আমার বন্ধুর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ছোট বেলায় সে তার বাবার সাথে প্রতি ১৬ ডিসেম্বর শহীদ মিনারে ফুল দিতে যেত। যখনি ওর বাবা শহীদ মিনারের কাছে যেত তখন তার দু’চোখ দিয়া অজরে পানি পড়ত। সে তখন তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করত, বাবা তুমি কাঁদছ কেন?
আজ তো তোমার আনন্দের দিন। তোমরা তো এই দিনটির জন্যই দশ মাস যুদ্ধ করেছ। তোমার কত সহপাঠী জীবন দিলো ,কত রক্ত ঝরল, তুমি না আমাকে বলতে তোমার বিভিন্ন জায়গায় ভয়ঙ্কর রাত কাটানোর কাহিনী। আমার বন্ধুর বাবা তখন আরও ফুপিয়ে কেঁদে উঠতেন আর বলতেন, বাবা তুই কি পারবি আমার সেই আনন্দের দিনটি ফিরিয়ে আনতে? যার জন্য আমরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি । আমার বন্ধু তার বাবার আনন্দের বিষয়টি তখন বুঝত না। সে এখন বড় হয়েছে। বাবাও এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। অনেকদিন হল বাবার সাথে শহীদ মিনারে যাওয়ার সুযোগ হয় না । গত ১৬ ডিসেম্বর আমি আর আমার বন্ধু তার বাবার সাথে অনেক দিন পর আবার শহীদ মিনারে যাই। শহীদ মিনারের ফুল দিয়ে আঙ্কেল শহীদ মিনারের ফলকগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আর তার দু’চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি বললাম আঙ্কেল কাঁদছেন কেন? আজ তো আপনার খুশির দিন। বিজয়ের এই দিনটির জন্যইতো আপনারা কতো কষ্ট করেছেন। তখন আঙ্কেল বললেন বাবা ঠিক আজকের এই দিনটির জন্য আমরা যুদ্ধ করিনি।
আমরা এমন একটি দেশের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করেছিলাম যা স্বাধীনতার ৪১ বছর পর আজও দেখতে পাইনি, এমন কি মৃত্যুর পূর্বে আদৌ দেখতে পারবো কিনা জানি না। এর পর আঙ্কেল একাধারে বলতে থাকলেন দেশের নানান সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার কথা। বাসায় যাওয়ার পর আঙ্কেল কিছু পত্রিকার কাটিং দেখালেন যেখানে কয়েকজন ছাত্র রিভলবার নিয়ে তার প্রতিপক্ষের দিকে তাক করে গুলি করছে, যা দেখে যুবক (ছাত্র) হিসেবে নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধার সামনে সত্যিই খুব ছোট মনে হয়েছে।
যে অস্ত্র দিয়ে জাতির সূর্য সন্তানেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশকে শত্রু মুক্ত করে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিল, আজ সে একই অস্ত্র দিয়ে জাতিকে আগামী দিনে যারা নেতৃত্ব দিবে সে নতুন প্রজন্ম নিজেরা নিজেদেরকে......(ছি)....(ছি)....
সত্যিই কোন মুক্তিযোদ্ধা এরকম কোন দেশের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করেননি।
তারা যুদ্ধ করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানি হায়েনারদের অত্যাচার, শোষণ, নির্যাতন, লুণ্ঠনের হাত থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষুধা, দারিদ্য্রহীন, শোষণমুক্ত একটি সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়তে যেখানে থাকবে না কোন হাহাকার, অন্যায়, থাকবে না কোন বঞ্চিতার আত্মচিত্কার।
কিন্তু আজ! আমরা কি পেয়েছি সেই কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা? আমাদের এ জাতির সূর্য সন্তানেরাও কি আজ স্বাধীনতার চার দশক পর পেয়েছেন তাদের প্রত্যাশিত সেই দেশটি? তারা স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অন্ধকার সময়ের সাথে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের তেমন পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছেন না, তাইতো বিজয়ের দিনেও তাদের চোখে অশ্রু দেখা যায়।
স্বাধীনতার পূর্বে এ দেশের উপার্জিত অর্থ, উত্পাদিত পণ্যের বিশাল একটা অংশ পশ্চিম পাকিস্তানিরা অন্যায়ভাবে সে দেশে নিয়ে যেত, কিন্তু আজ স্বাধীনতার পরও এ দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
খুন, হত্যা, গুম, ধর্ষণ এসব ছিল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের আতঙ্ক, কিন্তু আজ স্বাধীন বাংলাদেশে এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দৈনিক পত্রিকার পাতায় পাতায় প্রতিদিন ছাপানো হচ্ছে এ সব বিষয়।
পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে সারাদিন উদ্বেক উত্কণ্ঠায় থাকতে হয় না জানি কখন তাঁর সন্তান আবু বকর, নোমানির মত লাশ হয়ে ফিরে আসে।
আজ দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিকসহ সকল ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা। রাজনীতিতে বড় দল দুটি পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তার মাধ্যমে দেশের অর্থ লুটপাট করে জনপ্রিয়তার ধস নামায়।
কিন্তু এমনিতো আর দেশটাকে চলতে দেয়া যায় না। আমরা যারা নতুন প্রজন্ম, যারা আমরা ৭১ সাল দেখিনি, দেখলে হয়তো হায়েনারদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমাদের কাছে এ জাতির সূর্য সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা অনেক। আগামী পনের বিশ বছর পর আমরা হয়তো আমাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে পাব না, যেমনি এখন খুঁজে পাই না ৫২ এর ভাষা সৈনিকদের।
আর তাই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশিত সোনার বাংলা গঠন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব । ১৯৭১ সালে যেমনি কঠিন শপথের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা দেশকে শত্রু মুক্ত করেছিলেন। তেমনি আজকের নতুন প্রজন্মকে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অন্যায়, জুলুম, অবিচার, রাহাজানি , হত্যা, খুন, গুম তথা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিকসহ সকল ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা দূর করে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোপরি এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যাশিত সোনার বাংলা গঠন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। তা হলেই সার্থক হবে স্বাধীনতা।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Imam 2010 35 yohoo.com
