রাজধানীর শাহবাগের গণজাগরণ নিয়ে গতকাল বিএনপির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এইসব ঘটনার মধ্য দিয়ে ’৭৫-এর একদলীয় ফ্যাসিবাদের সুস্পষ্ট প্রতিধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে শাহবাগ চত্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে তরুণ-তরুণীদের জমায়েত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তরুণদের দাবির যৌক্তিকতা থাকতেই পারে। তাদের এই উচ্ছ্বাস ও আবেগের প্রতি জাতীয়তাবাদী দল সব সময়ই ইতিবাচক বক্তব্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছে, তরুণদের এই দাবি মহলবিশেষ দলীয়করণ করার সর্বাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচেছ। তরুণদের উচ্ছ্বাসকে একদলীয় অখণ্ড কর্তৃত্বাধীন করার জন্য ক্ষমতাসীন গোষ্ঠি রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের কুটিল ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচেছ। সরকারি নীল-নকশায় তরুণদের এই আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করার বিষয়টি ইতোমধ্যে জনগণের চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। শাহবাগ চত্বরের সমাবেশ স্থলে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবী ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ করেছে এবং পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়ার জন্য প্রতিদিন হুমকি দিচ্ছে। পাশাপাশি মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে নির্ভীক সমপাদক মাহমুদুর রহমান ও গণতন্ত্রের স্বপক্ষে আপোষহীন উচ্চকণ্ঠ দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ড. পিয়াস করিমকেও নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়েছে।
বিএনপির পক্ষে দলের যুগ্ম-মহাসচিব ও দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বিবৃতিতে বলেন,‘জাতীয়তাবাদী দল বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথ চলাকে নিশ্চিত করেছিলো। আর এটি নিশ্চিত হয়েছিলো বলেই মানবিক সাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার আমলে। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই অবদান জাতি কোনদিন ভুলে যায়নি। জাতীয়তবাদী দল মনে করে, যারা দেশের সার্বভৌমত্ব লংঘন করছে, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা করছে, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানীর লাশ ঝুলিয়ে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের নির্লিপ্ততা যদি তরুণরা শাহবাগ চত্বরে আন্দোলনের দাবির পরিধিতে অন্তর্ভুক্ত করতো তাহলে তা আরো গ্রহণযোগ্য হতো। কারণ এগুলোও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ক্ষমতাসীন দল ও তাদের মন্ত্রিসভায় যে সকল স্বাধীনতা বিরোধী রয়েছেন তাদের বিচারের দাবিও একই সাথে উচ্চারিত হলে সারাদেশের মানুষের কাছে শাহবাগের আন্দোলনকারী তরুণদের দাবি আরো যথার্থ হয়ে উঠতো।
পদ্মাসেতু কেলেংকারি, শেয়ারবাজার ধ্বংস, সোনালী ব্যাংক-হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেংকারির মাধ্যমে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে সর্বস্বান্ত করেছে, তাদেরকে আইনের ফাঁক দিয়ে রেহাই দেয়া হচ্ছে। কারণ এরা সবাই ক্ষমতাসীন দলের সাথে সমপর্কযুক্ত। এই লুটেরারাও মানবতাবিরোধী অপরাধী। এদের বিচারের জন্য শাহবাগ চত্বরে তরুণদের বর্তমান আন্দোলনে একটি সোচ্চার দাবি উঠাতে পারলেই কেবলমাত্র আন্দোলন সর্বব্যাপী রূপ লাভ করতো। সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী, কমিশনার চৌধুরী আলম, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামসহ অসংখ্য মানুষের গুম এবং গুপ্তহত্যা যে সরকারি মদদেই ঘটে চলেছে তা কারো জানতে বাকি নেই। তরুণদের দাবিনামাতে বর্তমান সরকারের এই প্রাণঘাতী অপকর্মের বিষয় উল্লেখ থাকলে তাদের এই আন্দোলন দল-মত নির্বিশেষে একটি অভিন্ন মাত্রা পেত।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রখ্যাত বাম নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারসহ ৪০ হাজার প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে যারা চরম ফ্যাসিবাদী একদলীয় শাসনের প্রতিষ্ঠা করেছিলো, তাদের হাতের ক্রীড়নক হওয়া থেকে সাবধান থাকতে হবে তরুণদের। এরই মধ্যে নব্য বাকশালী আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে শাহবাগ চত্বরে, আওয়ামী লীগ নেতাকে মঞ্চে উঠতে বাধা দেয়ায় কিশোরী লাকী আক্তারের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের সাধারণ সমপাদকের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। মঞ্চের উপরেই তার মাথায় এবং পিঠে প্রচণ্ড আঘাত করেছে ছাত্রলীগের কর্মীরা। যারা নিরীহ শ্রমিক বিশ্বজিতের হত্যাকারী, রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এসিড নিক্ষেপ করে শিক্ষক ছাত্রদের মুখ যারা বিকৃত করে দিয়েছে, যারা কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কুপিয়ে আহত করে এবং ঘরে আটকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, যারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষপাপ কিশোরীদের নির্যাতন করে সেঞ্চুরির উত্সব করেছে - তাদেরকে সাথে নিয়ে কোন আন্দোলনেই নৈতিকতা যোগ হতে পারে না। প্রতিটি আন্দোলন সফল হয় উচ্চ নৈতিকতার মাত্রা যোগ হলে। এদেরকে এবং এদের মদদ দাতাদেরকে সঙ্গে রাখা হচ্ছে বলেই শাহবাগ চত্বরে লাকীরা লাঞ্ছিত এবং শারীরিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। এই সমস্ত ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয় যে, হুমকি, আক্রমণ এবং নানা অপকৌশলে তরুণদের আন্দোলনকে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠি নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করার এক অশুভ অভিপ্রায় নিয়েই শাহবাগ চত্বরকে ব্যবহার করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে সরকার। ক্ষমতাসীন দল ছাড়া সারাদেশে দল-মত-শ্রেণি-পেশার সকল মানুষ আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সোচ্চার। একমাত্র নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষ তার নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার স্বাধীনতা লাভ করে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্তর্নিহিত শক্তি ছিলো বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রেরণা। চিরায়ত গণতন্ত্রের মধ্যেই মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার নিশ্চিত হতে পারে। তাই তরুণদের এই আন্দোলনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃস্থাপনে দাবির বিষয়টি থাকলে এটি আরো সার্থক হয়ে উঠতো। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দৈনিক আমার দেশ, নয়াদিগন্ত, সংগ্রাম পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ এবং নির্যাতিত ও সাহসী সমপাদক মাহমুদুর রহমান ও দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড.পিয়াস করিমের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী হুমকির তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও ধিক্কার জানাচ্ছে।’
