জোরালো হচ্ছে ফাঁসির দাবি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২২:৫২
রাজধানীর শাহবাগে প্রজন্ম চত্বরে জ্বলে ওঠা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জেলা থেকে উপজেলায়, এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও রাস্তায় নেমে পড়েছেন বিক্ষুব্ধ মানুষ। তাদের একটাই কথা: ‘ফাঁসি বাস্তবায়ন ছাড়া ঘরে ফিরবো না’। গত কয়েকদিনের মতো গতকাল সোমবারও একই দাবিতে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। শান্তিপূর্ণ এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন তরুণ প্রজন্মসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। তবে দু’একটি জায়গায় সহিংস ঘটনাও ঘটেছে। মানিকগঞ্জে যুদ্ধাপরাধী সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দৈনিকের কপিতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। কুমিল্লা, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারে একটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় ক্যাবল অপারেটররা। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর: সিলেট: যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সিলেটে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশাপাশি বিভিন্ন কলেজ-ভার্সিটিতেও চলছে অবস্থান কর্মসূচি। গতকাল এমসি কলেজে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। এদিকে সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে গত ৬দিন ধরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা ও সংস্কৃতিকর্মী। একই দাবিতে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে। খুলনা: জেলার শিববাড়ী মোড়ে নির্দলীয় গণমঞ্চে জনতার ঢল বেড়েই চলেছে। আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে মানুষের ভিড় শিববাড়ী মোড়ের বিশাল এলাকা ছাড়িয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে গোটা এলাকা। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী সেখানে উপস্থিত হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানান। গতকাল আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন খুলনা প্রেসক্লাব ও খুলনা সাংবাদিক ইউনিয়নের (কেইউজে) নেতৃবৃন্দ। মানিকগঞ্জ:জামায়াত-শিবিরের মালিকানাধীন পত্রিকা পুড়িয়ে এবং স্থানীয় ভাবে টিভি মিডিয়া বন্ধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র, জনতা। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় জেলা প্রেসক্লাব চত্বরে সংগ্রাম, নয়াদিগন্ত ও আমাদের দেশ পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেই সাথে আজ থেকে জেলায় এই তিন পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া গত রবিবার থেকে জেলায় দিগন্ত টিভির সমপ্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সিঙ্গাইর (মানিকগঞ্জ): যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে সিঙ্গাইর ও হরিরামপুর উপজেলায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। এতে যোগ দেন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। নেত্রকোনা: রবিবার সন্ধ্যা থেকে নেত্রকোনার সর্বত্র দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেছে। শাহবাগ থেকে এই টিভি বন্ধের দাবি জানানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলায় কেবল অপারেটররা টিভি চ্যানেলটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেন। এদিকে কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে বিকালে প্রতিবাদী প্রজন্মের উদ্যোগে শহরে বিশাল মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ছোটবাজার সড়ক থেকে ফেরার পথে কে বা কারা স্থানীয় ইসলামী ব্যাংক ভবন লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়ে। তবে ব্যাংক ভবনের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় নাই। মৌলভীবাজার:জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ও কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নে স্থানীয় ক্যাবল অপারেটররা শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে রবিবার থেকে ওই দুটি স্থানে দিগন্ত টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ হয়েছে। রংপুর : কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সকালে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে রংপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। টাউন হলের সামনের সড়কে বিকালে জাগ্রত মঞ্চের ব্যানারে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মোমবাতি প্রজ্বলন করে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত মাঠ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে তৈরি করা হয়েছে প্রতিবাদী ফাঁসির মঞ্চ। মঞ্চের সামনে জামায়াতের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া ক্যাবল অপারেটরদের দিগন্ত টিভিসহ জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের সমপ্রচার বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। পরে একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করা হয়। জামালপুর: শহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে মুক্ত মঞ্চে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম খোকা। সমাবেশে সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ যোগ দেন। উদীচীসহ বিভিন্ন সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। মুন্সীগঞ্জ: জেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। গতকাল সেখানে স্থানীয় শিল্পীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন সংগীত পরিবেশন করেন। হবিগঞ্জ: জেলায় ফাঁসির দাবিতে ‘দেশপ্রেমিক জনতার মঞ্চ’ গড়ে তোলা হয়েছে। দুপুরে সেখানে বৃন্দাবন সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। নোয়াখালী: জনতার আন্দোলন গত ৬ দিনের চেয়ে গতকাল আরো বেগবান হয়েছে। সকালে নোয়াখালী কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র ফ্রন্ট বিক্ষোভ মিছিল ও বিকালে শহরের প্রধান সড়কে জেলা বারের আইনজীবীরা মানববন্ধন করেন। সন্ধ্যায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট মশাল মিছিল বের করে। এছাড়া মাইজদী শহীদ মিনার চত্বরে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। কুমিল্লা: বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অসংখ্য মানুষের নগরীর কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে এবং কুমিল্লা টাউন হল মাঠের মুক্তমঞ্চে অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। সন্ধ্যায় কুমিল্লা টাউন হল মাঠের মুক্ত মঞ্চ মোমবাতি ও ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে মিছিল শেষে রাজাকারের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করে প্রতীকী ফাঁসি দেয়া হয়। এদিকে জাগ্রত জনতার দাবির মুখে রবিবার রাত থেকে কুমিল্লায় ক্যাবল অপারেটররা দিগন্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জেলা ক্যাবর নেটওয়ার্কের সভাপতি এম, রেজানুর রহমান মনি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গতকাল কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের (কুমেক) চিকিত্সক, শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা কলেজ ক্যাম্পাসে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়: সাধারণ জনতার ব্যানারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। সকালে বিশ্ববিদ্যালয় মেইন গেটে ‘গণজাগরণ মঞ্চে’ বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদ, শাপলা ফোরাম, ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশগ্রহণ করে এবং আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। বাগেরহাট: যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে গণজাগরণ সমাবেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাগেরহাট শাখা থেকে নিজেদের হিসাব প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ওই ব্যাংকের দু’জন গ্রাহক। এরা হলেন শহরের আমলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা মোসাম্মাত্ পিয়ারা আক্তার এবং সদর উপজেলার শ্রীঘাট এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট সরদার ইলিয়াস হোসেন। দিনাজপুর: জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সামনে নতুন প্রজন্মের ব্যানারে সমাবেশ হয়েছে। এতে শত শত ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহণ করে। এছাড়া হাজী দানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় শহীদ মিনার চত্বরে প্রতীকী ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেন। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর রুহুল আমীন শহীদ মিনার চত্বরে এসে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি জানিয়েছেন। বান্দরবান : স্থানীয় বঙ্গবন্ধু মুক্তমঞ্চ এবং রাজারমাঠস্থ বটতলায় কবিতা ও গণসংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে নতুন প্রজন্মের তরুণরা। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে তরুণ প্রজন্মের এই কর্মসূচিতে অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও। টাঙ্গাইল : যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে টাঙ্গাইলে গণজাগরণ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। শহরের শহীদ মিনার চত্বর ও নিরালা মোড় তরুণ প্রজন্ম গান, বক্তৃতা, কবিতা পাঠ ও শ্লোগানে গরম করে রেখেছে। দিনব্যাপী চলেছে এ কর্মসূচি। সন্ধ্যার পর রাস্তার উপর ফুল দিয়ে ৭১ লিখে তাতে মোম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এদিকে জেলায় ধনবাড়ীতে সচেতন নাগরিক সমাজ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া মধুপুর, মির্জাপুর, বাসাইল ও নাগরপুরেও একই দাবিতে মিছিল, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নীলফামারী: স্মৃতি অম্লান পাদদেশের ‘গণজাগরণ মঞ্চে’ মহাসমাবেশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শত-শত ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-কর্মচারী, মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। এসময় কানায় কানায় ভরে যায় শহরের চৌরঙ্গী মোড় ও তার আশপাশের এলাকা। স্বরূপকাঠী: স্বরূপকাঠিতেও মানববন্ধন করেছে স্বরূপ থিয়েটার ও স্বরূপ ললিতকলা একাডেমি। সরকারি স্বরূপকাঠি কলেজের সামনের সড়কে আয়োজিত এই মানববন্ধনে সর্বস্ত কাপাসিয়া (গাজীপুর): কাপাসিয়া বাজারে শাহবাগ সংহতি মঞ্চ থেকে শ্লোগান দিয়ে, সংগীত পরিবেশন করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি জানানো হয়। এছাড়া সিংহশ্রী বাজারে প্রজন্ম ৭১ ও টোক নয়ণ বাজারে জাগরণী মঞ্চে অনুরূপ কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। পাঁচুয়া বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।