ট্রেন্ড

ফাগুনের পোশাক প্রস্তুতি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪৯
প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে যেন মন কেমন করা, উদাস আর চঞ্চল সমীরণের প্রগাঢ় উচ্ছ্বাসজাগা আবাহন। মাধবী আর বোগেনভিলিয়ার ঝাড়ে রঙিন প্রজাপতি আর ফড়িংয়ের গুঞ্জরিত ওড়াওড়ি। প্রকৃতির যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই যেন ঝকঝকে বর্ণোজ্জ্বলতার ছোঁয়া। তাই ফাগুন দিনের প্রথম প্রহরে যে যেখানেই থাকুক না কেন সবাই চাই কিছু ফাগুনের রং লাগুক পোশাক, তাই নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। কোকিলের হূদয়কাড়া কুহরণে নিসর্গের ক্যানভাসে উদ্ভাসিত হয় ঋতুবদলের অমোঘ প্রহর। যে প্রহরের সান্নিধ্যে সমগ্র চরাচরে নতুন এক ছবির উন্মেষ ঘটে। বসন্তের ওই উন্মেষের কথা মাথায় রেখেই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন এক অনন্য বসন্তকালীন কবিতা। যার পঙক্তিতে বসন্তের বন্দনা ঝরে পড়ে অমিয় ঐশ্বর্যে—‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত।’ সামনে বসন্ত। বাঙালির আঙ্গিনায় থোকা থোকা, বসন্তের আরক্তিম ছায়ার পালক যেন বিছিয়ে দিয়েছে এক উন্মাতাল আবেগের রোদ আর জ্যোত্স্নারাজি। সকালবেলার সবুজ দূর্বাঘাসে হালকা রৌদ্রাঙ্কিত শিশিরকুচির মনোমুগ্ধকর দৃশ্যাবলি আর অদূরের লাল আগুনঝরা কৃষ্ণচূড়ার শাখায় শাখায় সবুজ পাতার ঝালর সরিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের সমারোহ বসন্তের আগমন বার্তাকে যেন আরও প্রবলভাবে জানিয়ে দেয়। বসন্তের দুপুরগুলো উদাসীনতায় মোড়ানো হলেও বিকেলগুলো ভীষণ উন্মুখর হয় ফুরফুরে দখিনা হাওয়ায়। চাঁদের কিরণে আবৃত বসন্তকালীন সন্ধ্যা আর রাত্রির মহিমার যেন কোনো কিছুর সঙ্গেই তুলনা চলে না। হলুদ বসন্ত দিনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন বাঙালির জীবনধারাকে ভাবাপ্লুত করে তোলে। তাদের দৈনন্দিন জীবনেও চলে আসে বিপুল পরিবর্তন। অন্তরজুড়ে বসন্তের রং যে আবেগ সঞ্চার করে তার প্রভাবটাও গভীর ব্যঞ্জনায় রোজকার জীবনযাপনে প্রতিফলিত হয়। আর তার প্রকাশটা প্রগাঢ়রূপে ধরা দেয় পোশাকের মধ্য দিয়ে। সৈয়দা শাহনিলা কাজ করেন একটি দাতা সংস্থায়। বসন্তের প্রথম দিনটিতেই অফিসের কাজে যেতে হবে ঢাকার বাইরে। কিন্তু তাই বলে কি বসন্ত বরণ হবে না? অবশ্যই হবে। শাহনিলা একটি ফতুয়া কিনেছেন বাসন্তী রঙের। তাতে হাতের কাজ এবং চুমকি বসানো রয়েছে। শাহনিলা বলেন, ‘এই পোশাকটি পরেই বেরিয়ে পড়ব অফিসের কাজে। অফিসে পরার জন্য এটি উপযোগী পোশাক, সেই সঙ্গে ফ্যাশনেবল এবং বসন্তকে বরণ করার পোশাক।’ রুবাইয়া খন্দকার কাজ করেন একটি এনজিওতে। অফিসে মেয়েদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় যেকোনো উত্সব তারা উদযাপন করেন নিজেদের মতো করে। এ বছর পয়লা ফাল্গুনে অফিস ছুটি। হলে কী হবে, রুবাইয়া বললেন—সবাইকে বলা আছে পরদিন যেন সবাই তাঁতের শাড়ি পরে অফিসে চলে আসেন। হোক সেটা হলুদ, লাল বা সবুজ। সবাই মিলে দারুণ মজা হবে। ফ্যাশনে বসন্তের ছোঁয়া দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো সময়ের সঙ্গে মিল রেখে তারা তৈরি করেছে নানা রঙের বসন্তের পোশাক। তারা ফাল্গুনের পোশাকের ফ্যাশনে উজ্জ্বল রঙকে প্রাধান্য দিয়েছে। তাদের আয়োজনে রয়েছে বাহারি রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, থ্রিপিস, টি-শার্ট, শার্ট ইত্যাদি। এসব পোশাকে রয়েছে বসন্তের ছোঁয়া। পোশাকের মধ্যে বসন্ত এসে যেন নিজে স্পর্শ করেছে। তারই প্রকাশ এখানকার প্রতিটি পোশাকে। ফাল্গুনকে ঘিরে পোশাকগুলোতে কাজ করা হয়েছে নানা ব্লক, টাইডাই, স্প্রে ব্লক, চুনরি, স্ক্রিনপ্রিন্ট, কারচুপি ইত্যাদি। এখানকার পোশাকগুলো যেন ফাল্গুনের বার্তা নিয়ে আসে। বসন্তের আগমনের বার্তাকে স্বাগত জানাতে ফ্যাশন হাউসগুলো আয়োজন করেছে ফাল্গুনী পোশাকের মেলা । এখানে সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া ইত্যাদি পোশাকের মাধ্যমে বসন্তকে প্রকাশ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে তরুণ-তরুণীর রুচির কথা। আঁকা হয়েছে তাদের মনের ছবি। বসন্তকে মাথায় রেখে শাড়ি কাপড়ের দোকানে যেন বসন্তের রং লেগেছে। বাংলার ছয় ঋতুর ছয় রং। তবে কোনো কোনো ঋতুতে বাঙালি মেতে ওঠে সার্বজনীন রঙে। তেমনই এক ঋতু বসন্ত। আর তাই এখন দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বাসন্তী, গেরুয়া, লাল রঙের শাড়ি। এবারের বসন্ত রঙিন হয়ে উঠবে টাঙ্গাইলের নানা রঙের শাড়িতে। যারা অল্পবয়সী এবং সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে কাটাবেন, তারা সাধারণত টাঙ্গাইলের শাড়িতে ব্লক বা স্প্রে করা শাড়ি পরবেন। শাড়ির রঙে বাসন্তী, লাল আর সবুজই প্রাধান্য পাবে। সেই সঙ্গে এই বয়সীদের খোঁপায় থাকবে পমপম, জারবারা বা লাল গাঁদা ফুল। আবার যারা অফিস করবেন তারা সেদিন হয়তো চিকন পাড়ের তাঁতের শাড়ি পরবেন। সঙ্গে হয়তো খুবই উত্সব-আমেজের রংচঙে ব্লাউজ পরতে পারেন। একটা পাটভাঙা তাঁতের শাড়ির সঙ্গে কাচের চুড়ি আর খোঁপাভর্তি গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলই যেন চিরায়ত বসন্তের সাজ। কেউ কেউ এই দিনে কপালে আঁকেন মঙ্গলফোঁটা। অফিস করবেন যারা, তারা কিন্তু মোটেই ভাববেন না আমাদের আর বসন্ত কী? নতুন শাড়ি না কিনলেও একটা হলুদ, লাল বা সবুজ জাতীয় শাড়ি বেছে নিয়ে পরে ফেলুন না। সঙ্গে একটা বিপরীত রঙা চুন্দ্রি বাটিক বা লেইস বসানো ব্লাউজ হলে মন্দ হয় না। অফিসে একটা কেজো ভাব রাখতে চাইলে আর কিছু নয়, একটা ছোট্ট টিপ পরে ফেলুন। ব্যস, অফিসের গাম্ভীর্যও নষ্ট হবে না আবার কাজের মধ্যেই নিমন্ত্রণ জানাতে পারবেন ঋতুরাজকে। যারা শাড়ি পরে অভ্যস্ত নন তারা কিন্তু নির্দ্বিধায় পরতে ফেলতে পারেন সালোয়ার-কামিজ অথবা ফতুয়া। বাটিক কিংবা হাতের কাজের লোকজ মোটিফে নকশা করা ফতুয়া বেশ মানানসই হবে। ফতুয়া পরলে সঙ্গে একটা মালা পরে নিন পুঁতির। দেখবেন অফিসের কাজের মধ্যে কোনো ধরনের জাঁকজমক ছাড়াই আপনার সাজে এসে যাবে উত্সবের ভাব। আর কিছু না হলেও একটা একরঙা কামিজের সঙ্গেই চলতে পারে নানা রঙে টাইডাই করা ওড়না। অফিসেই বসন্তবরণ অফিস তো করতেই হবে, তাই বলে কি বসন্তবরণ হবে না। বসন্তের পোশাক, হালকা সাজ আর অফিসের কাজ—এই দিয়েই বরণ করুন ঋতুরাজকে। চাকরিজীবী মেয়েরা চিকন পাড়ের তাঁতের শাড়ি বেছে নিন। সঙ্গে বিপরীত রঙের বাটিক বা লেইস বসানো ব্লাউজ। কপালে ছোট্ট টিপ, আর খোঁপায় দুই-একটা ফুল। ব্যস এবার কাজে কাজেই হোক বসন্তবরণ। শাড়ি পরতে না চাইলে লং ফতুয়া বা সালোয়ার-কামিজ পরুন। গলায় পুঁতির মালা আর চুলে তাজা ফুল। অফিসে খুব উজ্জ্বল পোশাক পরতে না চাইলে ওড়নাটা কাঁচা হলুদ, বাসন্তী বা কমলা রঙের বেছে নিন। এবারের বসন্তে অফিস আছে বলে বসে বসে কেবল অফিসই করতে হবে তা নয়, যে যেখানে যে কাজেই থাকি না কেন, অন্তত পোশাকে এবং সাজে তো প্রকাশ করতে পারি ‘মধুর বসন্ত এসেছে...।’ বসন্তের আরও একটি বিশেষত হলো— বসন্তেই ঢাকায় আয়োজিত হয় প্রাণের একুশে বইমেলা। বসন্ত এবং বইমেলা যেন নগরজীবনেরও আবেগকে পৌঁছে দেয় অসীম কাব্যিকতায়।