প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের জীবনধারা, সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, রীতি-প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছুতেই স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। বিষয়টির দিকে নজর রেখে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর চিন্তা ও মননশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারলে সবার মাঝে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি উঁচুমানের জাতীয় চেতনার বিকাশ ঘটতে পারে মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে।
বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলে ১১টি নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে চাকমা এবং মারমা ছাড়া অবশিষ্ট ৯টি ভাষা— ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চংগ্যা, চাক, বম, লুসাই, পাংখোয়া, থিয়াং এবং খুমি সংকটাপন্ন। ভাষার মর্যাদা ও অধিকারের জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা লড়াই করেছে; তাদের অর্জন ও স্বীকৃতি সারা দুনিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে। কাজেই আমাদের দায়িত্বও বেশি। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অধিকার সংরক্ষণ করা জরুরি। রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বা জাতীয়তা লাভের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি অধিবাসী শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার প্রবর্তন ও প্রয়োগ, সংস্কৃতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, আশা-আকাঙ্ক্ষার মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। আজ অবধি রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে উপজাতিদের মাতৃভাষাকে খুব একটা মর্যাদা দিতে দেখা যায়নি। চট্টগ্রামসহ পার্বত্য অঞ্চল, পটুয়াখালী ও নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বসবাস করছে তাদের মাতৃভাষা যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সে ভাষা রক্ষায় রাষ্ট্রের কী করণীয় কিছু নেই? যে ভূখণ্ডের মানুষ নিজের মাতৃভাষা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে, সে ভূখণ্ড স্বাধীন হওয়ার পর সব ক্ষুুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষা করলেই ভাষা আন্দোলনের চেতনা প্রতিষ্ঠিত হতো। তারা যেন তাদের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সব জাতি ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সৌন্দর্যও অতুলনীয়। সব সংস্কৃতির মধ্যে স্বকীয়তা ও মানবীয় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। এ কারণেই সাংস্কৃতিক উপাদান হারিয়ে যাওয়া অনেক কষ্টের কারণ হয়। বাংলা ছাড়াও এদেশে আরও প্রায় ৪০টির মতো ভাষা রয়েছে। দেশে বাংলা ও ইংরেজি ছাড়া সাধারণ শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ নেই। এদেশের মানুষ বাংলা ছাড়া দেশের আর অন্য কোনো ভাষা শেখার তেমন কোনো তাগাদা অনুভব করে না। আমাদের মনে হয়, দেশের উন্নয়ন এবং সোনার বাংলাদেশ গড়ার জন্য সব আদিবাসীর সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত করা প্রয়োজন। কারণ একেকটি সংস্কৃতি একেকটি জাতির পরিচয় বহন করে এবং এটি বিশ্ব সভ্যতার একটি অমূল্য সম্পদ। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ অনন্য সুন্দর। তারা সবাই নিজ মাতৃভূমিকে সম্মান করে। সাংস্কৃতিক সৌন্দর্যে সতত শান্তি ও সংহতি প্রত্যাশা করা যায়। মানবিক মর্যাদায় সব মানুষ সমান। আদিবাসীদের সংস্কৃতির অনাবিষ্কৃৃত এ মূল বিষয়গুলো কাজে লাগাতে পারলে দেশে জাতীয় সংস্কৃতির ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে আশা করা যায় জাতীয় সংস্কৃতিও সমৃদ্ধি লাভ করবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় অবহেলার শিকার হওয়ার কারণে আদিবাসীদের ভাষা মরতে বা হারাতে বসেছে। মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে তারা অন্য ভাষা আয়ত্ত করতে আগ্রহী হয়ে উঠছে অথবা বাধ্য হচ্ছে— প্রায়োগিক জীবনের প্রয়োজনে। আদিবাসীদের ভাষাচর্চা ও গবেষণার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা ফ্যাকাল্টি প্রবর্তন করা যেতে পারে। সংস্কৃত-পালির মতো সামাজিকভাবে মৃত ভাষা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়, কেন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবিত ভাষা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া তো চলতেই পারে। এমনকি উপজাতিদের ভাষার তাত্ত্বিক ও বিষয়ভিত্তিক ব্যাপক গবেষণার দ্বারও প্রসারিত হতে পারে সরকারি-বেসরকারি আগ্রহ-উদ্যোগে। আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তাদের চিন্তা লালন চর্চা এবং সৃজনশীলতাকে বিকাশের পথ সুগম করা যায়। সংস্কৃত, পালি প্রভৃতি ভাষা যেমন পড়ানো হচ্ছে, তেমনি চলছে ফার্সি ভাষা বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মতো কার্যক্রম। সে বিবেচনায় জীবিত জাতিগোষ্ঠীর সচল ভাষা বিষয়ে পাঠ ও গবেষণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ভোটাধিকারের মতো গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষাকে বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের সীমানায় নিয়ে আসতে হবে।
একুশে ফেব্রুয়ারির মাহাত্ম্য, আজ বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি লাভ করেছে। ফলে ২১-কে নতুনভাবে জানার, উপলব্ধি করার ও বিশে¬¬ষণের এক বিশেষক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে শিক্ষার বাহনরূপে ওইসব জাতির ভাষাকে ব্যবহারের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার; বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতি এবং মানবাধিকারের স্বার্থেই এমনটি বিবেচ্য। সারা দুনিয়ায় কতটি মাতৃভাষা রয়েছে, কতটি ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় আসীন, কোনো ভাষা রাষ্ট্রীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পেষণের শিকার কিনা; শিকার হয়ে থাকলে, তা থেকে উত্তরণের কৌশল ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন-প্রচেষ্টা এবং সকল জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে তাদের শিক্ষা ও সাহিত্যশিল্পচর্চার মাধ্যম হিসেবে অগ্রবিবেচ্য রাখার দাবির প্রসঙ্গ, আজ, ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর প্রধান প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত। কেবল অন্ধ ইতিহাসচর্চায় আত্মনিমগ্ন না থেকে, যে পরিপ্রেক্ষিতে এই সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, তা মনে রেখে, বাংলা ভাষার সামর্থ্য ও সৌকর্য বৃদ্ধির জন্য বাংলাভাষার স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাকরণ রচনার উদ্যোগ এবং ভাষা-প্রয়োগে সবধরনের গোঁজামিল-অসমতা-বিভ্রাট-নৈরাজ্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে। আর এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার সঠিক পরিচর্যায় মনোনিবেশ করতে হবে; এবং এ দায় ও দায়িত্বের অনেকটাই বাংলাভাষীর ওপর— স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যিক-ঐতিহাসিক কারণেই। আদিবাসীদের ভাষার বর্ণমালা লিপিবদ্ধকরণ, ভাষাচর্চার মাধ্যমে তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তাকে প্রসারণ, শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক পাঠ গ্রহণের ব্যবস্থা করা এবং শিল্প-সাহিত্যচর্চায় নিজভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভাষার যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করার জন্য দরকার সরকারি উদ্যোগ। পাশাপাশি উন্নয়নমূলক সংস্থা চালাতে পারে বিশেষ বিশেষ কার্যক্রম।
ভাষা, সাহিত্য, সামাজিক রীতি-প্রথা, লোকাচার, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন, দৈনন্দিন কার্যক্রম ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মানুষের ভেতরকার চেতনা এবং ভাবনাগুলো ফুটে ওঠে। এসবের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এদেশের ভিন্ন সমাজ ও জাতি, সংস্কৃতি এবং ভাষার মানুষের অস্তিত্ব। বিচিত্র সংস্কৃতি ধারণ ও সম্মান করলে একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও জাতীয় কাঠামো মজবুত হয়ে ওঠে। দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক, গবেষক এবং নীতিনির্ধারক মহল সাংস্কৃতিক সেতু বিনির্মাণে কারিগরের ভূমিকা পালন করতে পারেন। শিল্প, সাহিত্য, চারু ও কারু শিল্প ইত্যাদি একটি রাষ্ট্রের জন্য যে কত বড় সম্পদ হতে পারে, সাম্প্র্রতিক বিশ্বের প্রেক্ষাপট লক্ষ করলেই এর গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত প্রত্যেকের মধ্যে নিজস্বতার প্রতি গভীর আগ্রহ থাকে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ উপজাতিদের প্রতি শুধু সহানুভূতিই নয়, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
গাজীপুর
