রোজকার জীবনে ছুটে চলা নানা ব্যস্ততায়। এর মাঝেও নিজেকে একটু সজীব রাখার চেষ্টা। একঘেয়েমিকে গুডবাই জানিয়ে শুরু করুন নতুন পথচলা। বাঁচুন প্রাণখুলে, কথা বলুন প্রাণোচ্ছ্বাসে। নিজেকে বুঝাতে চেষ্টা করুন, মুষড়ে পড়াটাই জীবন নয়, ‘জাস্ট চিয়ার’ বলে নতুন উদ্যমে হাল ধরে রাখাটাই কৃতিত্ব। যতই কাজের দোহাই দিন না কেন, নিজেকে প্রমাণ করুন আপনি। বুঝতে চেষ্টা করুন, অফিস অথবা পড়াশোনার বাইরেও আপনার সত্তা ফুরিয়ে যায়নি এখনও। ক্লান্ত জীবনকে ফুরফুরে করে তোলার কিছু টিপস জানিয়েছেন
সাজেদুল ইসলাম শুভ্র
সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমাদের প্রথমে যে কথাটা মনে আসে তা হলো আজকের দিনটা কেমন কাটবে! সেই সাথে সবাই আশা করি দিনটা যেন ঝামেলামুক্ত ও আনন্দময় কাটে। কিন্তু দেখা যায় সব সময় মনের ইচ্ছাটা পূরণ হয় না। দিনের শেষে ক্লান্ত-বিষণ্ন চিত্তে বাসায় ফিরতে হয়। আমরা কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই এই অবস্থার উন্নতি করতে পারি। সেটা অনেকটাই নিজের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
প্রত্যেক মানুষেরই কিছু না কিছু মানসিক বা শারীরিক চাপ থাকে। এই মানসিক বা শারীরিক চাপকে স্ট্রেস বলে। আধুনিক জীবন বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। ফলে স্ট্রেস মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। মনোচিকিত্সকের মতে, মানুষ যখন এই চাপ আর সহ্য করতে পারে না তখনই সে মানসিক ও শারীরিক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার আচার-আচরণ হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক।
স্ট্রেস সাধারণ কোনো অসুখের মতো নয় যে ওষুধ খেলে সেরে যাবে। স্ট্রেস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
প্রথমেই কী কী কারণে আপনার স্ট্রেস বেড়ে যায় তা জানার চেষ্টা করুন। বাড়ি বা অফিসের কোনো পরিস্থিতি, চারপাশের সবার ব্যবহার, ডেডলাইন মিট করতে না পারা, রান্নার লোক না আসা, বাচ্চার স্কুলের পরীক্ষা—এরকম বিভিন্ন কারণে আপনার স্ট্রেস হতে পারে। কখন কোন কারণে স্ট্রেস হচ্ছে তা খুঁজে বের করুন। তাহলে আপনি সহজেই তা সমাধানের পথও খুঁজে পাবেন।
যতই কাজ থাক, ফেরার সময় একেকজনের একেক রকম হোক, ডিনার টাইমে পরিবারের সকলে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করুন। এক সঙ্গে গল্পগুজব করুন, সকলের খোঁজখবর নিন।
যেকোনো খারাপ পরিস্থিতিতে পুরো ব্যাপারটি নিয়ে অন্তত দুবার ভাবুন। যুক্তি দিয়ে ভাবলে দেখবেন জটিল বিষয়ও অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। এমন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করবেন না, যেটা আমাদের আওতার বাইরে। ভবিষ্যতের চিন্তা করে অযথা উত্তেজিত না হয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করবেন তা চিন্তা করুন। এরপর আর কী কী খারাপ হতে পারে তা নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করবেন না।
বই পড়ার অভ্যাস করুন। এতে সময় কাটে, মন ভালো থাকে, জানার পরিধি তো বাড়েই। বই পড়ার অভ্যাস না থাকলে মনোযোগ দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। ভালোও লাগে না তাই প্রথম দিকে অভ্যাস গড়ে তুলতে হালকা যেকোনো বই, ম্যাগাজিন পড়ার চেষ্টা করুন, সুবিধা হবে।
পছন্দমতো গান শোনার অভ্যাস করুন। সকালে কাজ সারতে সারতে গান শুনতে পারেন অথবা রাতে ঘুমানোর সময় গান শুনতে পারেন, আপনার সময় ও সুবিধার ওপর নির্ভর করবে কখন শুনবেন। একবার অভ্যাস হয়ে গেলে দেখবেন মন ভালো রাখতে এর জুড়ি নেই।
সারাদিন কী কী কাজ করবেন তার একটা তালিকা তৈরি করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোকে তালিকার শীর্ষে রাখুন। কম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে কম সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন। দরকারি কাজগুলো গোড়াতেই সেরে ফেলতে পারলে টেনশন অনেকটা কমে যাবে। আর কাজ ভালোভাবে শেষ করতে পারলে মনও ভালো থাকবে। এভাবে তালিকা করে কাজ করতে পারলে দেখবেন দিনের শেষে বেশ কিছুটা সময় আপনার হাতে রয়েছে।
নিজের হাতে বাগান করার আনন্দই আলাদা। বাগান করার আলাদা জায়গা না থাকলে বারান্দার টবেই পছন্দের ফুল কিংবা পাতাবাহার গাছ লাগান, নিজে দেখাশোনা করুন, সঙ্গে আপনার সন্তানকে সাহায্যকারী হিসেবে নিতে পারেন। এতে আপনার সন্তানও স্ট্রেস মুক্ত থাকবে।
হাসতে শিখুন, জোক বলুন, হাসলে রক্ত সঞ্চালন ভালো হয়, রক্তনালি সবল থাকে, অ্যাবডমিনাল পেশি সুঠাম হয়। মন ভালো থাকে, বাড়ির সকলে মিলে জোক বলুন, মজার ছবি দেখুন।
কাজ থেকে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত, অবসন্ন থাকলে স্ট্রেস আরও চেপে বসে। তাই সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন। সক্রিয় থাকা মানে এই নয় যে, জোরদার ব্যায়াম করতে হবে বা বাড়ির সব কাজ করতে হবে। বাড়ি ফিরে অবসন্ন অবস্থায় শুয়ে না পড়ে ভালো করে গোসল করে, হালকা চা-নাশতা করে বাচ্চাদের সাথে খেলতে পারেন অথবা পরিবারের সবার সাথে গল্প করতে পারেন, ডিনারের পর এক সঙ্গে হাঁটতে পারেন। পরের দিনের কাজের কথা বেশি না ভেবে রাতে ভালো করে ঘুমান। প্রয়োজনে হালকা মিউজিক চালিয়ে ঘুমাতে পারেন।
সারাদিনের কাজের চাপে বিপর্যস্ত। দিনের শেষেও ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না কাজের ভূত। তাহলে বাড়ি ফিরে গোসল সেরে প্রদীপ কিংবা মোমের শিখার দিকে তাকিয়ে থাকুন, এটা চাপমুক্তির একটা বড় কৌশল।
মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠার জন্য সহায়ক হিসেবে অনেক বই, সিনেমা, ভিডিও এবং কোর্স রয়েছে। অনেক আলোচক আছেন যারা মানসিক চাপ নিয়ে আলোচনা করেন, আপনার পারিবারিক ডাক্তারকে বলুন আপনাকে কোনো মানসিক চাপসংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে হস্তান্তর করতে। সেখানে চাপ নিয়ন্ত্রণ অনেক উত্স রয়েছে যা আপনাকে সাহায্য করবে। শারীরিক কাজ মানসিক চাপ কমানোর এক মহৌষধ। হাঁটুন, খেলুন, বাগানে কাজ করুন, ঘর পরিষ্কার করুন, কিন্তু আরামদায়ক শারীরিক চর্চাও আপনার জন্য উপকারী হতে পারে। গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে বাতাস ছাড়ুন। আরেকটি ব্যায়াম হচ্ছে দেহকে শক্ত করুন, আস্তে আস্তে শিথিলায়ন করুন। এই পদ্ধতি আপনার টেনশন কমানোর জন্য সহায়ক হবে। এতে আপনি মানসিক শান্তি পাবেন এবং সমস্যা সমাধান করতে সাহায্য করবে। আপনি হয়তো সাময়িকভাবে আপনার মানসিক চাপ কমাতে পারবেন উপরোল্লিখিত পদ্ধতিতে। আপনার শখকে প্রাধান্য দিন, খেলুন, কাজ করুন তবে আপনি শান্তিপূর্ণ ছুটি কাটাতে পারবেন। যদি আপনি কিছু সময়ের জন্য মানসিক চাপ ভুলে থাকেন এবং এক সময় আপনার সমস্যা সমাধানে এক ধাপ এগিয়ে যাবেন।
বাবা-মাসহ নিকটজনের অনুপ্রেরণা শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। তবে তাই বলে আবার প্রশংসার পরিমাণ যেন এত বেশি না হয় যে শিশু নিজেই নিজেকে অনেক বেশি যোগ্য এবং অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে না করে, অহংকারী হয়ে না উঠে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।
আমরা প্রায় দেখি আমাদের যেকোনো কাজে ছোটরা নিজ থেকে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আমরা সাধারণত বলি, না তোমার করার দরকার নেই,তুমি পারবে না। আমাদের এই সামান্য কথা যে শিশুদের মনে কতখানি বিরূপ অবস্থার সৃষ্টি করে তা কিন্তু আমরা বুঝি না, কিংবা বোঝার চেষ্টাও করি না। অথচ আমরা যদি শিশুদের করার মতো বা যে কাজটা তারা পারবে তা তাদের করতে দিই এবং কাজটা করার পর তাদেরকে আপ্রিশিয়েট করি তাহলে কিন্তু তাদের আত্মবিশ্বাস অনেকখানিই চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
শৈশব থেকেই শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদা বোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব বাবা-মায়ের। তাদের ছোট ছোট পদক্ষেপে, তাদের ছোট ছোট সাফল্যকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। যেন তারা সফল হওয়ার চেষ্টা করে। কেননা সে জানবে কোনো কাজে সফল হতে পারলে তার জন্য ডাবল পুরস্কার অপেক্ষা করছে। একটা পুরস্কার তো কাজের সফলতা, আরেকটা পুরস্কার বাবা-মায়ের সাধুবাদ।
তাই বলে যেসব বাবা-মায়ের সন্তানেরা কোনো কাজে সফল হতে পারবে না, বা কোনো কারণে তারা অন্য অনেক শিশুর মতো দুরন্ত নয় সেক্ষেত্রে তাদের কড়া সমালোচনা বা তিরস্কার করা কখনও উচিত নয়। বিশেষ করে অন্যদের সামনে তাকে তুচ্ছ করা বা তার অযোগ্যতাকে হাইলাইট করতে গিয়ে বাস্তবিক অর্থেই শিশুটির মনে হীনম্মন্যতাবোধ জাগিয়ে দেওয়া হয়। হীনম্মন্যতা এমন এক মারাত্মক ব্যাধি যা খুব নিরবে ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। তাই তাদের পিছিয়ে থাকা, তাদের অযোগ্যতা, তাদের ভুলগুলো শুধরে তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাবা-মাকে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। কারণ তাদের সময় দিতে হবে। তাদের দুর্বল দিকগুলো এড়িয়ে তাদেরকেও সফল করে তুলতে হবে। তাদের বলতে হবে, তোমরা পারবে।
বাবা-মাসহ নিকটজনের অনুপ্রেরণা শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। তবে তাই বলে আবার প্রশংসার পরিমাণ যেন এত বেশি না হয় যে শিশু নিজেই নিজেকে অনেক বেশি যোগ্য এবং অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে না করে, অহংকারী হয়ে না উঠে সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে।
শিশুদের মধ্যে পজিটিভ সেলফ ইমেজ তৈরি করুন। তাদের সঙ্গে পজিটিভ অ্যাপ্রোচ করুন। অর্থাত্ শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন। তাদের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিন। এতে নিশ্চিত সাফল্য আসবে। নিজের সুপ্ত ইচ্ছেগুলো মানুষ তার সন্তানের মধ্য দিয়েই পূরণের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু মনে রাখা দরকার আপনার স্বপ্নগুলো চাপ যেন আপনার শিশুর নিজের স্বপ্নগুলোর মৃত্যুর কারণ না হয়ে যায়। তাই শিশুর শৈশবটা হয়ে উঠুক আনন্দ আর শিক্ষণীয় এক পরিবেশের এক দারুণ সমাহার। বড় হয়ে সে যেন উপলব্ধি করতে পারে তার বড়বেলার সাফল্যের মূলমন্ত্র কিন্তু তার দুর্দান্ত শৈশবের আত্মবিশ্বাস। যার ভিত গড়ে দিয়েছিল তার বাবা-মাসহ সকল আপনজন।
