স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বিশিষ্ট লেখক, প্রবীণ সাংবাদিক, সাহিত্যিক আবদুল মতিন (৮৯) মঙ্গলবার লন্ডনে ইন্তেকাল করেছেন। ব্রিটেন প্রবাসী আবদুল মতিন বার্ধক্যজনিত কারণে চিকিত্সাধীন অবস্থায় লন্ডনের সেন্ট জর্জেজ হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মরদেহ বাংলাদেশে আনার পর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে সমাহিত করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। উল্লেখ্য, জাতীয় প্রেসক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সাংবাদিক আবদুল মতিন।
তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
গতকাল এক শোকবাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে মরহুম আবদুল মতিন যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের জনগণ তাদের এক অকৃত্রিম সুহূদকে হারালো। বিবৃতিতে তিনি মরহুম আবদুল মতিনের পবিত্র রুহের মাগফিরাত কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গ, গুণগ্রাহী, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও পৃথক শোকবাণীতে সাংবাদিক মতিনের রুহের মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
আবদুল মতিন ১৯২৪ সালে নোয়াখালী সদর থানার জামালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়ার ঢাকার সংবাদদাতা হিসেবে তার সাংবাদিকতা পেশা শুরু হয়। তিনি ঢাকা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬০ সালে দৈনিক আজাদের লন্ডন সংবাদদাতা হিসেবে তার প্রবাসী জীবন শুরু হয়। সেই থেকে তিনি লন্ডনেই বসবাস করছিলেন। তিনি ১৯৬৩ সালে বাম রাজনৈতিক নেতা মরহুম তাসাদ্দুক আহমদের উদ্যোগে লন্ডন থেকে প্রকাশিত দেশের ডাক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান অবজারভারের লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটেনের কমিশন ফর রেসিয়াল ইকুইলিটির ইনফরমেশন অফিসার হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়ও তিনি কাজ করেছেন। ১৯৬০ সালে ‘ইউরোপের দেশে দেশে’ শিরোনামে তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘জেনেভায় বঙ্গবন্ধু’ নামে ১৯৮৪ সালে তার দ্বিতীয় গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও কাস্তে, স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, প্রবাসীর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা একটি রাজনৈতিক আলেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও কয়েকটি প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং রোমের উত্তান ও পতন তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিশ্ব জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের পর ব্রিটেনে তিনি দৃঢ় প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রচারণা চালান। এছাড়াও বাংলাদেশে স্বৈরশাসন বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিভিন্ন সময় তিনি প্রবাসে উল্লে¬খযোগ্য ভূমিকা রাখেন।
