স্মরণ

সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবদুল মতিনকে শ্রদ্ধা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৩
প্রখ্যাত সাংবাদিক-সাহিত্যিক গাফ্ফার ভাই দিনকয়েক আগেই আমাকে টেলিফোন মারফত জানিয়েছিলেন যে মতিন ভাই-এর অবস্থা ভালো না। বলছিলেন, তিনি চলে গেলে একটা জায়গা একেবারে ফাঁকা হয়ে যাবে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কথা বলার, নানারকম তথ্য তালাশ করবার জায়গাটি আমরা হারাবো। তিনি আজ নেই। সত্যিই আমার ভেতরের একটা অংশও ফাঁকা হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের আগেই তিনি সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হন। ‘ইউনাইটেড প্রেস অব ইন্ডিয়া’র ঢাকা প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। ১৯৫০-এ ‘ইউনাইটেড প্রেস অব পাকিস্তান’ নামে সেটি প্রতিষ্ঠা পায়। তিনি সেখানকার ব্যুরো চীফ ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠালগ্নে মতিন ভাই প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি লন্ডন-নিবাসী। তবে আসতেন প্রতি বছর। উঠতেন ছোট বোন রাজিয়া মতিন চৌধুরীর বাসায়। যখন আসতেন আমি ডাক পেতাম। কখনো যেতাম তার কাছে, কখনো তিনিও আসতেন আমাদের এখানে। মতিন ভাইয়ের সাথে আমার ফোনেও কথা হতো। অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি যে কী জানতেন আর কী জানতেন না, সে ছিল এক মহাবিস্ময়। তবে বিগত কয়েক বছর বেশি খবর পেতাম গাফ্ফার ভাই আর সঞ্চিতা’র কাছ থেকে। এই মুহূর্তে আমার বিশেষ করে মনে পড়ছে ১৯৭৫-এর পরবর্তী সময়ের কথা। আমি তখন স্বেচ্ছা-নির্বাসনে ভারতে। সেই দুর্যোগঘন দিনে তিনিও আমাকে অনেকখানি প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। সেটা হচ্ছে লন্ডন থেকে প্রকাশিত তার কাগজ ‘সান রাইজ’। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তিনি কাগজটি প্রকাশ করতে শুরু করেন। সেটির বেশকিছু সংখ্যা তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন। সেই কাগজ মারফত অনেক খবর পেতাম আমি । কে কী ভাবছেন জানতে পারতাম। অন্যদের কপি পাঠাবারও ব্যবস্থা করে দিতাম। সে সময় লন্ডন থেকে গাফফার ভাই-এর সম্পাদনায় ‘বাংলার ডাক’ এবং এম. আর. আখতার মুকুলের সম্পাদনায় ‘সোনার বাংলা’ নামে দুটি পত্রিকা বের হতো। শেষোক্ত পত্রিকাটি বাংলা এবং ইংরেজি, দুই ভাষাতেই প্রকাশিত হতো। আর দিল্লি থেকে রাজেন্দ্র সারেন-এর সম্পাদনায় ‘পাবলিক ওপেনিয়ন ট্রেন্ড (POT)’ নামে একটা বুলেটিন বের হতো। সেটা থেকেও বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতিটা বোঝা যেত। সেটি এবং ‘সান রাইজ’-এ দুটি ছিল তখন আমার প্রধান অবলম্বন। যাহোক, ১৯৭৭ সালের শেষদিকে এসব পত্র-পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তখনও মতিন ভাই খুব কষ্ট করে ‘সান রাইজ’ পত্রিকাটা চালু রাখেন। দেশ ও জাতির প্রতি তার দায়িত্ব ছিল অসাধারণ। দেশের বাইরে অবস্থান করেও দেশের সবরকম সঙ্কটে প্রয়োজনে কী করে দেশ-মাতৃকার জন্য কাজ করা যায়, তিনি হচ্ছেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেটি যেমন তার নিজের জীবন, কর্ম এবং লেখার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে গেছেন, তেমনি অন্যের কাজেও যখন যেখান থেকে ডাক পেয়েছেন নিজেকে যুক্ত করেছেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ যে তারা এই বিশাল মানুষটিকে সম্মান জানিয়ে স্বাধীনতা পদক প্রদান করেছেন। বাংলাদেশ সরকার আর একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য যথাসাধ্য করেছেন। মতিন ভাই চলে যাবার পর গাফ্ফার ভাই-এর মনে হল তার মরদেহ দেশের মাটিতে এনে সমাহিত করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে তিনি লন্ডনে অবস্থানরত শেখ রেহানার সাথে কথা বললেন। আমাকেও জানালেন এবং প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি অবগত হওয়ার পর তার মরদেহ দেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য পালনের জন্য সব আয়োজন করলেন। সে পর্যায়ে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তার কবর হবে বলে আমরা জানতে পেরেছিলাম। লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসকে দায়িত্ব দেয়া হলো কফিন পাঠানোসহ আনুষঙ্গিক কাজকর্ম সম্পাদন করার। আমাদের সাগ্রহ অপেক্ষা ছিল কখন তাকে শেষ আর একটিবার আমরা দেখতে পাবো। কিন্তু সবাই মিলে নানাভাবে বোঝাবার পরও তার জার্মান স্ত্রী এবং ব্রিটিশ কন্যা বিষয়টাতে কিছুতেই সম্মতি দিলেন না। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে গাফ্ফার ভাই-এর কাছ থেকে টেলিফোনে জানতে পারলাম তাকে লন্ডনের একটি কসমোপলিটান গোরস্থানে সমাহিত করা হবে। তিনি আজ নেই, সে কথা যেমন সত্যি, তেমন তার সারাজীবনের কর্মের ফসল আমাদের সাথে থাকছে। এভাবেই একজন মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করেও বেঁচে থাকেন। মতিন ভাইও থাকবেন। লেখক :গবেষক ও কলামিস্ট