এলসিসি পদ্ধতির কার্যকর প্রসারের উপায়

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:৪২
বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়নের মূল স্রোতের প্রযুক্তিগুলো প্রধানত আসে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি কারিগরি কাঠামোর মাধ্যমে অর্থাত্ বিভিন্ন স্তরের টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে। এ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ প্রযুক্তি আসতে পারে অন্যান্য উত্স থেকে বা অন্যান্য পদ্ধতি থেকে। এগুলোকে সম্পূরক প্রযুক্তি বলা যায়। যদিও কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিতে এর গুরুত্ব কম নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় গুটি ইউরিয়া ব্যবহার, ড্রাম সিডারে বীজ বপন, এলসিসি পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব পদ্ধতির মধ্যে ধান চাষে এলসিসি পদ্ধতি ব্যবহার ও এর কার্যকারিতা বাড়ানোর উপায় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব। এলসিসি ব্যবহারে রোপা আমন ধানের গড় ফলন শতকরা ৫ থেকে ৬ ভাগ এবং বোরো ধানের গড় ফলন শতকরা ৩ থেকে ৭ ভাগ বাড়ে। এই পদ্ধতির ব্যাপক প্রসারে অবশ্যই এই পার্থক্যের কারণ উল্লেখ করে বোরো ধানের ফলন বৃদ্ধির হার ১০ ভাগের উপরে নিতে হবে, কারণ আমন ধানের চেয়ে বোরো ধানে সারের ব্যবহার ২০ থেকে ৩০ ভাগ বেশি। এজন্য এলসিসি ব্যবহারের বিষয় আরো সুনির্দিষ্ট করতে হবে। কারণ সরকারি আধুনিক ধানের চাষ বই অনুসারে ধানের চারা রোপণের সময় ইউরিয়া সার প্রয়োগের সুপারিশ করা হয়নি। তাই ধানের চারা রোপণে সুপারিশকৃত প্রথম কিস্তি এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার দিতে এলসিসি ব্যবহার নাও করা লাগতে পারে। এলসিসি ব্যবহারের প্রধান ক্ষেত্র তাই অনুর্বর জমিতে দ্বিতীয় কিস্তি এবং সকল জমিতে তৃতীয় কিস্তির ব্যাপারে প্রযোজ্য হলে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা বাড়বে। এখানে বলা প্রয়োজন, এলসিসি ব্যবহারের উদ্দেশ্য প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা, তাই সকল ক্ষেত্রে ইউরিয়া সারের ব্যবহার না কমে বাড়তেও পারে। কারণ অনেক কৃষক নানা কারণে তৃতীয় কিস্তির সার প্রয়োগে সমস্যায় পড়েন। এলসিসি দ্বারা পাতার রঙ মাপার সময় সবচেয়ে উপরের পুরোপুরি বের হওয়ার পরিবর্তে অর্ধেক অংশের নিচের পাতার রঙ মাপাতে হবে। কারণ সালফারের অভাব হলে ধান গাছের উপরের পাতা বিবর্ণ হয়, মেগনেসিয়ামের অভাব হলে মাঝামাঝি অংশে পাতার আন্তঃশিরাস্থান হলদে হওয়ার আশংকা থাকে। ইউরিয়া বা নাইট্রোজেনের ঘাটতি হলে ধান গাছে প্রথমে নিচের দিক থেকে সক্রিয় পাতা হলদে হওয়া শুরু হয়। তাই নাইট্রোজেনের ঘাটতি শনাক্তকরণের জন্য বৈজ্ঞানিকভিত্তিতে এই পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। ধানের জমিতে সুপারিশকৃত গড়ে হেক্টরে ২৫০ কেজি ধরা হলে (২২০ থেকে ২৬৪ কেজি) এর তিন কিস্তিতে ৮৩ কেজি ইউরিয়া দিতে হবে। এতে প্রতি বিঘায় ১১ থেকে ১২ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হয়। এর পরিবর্তে ঘাটতির ক্ষেত্রে ৯ কেজি পর্যন্ত ইউরিয়া দেয়া হলে সারের পরিমাণ খুব একটা কমে না। তবে বলা যায় যদি পরীক্ষা করে শতকরা ২৫ ভাগ জমিতে তৃতীয় কিস্তির ইউরিয়া না দিতে হয়। সেটা সাশ্রয় হবে। কিন্তু আধুনিক ধানের চাষ বইতে স্পষ্টভাবে তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফলের আলোকে তিন কিস্তির সার দিতেই বলা হয়ছে। দুই বা তিন কিস্তির কথা বলা হয়নি। তাই এখানে ব্রি-এর মতে একটি পুরো কিস্তির সার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না। অর্থাত্ এলসিসি গাছের প্রকৃত পাতা পরীক্ষা করে প্রতি কিস্তিতে বিঘায় ২ থেকে ৩ কেজি ইউরিয়া কম দিয়ে সে অনুপাতে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব। সুতরাং এসব বিষয়ে বাস্তবভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনে আরো অনেক বেশি বেশি গবেষণামূলক প্রদর্শনী স্থাপন করতে হবে। কৃষিবিদ বা ডিপ্লোমা কৃষিবিদ অন্তত ৪টি পাঠক্রমে ৮ থেকে ৯টি কোর্সে/সেশানে গাছের অপুষ্টির লক্ষণ ও এর প্রতিকার ব্যবস্থা অনুশীলন করে থাকেন। তাই এ সমস্যা সমাধানের জন্য কৃষিবিদের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ একটি বড় বিষয়। নাইট্রোজেনের অভাবে গাছের পাতার ক্লোরোফিল বিনষ্ট হয়ে সবুজ রঙ হারায়। অবশ্য এর সাথে সালফার ও মেগনেসিয়ামসহ কিছু কিছু অনুখাদ্যেরও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। এজন্য বিগত শতকের দ্বিতীয় দশকে আরলেন মেয়রসহ একদল বিজ্ঞানী এই সমস্যা সমাধানের জন্য ক্লোরোফিলোমিটার যন্ত্র আবিস্কার করেছিলেন। তারা বেশ কিছুদিন এই যন্ত্র ব্যবহার করার পর বলেছিলেন, এটি খুবই সহজ ও সঠিক পদ্ধতি। তবে এই কাজটি যিনি করবেন তার চোখ অভিজ্ঞ/পাকা হওয়া অত্যাবশ্যক। তাই আমার সুপারিশ এ ব্যাপারে ব্যাপক বাস্তব প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা শুধু ধানের জন্যই নয়, অন্যান্য সকল বিশেষ করে ঋতুভিত্তিক উচ্চফলনশীল দ্রুত বর্ধনশীল মাঠ ফসল ও সবজির ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। এতে সত্যিকারভাবে সার ব্যবহারে সুষমতা আসবে, ব্যয় কমে আয় বাড়বে কৃষকের ও জাতীয়ভাবে দেশের। লেখক:কৃষি বিশেষজ্ঞ