নিজের যোগ্যতা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন সফলতার চূড়ায়। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ার সাজিয়েছেন। নিজস্ব ভালো লাগা থেকেই শুরু করেন রেস্টুরেন্টের কাজ। তবে এর জন্য শুধুমাত্র বসে থেকে নির্দেশনা দিয়েই কাজ করা সম্ভব নয় বলেই প্রয়োজনে কিচেনে যেতে হয় তাকে, এমনকি তিনি মাঝে মাঝে চলে যেতেন বাজারেও। নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন গ্রাহকের সাথে সরাসরি। এর মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, অন্যান্য সবকিছু নিয়ে কাজ করেছেন এখন। কথা বলছিলাম, স্বনামধন্য রেস্টুরেন্ট নান্দুসের জেনারেল ম্যানেজার কেএসএম মুহিথ-উল বারী সম্পর্কে। সফল এই মানুষটির সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মোহাম্মদ মোর্শেদ নাসের
আপনার শুরুর গল্পটি জানতে চাই
আমি ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েও সুযোগ পাইনি। তখন ঢাকা কলেজে জিওগ্রাফিতেই ভর্তি হতে হলো। সেটাতেই অনার্স মাস্টার্স করে ফেললাম। আর বাবা যেহেতু অনেক মেধাবী ছিলেন, তাকেই আমরা আদর্শ মানতাম। তিনি কিছুটা দেরি করে ফেলেছিলেন কাজ শুরু করতে, তাই আমি দেরি না করে তখনই কাজ শুরু করে দিই। যে কাজই পাব, শুরু করে দিতে চেয়েছি শুধু। তখন জিএমজিতে পরীক্ষা দিলাম। আমার হয়েও গেল। আর এটা শুনলাম যে রাজশাহী ছাড়া তখন আর কোথাও কাজের সুযোগ নেই। রাজশাহীতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা তাই নিয়েই নিলাম। নয় মাস পর আমি রাজশাহী থেকে চলে আসি। পত্রিকায় দেখতে দেখতেই রবিনটেক্স নামে একটা অ্যাপারেল মার্চেন্টাইজিং কোম্পানির খোঁজ পেলাম। ওখানেও বেশিদিন কাজ করা হয়নি। এমজিএইচ গ্রুপে তারপর আমি কাজ শুরু করি। সেখানেই আমি শিখেছি, নিজের কাজের পরিবেশ নিজেই তৈরি করে নিতে হয়। এখানে কাজ করার অনেক স্বাধীনতা পেয়েছি আমি। এখানে কাজ করার সময় বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার, তখন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর প্রোডাক্টের বিষয় দেখতে হতো আমাকে। সেলস টার্গেটের বিষয়টাও আমি দেখতাম। কোন কাজে আমাদের ঘাটতি রয়েছে, কোন দিকটাতে নজরে দেওয়া উচিত, অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে আমাদের ভিন্নতা। এই দিকটাতে খেয়াল রাখতাম। সকাল থেকে সারাদিন অনেক তথ্য সংগ্রহ করতে হতো। যাই হোক, তারপর আমার সাথে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জয়েন করল। এতে কাজ করার খুব সুবিধা হলো আমার। যে কাজগুলো ম্যানুয়ালি করতাম, সেগুলোই সফটওয়্যারের আওতায় এনে সহজে করে ফেলতাম। অ্যানালাইসিস করতেও বেশ সুবিধা হতো আমার। তখন চাইছিলাম আমি নিজের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসব। আর গ্যালিলিওর সাপ্লাই চেইনে কাজ করেছি কিছুদিন। এই সময়ে সাত আটটা কোম্পানির সাপ্লাই চেইনটা আমার দেখতে হতো। কোম্পানির নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করে ডিস্ট্রিবিউশনটাকে আপডেট করার চেষ্টা করেছি। নেট সেই সময়ে বেশ আস্তে কাজ করত। এর মধ্যেই নতুন একটা ফুড বিজনেস শুরু হলো। আর তাদের অজ্ঞতার কারণে প্রথমেই বড় একটা লাভ তো দূরে থাক, ক্ষতির মুখ দেখতে হলো। আমাকে তখন তাই সেখানে ডাকা হলো। এখানেই সাপ্লাই চেইন নিয়ে কাজ করার জন্য, ছয় মাস আমাকে এটা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হলো। রেস্টুরেন্টে কাজের জন্য প্রস্তাব আসল তখন। প্রথমে কাজ করতে চাইনি তেমন। পরে অবশ্য আমি শুরু করি। তখন আমি শিখেছি যে কাজ করতে হলে অনেক বেশি অগ্রগামী হতে হয়, বসে থেকে শুধু নির্দেশনা দিয়েই কাজ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনে কিচেনে যেতে হবে, এমনকি আমি মাঝে মাঝে চলে যেতাম বাজারে ভালো জিনিসটা কেনার উদ্দেশ্যে। আর এখানে যেহেতু গ্রাহকের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ আছে, তাই খুব সতর্ক থাকতে হয় কাজ করার সময়। ভাবনা ছিল, যেই লক্ষ্য থেকে কাজ শুরু করেছি, সেটা কতদিনে সফল হবে? আমি তখন মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং, সবকিছু নিয়ে কাজ করেছি। আর নান্দুসে যে আমরা খেয়ে এসে চলে যাই, কিন্তু দেখি না, এর পেছনে কত জন কাজ করছে, কতটা পথ পার করেই তারপর গ্রাহকের কাছে কোন খাবার তুলে দেওয়া হচ্ছে।
১২ বছর পরে এসে কী মনে হয়? ক্যারিয়ারে আপনার লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে?
আমি আসলে খুব শুনতাম যে, নিজের ট্র্যাক পরিবর্তন করলে ক্যারিয়ারে ভালো অবস্থান তৈরি করা যায় না। কিন্তু আমি বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করে চেয়েছি সবকিছু শিখতে। কাজের পরিবেশই আমাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, একজন ভালো এক্সিকিউটিভ হতে গেলে এই জিনিসটা খুব জরুরি।
কর্পোরেট দুনিয়াতে সিনিয়রদের কতটা হেল্পফুল হওয়া উচিত?
আমরা এখানে সকালে আমাদের লক্ষ্য নিয়ে বসতাম। এমনকি এখানের অফিস অ্যাসিস্টেন্টও বসত আমাদের সাথে। সবার ভাবনাগুলো শেয়ার করা হতো। আবার দিনশেষে দেখতাম আমাদের কাজ কতটা শেষ করতে পারলাম, আর সেটা কেমন হলো। সে জন্যই আমাদের উচিত কাজের ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্য নেওয়ার। সিনিয়ররা নিজে থেকে এসে অনেকসময় তার আইডিয়াগুলো শেয়ার করতেই পারে, এতে কোনো সমস্যা থাকার কথা না। আর আমার ক্ষেত্রেও চেয়েছি তরুণদের সাথে কাজ করতে হলে অনেক বেশি ফ্রেন্ডলি হতে হবে। এই টিমটা অনেক বেশি ইউনিক। আমরা সবাই সবার আইডিয়া শেয়ার করি, সেইভাবে কাজ করার চেষ্টা করি। সবচেয়ে কমবয়েসী যে সদস্য, তার কথাও আমরা শুনি। সে যদি ভুল করে, তখন আমরা তার ত্রুটির জায়গাটা তুলে ধরি। তাদেরকে সরাসরি না বলে দিলে হয়তো তারা আইডিয়া নিয়ে আর ভাববে না।
নিজের অবসন্নতা কাটিয়ে ওঠেন কীভাবে?
আসলে এখানে যেই টিমে কাজ করছি, এখানে সবাইকেই অনেক বেশি সময়সচেতন হতে হয়। আমাদের আসলে কোনো লিমিট নেই, আবার মন খারাপও করে বসে থাকারও সময় নেই। তাহলেই পিছিয়ে পড়তে হবে। আর আমার জীবিনের দর্শন হচ্ছে সাধারণ থাকা, এখানে থেকেই নিজের জন্য কতটা করা গেল, সেটাই সার্থকতা। আমি জীবনের অল্প সময়ে যতটা পারি সেটা করতে চেয়েছি। সময়টা তো খুব বেশি না, যতটা পারা যায় উপভোগ করে নিতে হবে। আর লক্ষ্য বলতে হলে বলতে হয়, আমি আমার পরের প্রজন্মের জন্য একটু বেশি কিছু করে যেতে চাই।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আপনার ভাবনা এবং ভবিষ্যত্ লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে চাই ?
যতটুকুই দেখা যায় যতটুকু ভাবা যায় ততটুকুই উপভোগ করা দরকার। আমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যেতে চাই। আমি যে কষ্ট করে আমার ক্যারিয়ারটি তৈরি করেছি সেভাবে হয়তো ওরা পারবে না। তাই ওদের কাজের ক্ষেত্রটাকে আরও সহজ করে গড়ে তোলাটাই আমার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। যেমন আমার বাবা তিনি তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন দেশের বাইরে থেকে, এবং পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে এসে এখানে একটি বাড়ি করেছেন। তো স্বাভাবিকভাবে আমার উচিত এই অবস্থান থেকে আরও উন্নতির দিকে যাওয়া। তাই আমার দায়িত্ব আমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কিছু করা।
ছবি :দীপঙ্কর দীপু
