নতুন প্রজন্মের ডাক :সামপ্রদায়িক রাজনীতি নিপাত যাক

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৫১
পাঁচ ফেব্রুয়ারি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লা রাজাকারের ফাঁসির আদেশ না দিয়ে জাবজ্জীবন কারাদন্ডের রায় দেয়। কাদের মোল্লা একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অনেক মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেছে। সমগ্র দেশবাসী আশা করেছিল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হবে। নতুন প্রজন্ম এই রায় মোটেই মেনে নিতে পারেনি। নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন, শত শত মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করেও যদি কাদের মোল্লার ফাঁসি না হয় তবে আর কত খুনের জন্য ফাঁসির আদেশ হবে। নতুন প্রজন্ম শাহবাগে অবস্থান নিল। তারা দেশের সমস্ত মানুষকে সেখানে সমবেত হতে ডাক দিলেন। দু’এক দিনের মধ্যে সেখানে সমবেত হলো লক্ষ লক্ষ তরুণ-কিশোর -আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। শাহবাগ হলো জনসমুদ্র। ঐ জনসমুদ্র থেকে ঘোষণা আসল আমরা কাদের মোল্লার ফাঁসিসহ সমস্ত যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ অবস্থান চলতেই থাকবে। আরো ঘোষিত হলো এটা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সমাবেশ। সাথে সাথে দেশের সর্বত্র থেকে হাজারো মানুষ শাহবাগের মত এমন অবস্থানকে স্বাগত জানালো। সবার শ্লোগান যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি চাই, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধ চাই। নতুন প্রজন্মের কোটি কোটি তরুণ জেগেছে তাদের দমানো যাবে না। ১৯৭৫ সনে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে এই চক্রটি স্বাধীনতার সমস্ত চেতনা ধ্বংস করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিদায় করে দিতে চেয়ছিল। তারা স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করে মিথ্যা ইতিহাস কোমল মতি ছেলে-মেয়েদের পড়াইতে শুরু করল। সমপ্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করল। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে দিল। মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায় করে দিল। নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করল। কর্নেল তাহেরসহ হাজার হাজার সামরিক বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করল। সেই সামপ্রদায়িক স্বাধীনতা বিরোধী চক্রটি এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের প্রায় ৯৫ ভাগ তরুণই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। স্বাধীনতা বিরোধী জোট এখন নিভু নিভু অবস্থায় মরণ কামড় দিচ্ছে। তারা আচমকা পুলিশকে আক্রমণ করছে। গাড়ি পুড়ছে। আর তাদের মোড়ল হতাশায় আধমরা হয়ে শাহবাগের উত্থানকে আওয়ামী লীগের নাটক বলে চালাতে চাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের তরুণদের নেতৃত্বে শাহবাগ চত্বরে জমায়েত বাংলাদেশের শিশু, কিশোর, যুবক, যুবতি, প্রৌঢ়, মুক্তিযোদ্ধা, বৃদ্ধ তথা আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শাহবাগে রাজাকারদের ফাঁসির পক্ষে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যাচ্ছে। তাদের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে বাংলাদেশের সমস্ত বিভাগীয় শহরে, জেলা শহরে, উপজেলা শহরে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ অব্যাহত আছে। ক্লান্তিকে তারা বিদায় দিয়েছে। তারা ধর্মনিরপেক্ষ দেশ দেখতে চায়। রাজাকারদের ফাঁসি চায়। সামপ্রদায়িক শক্তিকে বাংলাদেশ থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করতে চায়। এ দাবি এ সমাবেশে চলতেই থাকবে যতদিন পর্যন্ত কার্যকর না হয়। মহাজোট সরকার ইতিমধ্যে এই সমাবেশের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। জাতীয় সংসদ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ট্রাইব্যুনাল আইনে একটা সংশোধনী এনেছে যাতে উচ্চ আদালতে বাদি পক্ষ আপিল করে যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি বৃদ্ধি করতে পারে। নতুন প্রজন্ম একে স্বাগত জানিয়েছে। এদিকে সংসদে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার নিমিত্তে বিল আনার আলোচনা চলছে। অর্থাত্ বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যে রকম বাংলাদেশ চায় তারই আয়োজন করছে সরকার। মোট কথা এদেশে সামপ্রদায়িক রাজনীতির দিন শেষ হয়ে গেল। আর যারা এদেশে ৭৫-এ সামপ্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাদেরকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করা হলো। তারা আর কোনদিন এদেশে সামপ্রদায়িক রাজনীতি করতে পারবে না। ইতিহাস বিকৃতির আর কোন সুযোগ পাবে না। আমরা নতুন প্রজন্মের সাথে আছি। যে মন্ত্র নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। সে মন্ত্রেই বাংলাদেশ ফিরে যাক। সামপ্রদায়িক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হোক। সামপ্রদায়িক রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাক এই আমাদের কামনা। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, যেহেতু বর্তমান সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তাই আজ নতুন প্রজন্ম যে সমস্ত দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে তা সরকারের পক্ষে যে গুলো পূরণ করে দেয়া সম্ভব তা অতিদ্রুত পূরণ করে দিক। এ দেশের ১৬ কোটি মানুষই জানে যে, ৭১-এর ঘাতকরা সবাই খুনি, ধর্ষক ও সর্বপ্রকার কুকর্মের, সর্বপ্রকার অপরাধের হোতা। তাই আদালতের পক্ষে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া অসম্ভব নয়। দেশের মানুষের প্রত্যাশা, আশা করি আদালত বিবেচনায় রাখবে। নতুন প্রজন্ম জানে, দেশবাসী জানে যে বিচার করা সরকারের দায়িত্ব না। তবে নিম্ন আদালতে যদি লঘুদন্ড দেয়া হয় তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার যে সে আপিল করবে তা আমরা বিশ্বাস করি। একটা কথা আমি উল্লেখ করতে চাই, আমাদের পবিত্র কোরানেও আছে খুনের বিচারের রায় মৃত্যুদন্ডই, আল্লাহ্র বিচার। আজ সবার মুখেই শুনি রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ চাই। দেশকে রাজাকার মুক্ত করেই তারা ঘরে ফিরবে, এর আগে নয়। প্রজন্ম চত্বর শাহবাগ হোক বাংলাদেশ থেকে সামপ্রদায়িকতা মুক্ত একটি স্থায়ী রণাঙ্গন আর নতুন প্রজন্ম হোক সে রণাঙ্গনের সৈনিক। লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও ছাত্রনেতা