যে ভাষায় আমরা কথা বলছি মন খুলে, জানান দিচ্ছি মনের সব আবেগ। স্বপ্ন দেখছি, দুঃখগুলো ভাসিয়ে দিচ্ছি গানের সুরে, সে আমার বাংলা ভাষা। মাতৃভাষার অনন্যতায় ঋদ্ধ একজন বিশ্বজিত্ ঘোষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপক শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই অসামান্য দক্ষতায় পার করেছেন প্রতিটি ধাপ। শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেই থেমে থাকেননি। নিজের আগ্রহের জায়গাগুলো নিয়ে তিনি ভেবেছেন, অবিরত করে চলেছেন গবেষণা। বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্য থেকে শুরু করে, নাটক, লোকপুরাণ, শিশুসাহিত্য, উপন্যাস কিছুই বাদ যায়নি তার গবেষণার জগতে। বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে নিঃসঙ্গচেতনার রূপায়ণ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন তিনি। ২০১১ সালে তার গবেষণাকার্যের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। ভাষার নানা দিক অনুসন্ধানে জীবন কাটিয়ে দেওয়া বিনয়ী এই মানুষটা তার পথচলার গল্প শুনিয়েছেন প্রজন্মকে। সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন সাজেদুল ইসলাম শুভ্র,
ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার সময় সব বিষয়ে ফেল করে বসল ছেলেটা। মজার বিষয় হচ্ছে সেটা কোনো স্কুলে নয়, মায়ের কাছে! চতুর্থ শ্রেণী অবধি মায়ের কাছেই পড়াশোনা আর পরীক্ষা দিয়ে এসেছেন। পঞ্চম শ্রেণীতে নিজবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত নবকুমার ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে আর পেছনে তাকাননি। সব সময়ই ক্লাসে প্রথম হওয়া চাই তার। যশোর বোর্ডে এসএসসিতে স্ট্যান্ড করে উত্তীর্ণ হন তিনি। তারপর বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার পর মেডিকেল কলেজ ও বিজ্ঞানের অনেক বিষয়েই তিনি পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি তা গ্রহণ না করে বাংলাকেই বেছে নেন, সেই দিনের সেই ছেলেটাই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বিশ্বজিত্ ঘোষ। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে সাহিত্যের নানা বিষয়ের বই সম্পাদনা করেছেন তিনি, নিজেও লিখেছেন দশটির অধিক বই। প্রজন্মের এই গবেষক বর্তমানে উত্তর-ঔপনিবেশিক ডিসকোর্স ও নজরুল সাহিত্য বিষয়ে গবেষণা করছেন।
বিশ্বজিত্ ঘোষের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আমাদের আদিবাসীদের ভাষা প্রসঙ্গে। বলাই বাহুল্য, বাংলাকে মাতৃভাষার দাবিতে আন্দোলনকারী এই জাতি এখন নিজেই বাংলাকে চাপিয়ে দিচ্ছে এই সম্প্রদায়ের উপর। এই প্রশ্নের আলোকে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আমাদের তাদেরকে উপজাতি বলে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়। ১৯৭২ সালে যখন উপজাতি শব্দটি ব্যবহার শুরু হলো, তখন থেকেই একটা বৈষম্যের জন্ম হয়েছে। সরকারি কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও এখন আমরা তাদের আদিবাসী অথবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলছি। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি তাদের পালনের অধিকার রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভাষা কোনো সম্প্রদায়ের উপরিকাঠামো, এর মূলে রয়েছে অর্থনীতি। যখনই আমরা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হতে পারিনি, তখনই কিন্তু নানা বিষয় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাদের উপর। আজ ইংরেজরা অর্থবিত্তের প্রভাবে ইংরেজিকে আন্তর্জাতিক ভাষা বানিয়ে ফেলেছে, জাপানে গেলে আবার তাদের ভাষা শিখেই পড়তে যেতে হবে। ঠিক তেমনটাই ঘটেছে এদের ক্ষেত্রে। শিক্ষায়, অর্থিনীতিতে পিছিয়ে পড়া এই আদিবাসী সম্প্রদায়কে বাংলাই শিখতে হচ্ছে, বস্তুত তাদের থেকে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার মতো কেউ আসছে না। তবে খুশির বিষয় এই ধারণা থেকে আমরা বেরিয়ে আসছি, তাদের ভাষাকে সম্মান জানাতে শিখছে এই প্রজন্ম। আমাদের বোধোদয় হয়েছে যে, বায়ান্নর আন্দোলন কেবল বাংলা ভাষার জন্য নয়, মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার আন্দোলন। এই যদি হয়ে থাকে, যেকোনো ভাষাকেই আপনা করে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে তার গোষ্ঠীকে।’
প্রজন্মের এই ভাষাবিশেষজ্ঞের কাছে দুই বাংলার ভাষার ভাববিনিময় আর মতাদর্শ নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘ধরে নেওয়া হয় প্রতি পাঁচ কিলোমিটার পরপর ভাষার একটা পরিবর্তন ঘটবে। কলকাতার লোক যেভাবে কথা বলে, বনগাঁ আসার পর দেখা যায় অনেক কিছুতেই ভিন্নতা, সীমানা পার হয়ে যশোর আসতেই দেখা যায় আরও ভিন্নতা! ভৌগলিক একটা কারণ, তার সাথে এখন আমাদের রাষ্ট্রীয় একটা ব্যবধান, কিছুটা তফাত্ তো থাকবেই। খেয়াল রাখা দরকার বায়ান্নর আগে যেমন রাজনৈতিক পৃথকীকরণের একটা প্রয়াস নেওয়া হয়েছিল, সেটা যেন না হয়। আর আমরা তো সাহিত্যেই তাদের ভাষা বেশি দেখছি, এতে ভাষার বৈচিত্র্য সম্পর্কেই তো জানতে পারছি! ইংরেজিতেও তো এমন রয়েছে, ব্রিটিশ আর আমারিকানদের মাঝেও তো অনেক ফারাক।’
নতুন প্রজন্মের ভাষাচর্চায় আগ্রহ কেমন? বিশ্বজিত্ ঘোষ মনে করেন, বাংলাকে আমরা অনেকেই এই প্রজন্মের সামনে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারিনি, এই বিষয়টা যেমন সত্যি, তেমনি তাদেরকে যদি একটু জানার সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে নতুন প্রজন্মের কাছেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। কারণ অনেক আগ্রহ তিনি দেখেছেন এই প্রজন্মের মাঝে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়াতে গিয়ে তেমনি অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। গুটিকয়েক শিক্ষার্থী প্রথম বাংলা পড়তে এলেও পরে অসংখ্য শিক্ষার্থীর আগ্রহে আসনসংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। তরুণদের কাছে এই ভাষার যে মাধুর্য সেটা তো তুলে ধরতে হবে! নানা সীমাবদ্ধতায় আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সেটা দিতে পারছি না, ভুল ইংরেজি বললে হাসাহাসি অথচ বাংলা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ভাবটা এমন, এ তো নিজের ভাষা। আর নিজের ভাষার যথার্থ সম্মানটা তাই ঠিকমতো দেওয়া উচিত বাংলাকে। পরিবার থেকেই শুরু হোক এই চর্চাটা। এই ভাষাবিজ্ঞানীর কাছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় দুটি মাধ্যম ইংরেজি আর বাংলা মাধ্যম নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা তো একশটা ভাষা শিখতে পারি, তাতে দোষের কিছু নেই। তবে মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে নয়। তার নিজের কন্যাও পড়ছেন রাজধানীর গ্রিনহেরাল্ডে, এখানে ইংরেজির পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাংলাকে, হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতিকে ঘিরে নানা অনুষ্ঠানও। ভাষা তো একে অন্যের সহযোগী, কখনও সাংঘর্ষিক করে তুলতে চাইলেই নির্বুদ্ধিতা হবে।’ তবে শিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার বিকল্প নেই, এমনটাই বললেন তিনি, রবীন্দ্রনাথও বলেছিলেন, শিক্ষায় মাতৃভাষা হচ্ছে মাতৃদুগ্ধের মতো।
কথার শেষদিকে বিশ্বজিত্ ঘোষ বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের দিকেই সবাই চেয়ে থাকে।’ তারও বিশ্বাস এই নতুন প্রজন্ম যেদিন দেশ চালাবে সেদিনের বাংলাদেশ অনেক সুন্দর হবে। কথাপ্রসঙ্গে শাহবাগের আন্দোলনের উদাহরণ দিয়েই দেখালেন তিনি, প্রজন্ম কতটা সচেতন তার অধিকার আর দাবি নিয়ে। এই প্রজন্ম তাই ভাষার যত উপেক্ষার কথাই আসুক না কেন, বাংলার মর্যাদা রাখবেই। হতেই পারে গুটিকয়েক মানুষকে এই অনুভূতি নাড়া দেয় না, হীনম্মন্যতায় ভোগা সেই মানুষগুলোকে পেছনে রেখে দেশকে তরুণরা এগিয়ে নিয়েই যাবে।
গবেষক বিশ্বজিত্ ঘোষ ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তার অর্জনের তালিকায় রয়েছে ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক, দক্ষিণবাংলা সাহিত্যপদক, খেলাঘর প্রদত্ত সম্মাননাপদক, আব্দুর রব চৌধুরী স্বর্ণপদক, কবি জীবনানন্দ দাশ সাহিত্যপদক আর সর্বশেষ বাংলা একাডেমীর সর্বোচ্চ সম্মাননা ২০১১ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। এর বাইরেও তিনি অসংখ্য সংগঠন ও সংস্থার সাথে জড়িত রয়েছেন। সাহিত্যের চৌহদ্দীতে গুণী এই মানুষটার পদচারণা তাই সার্বক্ষণিক। দুই কন্যা শুক্লা প্রমিতি আর অর্পা অরুন্ধতীকে নিয়ে কেটে যায় তার সুখের সময়। শুক্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপ্রাণবিজ্ঞানের ছাত্রী আর অর্পা গ্রিনহেরাল্ডে পড়ছে স্ট্যান্ডার্ড ফোরে। তার এই সাফল্যের পথচলায় সঙ্গী সহধর্মিণী শিপ্রা সরকার, যিনি নিজেও একজন শিক্ষক, অধ্যাপনা করছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। গুণী এই মানুষটা তার লালিত স্বপ্ন দেখিয়ে যাবেন তার শিক্ষার্থীদের, তা সৃষ্টির আলোয় আলোকিত করবেন এই তারুণ্যকে। প্রজন্মের শুভকামনা তার জন্য।
