পাকিস্তানের সূচনালগ্ন থেকেই দেশে সুশাসনের অবাব দেখা যাচ্ছিল যেজন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিকখাতে দূরাবস্থা প্রকাশ পেতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের শাসনকালে খাদ্যদ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছে। আর লবণ সংকট তো কিংবদন্তীর মতো হয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে এ ধরনের ঘটনার কোনো আলামত দেখতে পাওয়া যায়নি। অর্থাত্ যাত্রার শুরু থেকেই পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই পাকিস্তানের যাত্রা হয় দু’ভাবে। বাঙালি মুসলমানের স্বপ্নের পাকিস্তান পূর্ববঙ্গে অর্থাত্ তার নিজস্ব মাটিতে দুঃস্বপ্নের চলচ্চিত্র তৈরি করতে থাকে। আর শীর্ষস্থানীয় লীগ নেতারা বলতে থাকেন: ‘শিশু রাষ্ট্র পাকিস্তান। তাকে উঠে দাঁড়াতে, হাঁটতে সময় দিতে হবে। এখন সমালোচনা পাকিস্তানের ধ্বংস ডেকে আনবে। তাতে ভারতের মতো শত্রুর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। বাঙালি তাই অনেকটা অসহায়ভাবে চুপ করে থাকে।’ কিন্তু সবাই তো আর চুপ করে থাকার নয়। তাই দু’-একটা পত্রিকায় এ অবস্থার ছবি ফুটে উঠতে থাকে। পত্রিকার ভাষ্য-প্রতিবেদনের সার সংক্ষেপে পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে দূরাবস্থার ছবিটাই বড় হয়ে ওঠে। দেখা যায়, দুর্নীতি সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লীগ নেতারা শুধু মন্ত্রী-উপমন্ত্রী হয়েই খুশি থাকছেন না, তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে মুনাফাবাজিতে ধনিক-বণিক হয়ে ওঠেছেন। একই অবস্থা নাজিমদ্দিন থেকে নুরুল আমিনের শাসনকালেও। পরিবর্তন বা অবস্থার কোনো প্রকার উন্নতির লক্ষণ দেখা যায়নি। খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে ধান-চাল দুর্নীতি মানুষকে দুর্দশার মুখোমুখি করে তুলছে। কৃষিপ্রধান ও খাদ্য উত্পাদনে বাড়তি পূর্ববাংলায় এ অবস্থা অবিশ্বাস্য। যত সমস্যা সব সাধারণ মানুষের। অন্যদের নয়। একটি কাগজের মন্তব্য বেশ মজার:সরকার গ্রামবাসীর কাছ থেকে চাল কিনেন ১০ টাকা মণ। আর আমাদের নিকট চাল বিক্রি করেন ২২ টাকা মণ। পাঞ্জাবের ৬ টাকা মণের গম আমাদেরকে কিনিতে হয় ১৮/২২ টাকায়। সরকারের এই মুনাফাখোরী নীতির ফলে অভাব-অনটন চরমে উঠেছে ও দুর্ভিক্ষ-দানব মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ...খাদ্যের বাড়তি দেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করা কম ‘যোগ্যতার’ কথা নয়। পরিস্থিতি বাস্তবিকই স্বপ্নের দেশে দুঃস্বপ্নের সৃষ্টি করে চলছিল। তবু সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের দোহাই মেনে কিছুটা শান্ত থাকে। তবে তা বেশি দিন নয়। এভাবেই পাট, পাট চাষীর সমস্যা থেকে শিক্ষাব্যবস্থায় সংকোচন নীতি; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোর দুর্দশার বাস্তব বিবরণও মানুষকে হতবাক করে দেয়। অবাক হতে হয় পরিসংখ্যান দেখে যে পঞ্চাশের দশকে পৌঁছে অর্থাত্ কথিত স্বাধীনতার পাঁচ বছর পরেও শিক্ষার এমনই দুরাবস্থা যে পূর্ববঙ্গে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত।
বলতে হয় একটি ভয়াবহ অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যান! এক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতি যতটা তার চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ্য করার বিষয় পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ব্যবধান। শুধু সাধারণ শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, কারিগরি শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান ও বৈষম্য কারো চোখ এড়ায়নি। তাই পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদের মধ্যেও দেখেছি অসন্তোষ ও সমালোচনা। সমালোচনা কমনরুমের আলোচনায়, ডিবেটে, ম্যাগাজিনে লেখায়। পশ্চিমে ডিগ্রিধারী চিকিত্সক, বিলেতে শিক্ষিত চিকিত্সক সংখ্যাগুরু, স্বভাবতই সরকারি চাকরিতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কেন্দ্রীয় সরকারে এবং সামরিক বাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা চোখে না পড়ার মতন। এসব প্রশ্ন তোলার সঙ্গে সঙ্গে ‘প্রাদেশিকতা’ নামক অভিযোগের খাড়া মাথার পরে নেমে আসে।
পূর্ববঙ্গে যেটুকু অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা তার সবটুকুই মুসলিম লীগ পার্টির বড় বড় নেতাদের দখলে। তারাই সরকারের অংশ, তাদের হাতে দেশের শাসন পরিচালনার ভার। শিক্ষার দুর্দশা সত্ত্বেও এর মধ্যেই বেকারত্বের হার বেড়ে চলেছে। স্বভাবতই অসন্তোষ-ক্ষোভ মাথাচাড়া দেবার কথা এবং তা দিচ্ছে যুব সমাজে। এমনকি দেখা দিচ্ছে প্রতিবাদ। এসব ধামাচাপা দিতে কলাকানুন, জেল-জুলুম, অত্যাচার সব কিছুই শাসকদের অনাচারের হাতিয়ার। আর হাতিয়ারের বড় প্রয়োগ বাংলা ভাষার ওপর। তাই ভাষা নিয়ে বিক্ষোভ ছাত্র সমাজের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। সরকারের চোটা দমননীতির মাধ্যমে এ ক্ষোভ চাপা দেয়া হয়। আটচল্লিশের পর জিন্নাহ সাহেবের বরাত দিয়ে সে ক্ষোভ কিছুটা চাপা দেয়া সম্ভব হলেও ১৯৫২ সালে পৌঁছে সরকারের পক্ষে সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তার প্রধান কারণ জনমানসে লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, আর্থ-সামাজিক দুরবস্থা যা মধ্যবিত্ত শ্রেণীকেও স্পর্শ করতে ছাড়েনি।
[লেখক: ভাষাসংগ্রামী ও প্রাবন্ধিক]
