সেখান থেকে বাড়তি আয় করি। তিনি আরো বলেন, তার নিয়মিত আয় দিয়ে তিনি ইতিমধ্যেই তার স্বামীর জন্য একটি রিকশা কিনেছেন। ফলে তিনিও আর বসে নেই। উভয়ের আয় দ্বারা তাদের সংসার এখন বেশ ভালো চলছে। তাদের দুটি ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। অপরদিকে মহেশকাঙ্গলা এলাকার অপর একজন মহিলা শ্রমিক আমিনা খাতুন (২৮) জানান, বিয়ের পর তার সংসারে চরম অভাব বিরাজ করছিল। কারণ, বার বার নদী ভাঙ্গন ও বন্যার কবলে পড়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। বর্তমানে তিনি স্বামী সংসার নিয়ে বেশ ভালো আছেন। সংসারের কাজের ফাঁকে তিনি এখন মাটি কাটার কাজ করেন। পাশাপাশি বাড়ির আঙ্গিনায় শাক-সবজি চাষ করেন। ফলে তিনি মাসে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা আয় করতে পারেন। সংসারের সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে তার দেড় হতে দুই হাজার টাকা সঞ্চয় হয়। ফলে তাকে আর কারো কাছে হাত পাততে হয় না। অপরদিকে একই প্রকল্পের আওতায় ৭১৫০টি পরিবারকে গুচ্ছগ্রামে বাড়ি করে দেয়াসহ ৬৫২টি পরিবারের বসতভিটা উঁচু করে দেয়া হয়েছে। ফলে এ পরিবারগুলো যেমন পেয়েছে মাথা গোঁজার ঠাঁই, তেমনি পেয়েছে বন্যা ও নদী ভাঙ্গন মুক্ত পরিবেশ। এ উপজেলার বর্ণি গুচ্ছগ্রামের গোলবার হোসেন (৪৫) বলেন, নদী ভাঙ্গনে তার পাঁচ-পাঁচবার বাড়ি হারাতে হয়েছে। ফলে তিনি নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে তার আর নিঃস্বতা নেই। কারণ তিনি এখন কাজ পেয়েছেন, এমনকি মাথা গোঁজার জন্য বর্ণি গুচ্ছগ্রামে একটি বাড়িও পেয়েছেন। এতে করে তিনি তার পরিবার-পরিজন নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। এ প্রসঙ্গে কথা বললে মানব মুক্তি সংস্থা (এমএমএস)’র পরিচালক হাবিবুল্লাহ বাহার এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা সরকারের পাশাপাশি দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের জীবিকার মানোন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে। তবে প্রকল্পের কর্ম এলাকা দুর্গম চর ও গ্রামাঞ্চল হওয়ায় তাদের এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে। কেননা, ওসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত নয়। তথাপি তারা গুচ্ছগ্রাম, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং বাড়ি উঁচুকরণসহ নানাবিধ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত করে সুবিধা বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে জোর ভূমিকা পালন করতে চান বলে আশা ব্যক্ত করেন।