এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেছেন, জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ জড়িত। এদের দোষী সাব্যস্ত করে চরম দণ্ড দিলেই এই হত্যা মামলার সঠিক বিচার হত। অথচ নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায়ে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি উঠে আসেনি। নিম্ন আদালতে সাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে জেলহত্যা মামলার আপিল শুনানিতে তিনি একথা বলেন। এটর্নি জেনারেল বলেন, হত্যাকাণ্ডের রাতে বঙ্গভবনে সাড়ে ১২টার বৈঠকের পর দফাদার মারফত আলী শাহ এবং কর্নেল (অব.) রশিদের নেতৃত্বে দুইটি দল বঙ্গভবন থেকে কেন্দ্রীয় করাগারে যায়। মারফত আলীর নেতৃত্বে সেনা সদস্যের দলটি কারাগারে বন্দী অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। আর কর্নেল (অব.) রশিদের দলটি গিয়ে পরে বেয়নেট চার্জ করে। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সভাপতিত্বে আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল বুধবার এ শুনানি গ্রহণ করে। আগামী মঙ্গলবার আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত কৌঁসুলি ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন শুনানি করবেন। শুনানিতে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান, অ্যাডভোকেট মুরাদ রেজা, অ্যাডভোকেট মমতাজউদ্দিন ফকির উপস্থিত ছিলেন।
শুনানিতে এটর্নি জেনারেল বলেন, এর চেয়ে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আর কি হতে পারে? এটা ছিল সুপরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। এমনকি ষড়যন্ত্রকারী সেনা কর্মকর্তা রশিদ ও ডালিমরা দেশে থাকা অবস্থায় চার নেতার লাশ কারাগারেই পড়েছিলো। এরা দেশত্যাগ করার পরই তাদের লাশ কেবল স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি বলেন, এই ষড়যন্ত্রের ঘটনায় রাজনীতিবিদদের মধ্যে শাহ মোয়াজ্জেম, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, কেএম ওবায়দুর রহমান, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর যুক্ত ছিলেন। এরা খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে বঙ্গভবনে পরামর্শ করতেন। মোশতাকের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ২৩ জন। এদের মধ্যে শুধু ওই ৪ জনকেই কাছে ডাকতেন খন্দকার মোশতাক। এজন্য এই রাজনীতিবিদসহ ষড়যন্ত্রকারী সেনা কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। এজন্য প্রয়োজনে প্রথমে কেন তাদের শাস্তি দেয়া হবে না, মর্মে নোটিস দেয়া যেতে পারে। ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ষড়যন্ত্রকারীদের চরমদণ্ড দিলেই কেবল সঠিক রায় দেয়া হবে বলে আমি মনে করি। তবে এটা সম্ভব না হলে অন্তত ষড়যন্ত্রের বর্ণনা যেন রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ থাকে।
এটর্নি জেনারেল বলেন, সাক্ষীরা বলেছেন, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এমপি হোস্টেলে বললেন বঙ্গবন্ধু মারা গেছেন, কি হয়েছে ঘাবড়াবার কিছু নেই। পার্লামেন্টতো আছে। আওয়ামী লীগের চার নেতাসহ ২৬ জন কারাগারে রয়েছেন। মুশতাক সাহেব ১০/১৫ বছর ক্ষমতায় থাকবেন। তোমরা তাকে সাপোর্ট করো। তা না হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। জেলখানায় যারা আছে, প্রয়োজন বোধে তারা শেষ হবে। তিনি বলেন, বঙ্গভবন থেকে মনসুর আলীকে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে কামরুজ্জামানকেও এই প্রস্তাব দেয়া হয়। চার নেতার বাকি দুইজনকেও একইভাবে মন্ত্রিসভায় যোগদান করতে বলা হয়। তারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর শাহ মোয়াজ্জেম তো বলেছিলেন, তোমাদেরও ১৫ আগস্টের মতো পরিণতি বরণ করতে হবে। তিনি বলেন, ঘটনার আগের দিন অর্থাত্ ২ নভেম্বর মেজর (অব.) ডালিম কারাগারে জোর করে প্রবেশ করেন। এ সময় প্রবেশে বাধা দিলে তিনি জেলারকে ধমক দেন। তিনি জেলে প্রবেশ করে চার নেতার অবস্থান দেখে আসেন। তখন তত্কালীন ঢাকা জেলার এসপি মাহবুবের কেন্দ্রীয় কারাগারের কক্ষের সামনে আসেন ডালিম। এসপি মাহবুব তাকে জিজ্ঞাসা করলে ডালিম বলে, ‘তোদের বাতি বুতি ঠিক আছে কিনা দেখতে আসছি।’ এটর্নি জেনারেল বলেন, ঘটনার দিন সকালে মেজর রশিদ ক্যাপ্টেন মোসলেমকে জিজ্ঞাসা করে জেলখানায় কি বড় চারটা শেষ। উত্তরে ক্যাপ্টেন মোসলেম বলেন, স্যার সব শেষ। এরপর দোষীদের বিদেশে পাঠানো হয় এবং বেনগাজি এবং লন্ডনে বিদেশি মিশনে চাকরি দেয়া এবং পদোন্নতিও দেয়া হয়। আর তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান ও শমসের মবিন চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে সকল বন্দোবস্ত করতে। পরে তারা তাদের বিদেশে পাঠানোর সকল ব্যবস্থা করে দেন।
উল্লে¬খ্য, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয়।
