ব্লগ হলো মুক্তচিন্তার স্থান। মননশীল মানুষেরা ব্লগের মাধ্যমে নিজের মুক্তচিন্তার প্রকাশ ঘটায়। শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ আরও নানা বিষয়ে ব্লগের মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করেন ব্লগাররা। আবার জাতীয় স্বার্থের জন্য ব্লগের মাধ্যমে জনসাধারণকে জানানো যায় নিজের কথা এবং এই ব্লগের মাধ্যমেই গড়ে উঠে জনসচেতনতা। তারই একটি উত্কৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে বর্তমানে শাহবাগের এই প্রজন্মের গণ-আন্দোলন। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গড়ে উঠা এই আন্দোলনে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন এই প্রজন্মের জনপ্রিয় ব্লগার আরিফ জেবতিক। ব্লগার ও ব্লগ পাঠকদের প্রিয় এই মানুষটি তার লেখা এ সময়ের প্রেক্ষাপটে তার চিন্তাভাবনার ছবি এঁকে গড়ে তুলেছেন একটি সচেতন সমাজ। নির্ভীক এবং শানিত এই ব্লগ লেখককে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজনে লিখেছেন রিয়াদ খন্দকার
৫২-র পর থেকে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষায় প্রায় সব গণজাগরণের সূত্রপাত শাহবাগ থেকে। যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান প্রজন্ম চত্বরের এই আন্দোলনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সব প্রজন্মের মানুষ ৭১-এর মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সমবেত হচ্ছেন শাহবাগে। আর এই শাহবাগ চত্বরকে অন্য কোনো নাম বা বিশেষণ দিয়ে নয়। শুধুমাত্র ‘প্রজন্ম চত্বর’ বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন সব শ্রেণীর মানুষ। এই আন্দোলনের শুরুটা যাদের উদ্যোগে হয়েছিল তাদের অন্যতম একজন সক্রিয় কর্মী এবং জনপ্রিয় ব্লগার আরিফ জেবতিক। যার লেখা, যুক্তি, বিশ্লেষণ এই প্রজন্মকে এই আন্দোলনে সোচ্চার করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। প্রজন্মের এই সাহসী জনের কাছে জানতে চেয়েছিলাম সহজ অর্থে ব্লগের সংজ্ঞা, উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সবারই কিছু না কিছু ভাবনা থাকে। আর সেই ভাবনাগুলো অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে ইচ্ছা থাকাটাও স্বাভাবিক। ব্লগ হচ্ছে এই ভাবনাগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার সহজতম মাধ্যম, তাই ব্লগ লিখি।’ ব্লগ লেখা শুরুর গল্প জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘দিনতারিখ মনে নেই, তবে ২০০৭ সালের শেষের দিকে প্রথম ব্লগ লেখা শুরু করি। এর আগে আমি কয়েকটি পত্রিকায় লিখতাম। কিন্তু যা লেখি তা প্রায় সবই সম্পাদনার কাঁচির নিচে পড়ে যায়। ছাপা হওয়ার পরে নিজের লেখা চেনাই মুশকিল হয়ে যায়। এ জন্য বিরক্ত হয়ে আমি পত্রিকায় লেখালেখি বাদ দিয়ে দিই। তার কয়েক বছর পরে সম্ভবত ২০০৭ সালের দিকে আমি প্রথম ব্লগ লেখা শুরু করি।’ আপনার নিজের কোনো ব্লগ সাইট আছে কি? জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমার নিজের কোনো ব্লগ সাইট নেই। আমি মনে করি, আমার লেখা ফেরি করে বেড়ানো উচিত, পাঠক খুঁজে এসে আমার লেখা পড়বে, এমন বড় লেখক আমি নই। আমি তাই বিভিন্ন কমিউনিটি ব্লগে পাঠকের ভিড়ে নিজের লেখা নিয়ে উপস্থিত হই। সাধারণত আমি রাজনৈতিক পর্যবক্ষেণগুলো আমার ব্লগ.কম-এ লিখি, সাহিত্যের জন্য সচলায়তন আমার প্রিয় লেখালেখির জায়গা। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার ফেসবুক নোটগুলোই আমার নিজের ব্লগ হিসেবে বেশি পাঠকপ্রিয়।’ ব্লগ লেখার সময় ও বিষয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লেখালেখির জন্য আসলে ওভাবে কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। তবে রাতের বেলা একটু অবসর পাওয়া যায়, তখন লেখালেখিটা বেশি হয়। সমকালীন রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ আমার ব্লগ লেখার প্রিয় বিষয়।’ আপনার প্রিয় ব্লগার কারা জানতে চাইলে আরিফ বলেন, ‘এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া মুশকিল। বাংলা ব্লগে অনেক অনেক লেখক, তাদের অনেকের লেখাই কোনো না কোনো সময় ভালো লেগেছে। তবে তালিকা করতে বললে, আমার মনে হয় আমি সবার আগে হিমুর নাম বলব। সচলায়তন ব্লগ সাইটের এই নিয়মিত ব্লগার আমার দেখা শুধু সেরা ব্লগার শুধু নন, আমি তো মনে করি এই প্রজন্মের অন্যতম শক্তিশালী লেখক। উনি লেখালেখিতে সিরিয়াস হলে দেশের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় লেখক হবেন বলে আমার বিশ্বাস। এর বাইরে আমার ব্লগের রাসেল, যিনি ডটু রাসেল নামে বেশি পরিচিত, তার লেখা আমার প্রিয়। এ ছাড়া অমি রহমান পিয়ালের গবেষণাধর্মী লেখাগুলোর আমি ভক্ত। হাসান মোরশেদের লেখায় নিজের অনেক চিন্তার প্রতিচ্ছবি পাই। বাংলা ব্লগকে প্রযুক্তিগত দিকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য এসএম মাহবুব মুর্শেদ এবং অরূপ আমার প্রিয় তালিকায় আছেন। ডেডিকেটেড ব্লগার হিসেবে মাহমুদুল হাসান রুবেল আমার প্রিয় ব্লগার। নতুনদের মাঝে আলিম আল রাজী এবং হাসান মাহবুবের লেখা আমি পড়ি। সিন্ডিকেট নিক হিসেবে একই নামে কয়েকজন ব্লগার লিখে থাকেন। এর মাঝে দিনমজুর নিকের সবার লেখা এবং লোকাল টক নিকের কয়েকজনের লেখা আমার ভালো লাগে।’ ব্লগ লেখাটা কি কাজে লাগে নাকি নিছক সময় কাটানো? উত্তরে তিনি বলেন, ‘বলেন কী! অবশ্যই কাজে লাগে। চিন্তার বিস্তার সবসময়ই কাজে লাগে। যেকোনো সত্য ও সুন্দরের উচ্চারণ প্রতিধ্বনিত হয় এবং সেগুলো বড় আওয়াজ হিসেবে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।’ ব্লগকে বলা হয় মুক্ত চিন্তার স্থান। এখানে মুক্ত চিন্তার সুযোগ কতটুকু জানতে চাইলে জেবতিক বলেন, ‘অবশ্যই ব্লগ মুক্তচিন্তার স্থান। তবে আমাদের দেশে যেভাবে কমিউনিটি ব্লগিং হচ্ছে, সেখানে মুক্তচিন্তার চর্চা সবসময় সম্ভব হয় না। বড় কমিউনিটি ব্লগগুলোর মাঝে আমার ব্লগ ছাড়া বাকিগুলোতে মডারেশন আছে। কোনো কোনো ব্লগের মডারেটরদের তো ভালো লেখা আর খারাপ লেখার পার্থক্য করারই যোগ্যতা নেই। এরা মুক্তচিন্তা শব্দটি বানান করে লিখতেই পারবে না, সুতরাং এসব স্থানে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে এসবই হচ্ছে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, এর জন্য ব্লগকে দোষারোপ করা ঠিক হবে না।’ ব্লগ কি সচেতনতা তৈরি করে ? করলে তা কোন শ্রেণীর মানুষের কাছে বেশি করে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই করে। অনেক প্রচলিত মিথ আর রাজনৈতিক কুসংষ্কার ব্লগের আলোচনার মাধ্যমে আলো পায়। আর এখন তো ব্লগাররা মিলে রাজনৈতিক মুভমেন্টও সংগঠিত করেছে। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশাল বড় জায়গা নিয়ে থাকবে। আমি নিজেও রাজনীতি নিয়ে লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ ব্লগ লেখা কি আপনার পেশা বা কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, তেমন একটা করে না। বরং যে বিষয়টি আমাকে তাড়িত করে, সে বিষয়ে লিখতে না পারলেই এক ধরনের চাপ অনুভব করি, সেটাই বরং দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটায় বেশি।’ প্রায়ই ব্লগারদের মধ্যে দেখা যায় একদল আরেক দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, এটা আপনার কাছে কতটুকু যৌক্তিক বলে মনে হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ জেবতিক বলেন, ‘আমি এমনটা কখনও দেখিনি। তবে দেশ ও মাটির বিরুদ্ধে কেউ লেখালেখি করলে, স্বাভাবিকভাবেই তরুণ পাঠকরা সেটির প্রতিবাদ করবে। এই প্রতিবাদ যে সব সময় শোভন হয়, এমন নয় কিন্তু এটাকে অযৌক্তিক বলারও কোনো কারণ নেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচার পতন আন্দোলন আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ’৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শাহবাগ থেকেই শুরু হয় গণজাগরণ। সেই থেকে মুক্তির লড়াই শুরু। এবার রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দাবি নিয়ে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর এখন উত্তাল। এখানে আসা সাধারণ মানুষ বলছে প্রত্যেক প্রজন্মের মেলবন্ধন নিয়ে এই নামটি আজ সার্থক। আজকের টানা এতদিনের নিদ্রাহীন এই শাহবাগ চত্বর এখন রাজাকারদের ফাঁসির দাবি আদায়ের সব প্রজন্মের মঞ্চ।’ সেই ব্রিটিশ আমলের শাহবাগ, আজকের এই ‘প্রজন্ম চত্বর’ তাদের দাবি আদায়ের নামের সার্থকতা খুঁজে পাবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
