একুশে ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি তখন চলছে। একালের শ্লোগান অনুসরণ করে বলা যায়- ‘চলছে, চলবে’। তবে এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়। সেটা রাজবন্দি মুক্তির দাবি। এ দাবি বেশ কিছুদিন থেকে চলছিল, বিশেষ করে কিনা বিচারে বন্দি, নিরাপত্তা আইনে বন্দিদের নিয়ে সরকারের খামখেয়ালিপনার কারণে। তাছাড়া দল বিশেষের প্রতি অত্যাচার-নির্যাতনের কারণেও বটে। কারাগারে নির্যাতনে মৃত্যু সভ্য দেশে বিরল হলেও পাকশাসনামলে পূর্ববঙ্গে তা ঘটেছে একাধিকবার। তবে এবার বিষয়টি ভিন্ন। বেশ কিছুদিন থেকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে আটক রাখায় তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। তার সহবন্দি মহিউদ্দিন আহমদের অবস্থাও ভালো ছিল না। এ অবস্থায় বন্দি মুক্তির দাবিটি বিশেষ মাত্রা অর্জন করে। রাজনৈতিক নেতাদের দাবি সত্ত্বেও তাদের মুক্তি দেয়া হয়নি। প্রতিবাদে শেখ সাহেব ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তার মুক্তির দাবি আরো জোরদার হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে ‘ইত্তেফাক’ নিয়মিত এই জননেতার মুক্তি দাবি করে এসেছে, কখনো দীর্ঘ বয়ানে। কারণ শেখ সাহেব ১৯৫০ সাল থেকে কারাগারে বন্দি জীবন-যাপন করছেন। আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট কাগজ হিসাবে দায়িত্ববোধ থেকেও এসব লেখা। তাছাড়া আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী বিবৃতি দিয়েছেন শেখ সাহেবের মুক্তির দাবিতে। শেখ মুজিবুর রহমান তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক, তবে সহকর্মী যুগ্ম-সম্পাদকের তুলনায় অনেক তত্পর হওয়ার কারণে তার দীর্ঘকালীন কারাজীবন।
বন্দি মুক্তির বিষয়টি সাধারণ বিচারে তখন কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে—শ্লোগান, ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। এবং তা বরাবর ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’র পরই নিয়মিত দ্বিতীয় শ্লোগান হিসাবে উচ্চারিত হয়েছে। তাছাড়া সভা-সমাবেশে সর্বত্র প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে। যেমন- ৩১ জানুয়ারির কর্মীসভায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর বন্দিমুক্তি এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান কতটা আন্তরিক, কতটা সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ শাসন বলে কথা। তাদের দুঃশাসনে নিয়ম-কানুন বলে কিছু ছিল না। হয়তো তাই পতন ঘটেছে অপেক্ষাকৃত দ্রুত। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিতে কোনো সুফল মিলছে না দেখেই বোধ হয় একাধিক ব্যক্তি ও সংগঠন মিলে পূর্ববঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে যুক্ত আবেদন পেশ করা হয় রাজবন্দীদের মুক্তির দাবি জানিয়ে। সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’-এর ১৭ ফেব্রুয়ারির (১৯৫২) প্রতিবেদনে তা প্রকাশ পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রদেশের সকল রাজনৈতিক কর্মী বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের আশুমুক্তির প্রশ্নে পূর্ববঙ্গ পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশে এক আবেদনপত্র পেশ করিয়াছেন। ...স্বাক্ষরকারীগণ বলেন—সর্বশক্তি নিয়োজিত করিয়া আপনারা পাকিস্তানে আইন ও নীতির শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব ও গণতন্ত্র কায়েম করুন। ...আসুন, আপনারা পরিষদের ভিতরে আর আমরা বাহিরে পূর্ববঙ্গের রাজবন্দীদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তুলি’।
এ আবেদনপত্রে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, মির্জা আব্দুল কাদের, কামরুদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, তফাজ্জল হোসেন (ইত্তেফাক), হাসান ইকবাল (সৈনিক), কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ। এছাড়া ছাত্রলীগ, যুবলীগ, তমদ্দুন মজলিস ও বিভিন্ন ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিনিধিগণও এতে স্বাক্ষর করেন। ‘মানবতার নামে’ এই শিরোনামে মওলানা ভাসানী পৃথক একটি বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান।
এদিকে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রস্তুতি চলছে এবং সংশ্লিষ্ট সভা-সমাবেশ বা মিছিলে বন্দিমুক্তি ও বিশেষভাবে পূর্বোক্ত দুই রাজনৈতিক নেতার মুক্তিরদাবিও তুলে ধরা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে নুরুল আমিন প্রশাসন এ দুজন বন্দিকে ঢাকা থেকে সরিয়ে দূর ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের উদ্দেশে তাদের ঢাকা ত্যাগ করানো হয়। নারায়ণগঞ্জে স্থানীয় নেতা শামসুজ্জোহা, সফি হোসেন প্রমুখের সঙ্গে সাক্ষাত্ হয়। বন্দিমুক্তি দাবির প্রবল চাপে, বাস্তবে ভাষা আন্দোলনের দশদিক কাঁপানো দেশব্যাপী প্রচণ্ডতায় ২৬ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদকে ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা ও প্রচণ্ড দুর্বলতার কারণে শেখ সাহেব বিশ্রামের জন্য টুঙ্গিপাড়ায় নিজ বাসভবনে অবস্থান করেন। এ বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন এপ্রিলে ভাষা সম্মেলনে প্রদত্ত তার বক্তৃতায়।
এভাবে নানা রাজনৈতিক ঘটনা, প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ নিয়ে ফেব্রুয়ারির দিনগুলো এক একটি পাতা করে পড়ার মতো পার হতে থাকে। এগিয়ে আসতে থাকে একুশে ফেব্রুয়ারির ক্রান্তিক্ষণ। ছাত্র, অছাত্র সবার অপেক্ষা কখন আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। কখন শেষ হবে কাউন্ট ডাউন। এখন টেনশনবিদ্ধ ছাত্র সমাজ, ছাত্রাবাসগুলোতে চাপা উত্তেজনা আসন্ন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে। মূলত ছাত্র আন্দোলন হলেও এবার দেশব্যাপী একুশে নিয়ে জনসাধারণের মধ্যেও এক ধরনের সচেতনতা তৈরি হচ্ছিল। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য শহরে শিল্পকারখানার শ্রমিক সদস্যদের মধ্যেও দেখা যায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির প্রতি সুস্পষ্ট সমর্থনের আভাস। একুশে ফেব্রুয়ারিতে তারা ঠিকই হাজির ছিলেন মাঠে-ময়দানে-পথে ঘোষিত কর্মসূচি সফল করে তুলতে।
লেখক:ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক
