পার্শ্বরচনা

বর্ণমালায় প্রতিদিন

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৮:১৪
ভাষা, বহতা নদীর মতো। ভাষার নামে যে দেশের নাম, সেই ভাষার আকুতি হারিয়ে যেতে বসেছে। হারিয়ে ফেলছি আমরা আমাদের স্বকীয়তাকে। তাই নতুন প্রজন্ম আজ বিভ্রান্ত। সচেতনতা আর দেশপ্রেমই পারে এ সংকট মোকাবিলা করতে। আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠুক মাতৃভাষার বর্ণমালায়। শিশুদের মাতৃভাষার বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের পথ নিয়ে লিখেছেন সাবেরা সুলতানা শুক্রবার। ছুটির দিনে মেয়ে টুম্পাকে একটু বেশিই সময় দিতে পছন্দ করেন শাওন্তী রহমান। টুম্পার সাথে টেলিভিশন দেখতে বসেছেন শাওন্তী। রিমোটের বোতামে চ্যানেল বদলাতে বদলাতে চোখ থমকে গেল টিভি পর্দায়। অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গিতে হাত-পা নেড়ে একজন তরুণী ‘ভিয়ার্স’ বলতে বলতে ‘মোস্ট ওয়াউন্টড’ আপনাদের ফেভারিট প্রোগ্রাম ওয়াচ-এর আমন্ত্রণ জানালো। তরুণীর মুখে এই রকমের বাংলিশ (বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণ) ভাষা শুনে শাওন্তীর আট বছরের মেয়ে টুম্পা বলল, ‘আম্মু আন্টি কি বাংলা বলছে, না কি ইংরেজি?’ মেয়ের কথা শুনে শাওন্তী কী বললেন খুঁজে পেলেন না। তিনি ভাবতে লাগলেন, ‘বাংলার মতো এমন একটি মধুর ভাষা থাকতে এরা কেন এমন হাস্যকর একটা ভাষায় কথা বলছে? ইংরেজি ভাষায়ও কি শব্দের অভাব পড়ে গেল? তার মেয়ে চারপাশের এসব দেখে কী শিখবে? শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারবে কি? ভাবনাগুলো এখন আর শাওন্তীর একার নয়। বর্তমানে আমাদের অনেকের মনেই এই প্রশ্নগুলো দোলা দিয়ে যায়। আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠি আমাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে। বড় ভালোবাসা আর কষ্ট নিয়ে আমাদের দেশের নাম হয়েছে ভাষার নামে। আমাদের দেশের নাম বাংলার নামে, বাংলাদেশ। আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সমৃদ্ধশালী ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি। বাংলা মায়ের বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে প্রাণদানের এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। বায়ান্নর সেই আগুন কর আন্দোলনই রচনা করে দিয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের পথরেখা। আজও আমরা আমাদের রক্তে শুনি সেই দিনের মন্ত্রণা। এ কারণেই ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের দায়িত্ববোধ উদ্বুদ্ধ করার মাস। শুধুমাত্র বাঙালির প্রাণেই নয়, মাতৃভাষার মর্যাদা আর গুরুত্ব এখন ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীজুড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বছরের এই একটি মাসকে ঘিরে প্রস্তুতি, অনুষ্ঠান ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। এ উপলক্ষে দেশীয় সংস্কৃতির নানাদিক তুলে ধরা হয়। আয়োজিত হয় বইমেলা, কবিতা উত্সব, নাট্য উত্সব আরও কত কিছু। রাস্তায় রাস্তায় দেখতে পাওয়া যায় বাংলা বর্ণমালার ছড়াছড়ি। এ মাস উপলক্ষে মার্কেটে গুলোতে পাওয়া যায় বর্ণমালার নকশা করা দেশীয় পোশাক। যা দেখে সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়। কিন্তু যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় তা হলো, এত বছর পরও আমরা কি পেয়েছি রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সেই বর্ণমালায় শুদ্ধ ব্যবহার শিখতে? ছেলেমেয়েদের কাছে বর্ণমালাকে পৌঁছে দিতে? ভাষার নাম যে দেশের নাম, সেই দেশের ভাষা চর্চার মানটা কেমন? বর্তমান সময়ে পথ চলতে, নাটক-সিনেমা দেখতে, এমনকি কারও সাথে কথা বলতে গেলেও রীতিমতো অবাক হতে হয়। অর্ধেক বাংলা আর অর্ধেক ইংরেজি মিলে মিশে এক সংস্কার ভাষার উদ্ভব হয়েছে আমাদের দেশে। পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি বাদ দেবার কিছু নেই। কিন্তু একে কি ইংরেজির ব্যবহার বলা যায়, না কি এটা অপব্যবহার? বোধহয় অপব্যবহার বলাই শ্রেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই হাস্যকর ভাষার ব্যবহার আমাদের তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বাংলা ভাষা শিক্ষার গুরুত্বহীনতা, দায়িত্ববোধের অভাব ইত্যাদি নানা কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলা ভাষা দিন দিন হারাচ্ছে তার শুদ্ধতা ও মাধুর্যতা। এতে করে বাংলা এবং ইংরেজি দুটো ভাষাকেই অবজ্ঞা করা হচ্ছে। ভাষা ব্যবহারে সচেতনতা আবশ্যক। মাতৃভাষা বাংলা শেখার যেমন দরকার, তেমনি ভাবে বিংশ শতাব্দীর দুয়ারে এসে অস্বীকার করা যাচ্ছে না ইংরেজিকেও। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, “ভাষার সাথে মানুষের ভাতের সম্পর্ক, জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে এক সময়ে ভাবা হতো, শিশুদের পক্ষে দুটো ভাষা এক সঙ্গে শেখা কঠিন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাকরণগত পদবিন্যাস শেখার সবচেয়ে ভালো সময় হলো পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে। এরপর ভাষাজ্ঞান আয়ত্ত করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। সুতরাং ভাষা শিক্ষার জন্য আদর্শ সময় হলো প্রাথমিক স্তর। অস্বীকার করা যাবে না, বিধায় বাংলার পাশাপাশি শিখতে হবে ইংরেজি ভাষাও। নতুবা আমরা পিছিয়ে পড়ব প্রতিযোগিতা থেকে।’ অতএব, সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে প্রাথমিক স্তর থেকে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার শিক্ষা দেওয়া। আর এ ক্ষেত্রে মাতৃভাষা যদি হয় মাধ্যম, তবে তো সোনায় সোহাগা। বিশ্ব সাহিত্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে মাতৃভাষা বাংলার বিকল্প নেই। নিজের পরিচয় জানাতে অবশ্যই চর্চা দরকার বাংলা ভাষার। গৌরবময় সেই ভাষাকে জানাতে প্রয়োজন আত্মচেতনা ও সরকারি উদ্যোগের। এ বিষয়ে কথা বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু জাফর। তিনি বলেন, ‘শিশুদের শুদ্ধভাষা শিক্ষার জন্য প্রয়োজন আত্মচেতনা, সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা। প্রয়োজন দরদি ও উপযুক্ত শিক্ষকের যারা শিশুদের সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে পারবেন। বাচ্চাদের বইগুলোও হতে হবে সুন্দর কাগজ, ছবি দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত। বইয়ের তাজা গন্ধই তাদেরকে বই পড়তে মনোযোগী করে তুলবে। অভিভাবকদের বড় ভূমিকা রয়েছে এ ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে শেখার শিক্ষা পরিবার থেকেই পাওয়া উচিত। সর্বোপরি, সবার উপরে কাজ করবে সকলের দেশপ্রেম।’ মাতৃভাষা শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিচার করছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে। বৈজ্ঞানিক ও শিশুদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে মাতৃভাষায় পাঠদানের পরিবেশও ইতিমধ্যে তৈরি করছেন এসব স্কুলগুলো। মাতৃভাষা শিক্ষা বিষয়ে স্কলাস্টিকা স্কুলের জুনিয়র সেকশনের ভাইস প্রিন্সিপাল সাইদা ফারদাহ ফারহানা আলম বলেন, ‘মাতৃভাষা একটি জাতির অস্তিত্বের প্রতিফল। মাতৃভাষার চর্চা যেন সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় তার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে শিক্ষা জীবনের গোড়া থেকেই। এ বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখেই আমার স্কুলে বাংলা শিক্ষা দেওয়া হয়। শিশুরা যেন আনন্দ নিয়ে মাতৃভাষা শিখতে পারে তার জন্য বিজ্ঞান সম্মতভাবে হাতেকলমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়। বাংলা শেখার পাশাপাশি বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্যোগও নেই আমরা’। যাদের মাতৃভাষার শিক্ষার মান যত ভালো তারাই খুব সহজে আয়ত্ত করতে পারে যেকোনো ভাষা। তাই এখন থেকেই প্রয়োজন ভাষা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রয়োজন প্রচুর বই পড়ার অভ্যাস সৃষ্টি করার। পৃথিবীর প্রত্যেকটি উন্নত দেশে সর্বত্র দেখা যায় বই পড়ার চিত্র। কিন্তু আমাদের দেশে যা খুবই কম। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেকে রয়েছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কর্তব্য সম্পাদনের সুযোগ। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শিশুদের উপর সেখানে এ মাধ্যমের প্রভাব খুবই বেশি। হতে পারে শিশুদের ভাষা শিক্ষার জন্য মজার অনুষ্ঠান। এতে করে শিশুরা আগ্রহী হবে বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য। ভাষার ব্যাপারে যে যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রীয় ও প্রতিষ্ঠানিকভাবে সচেতন হলে এ সমস্যার মোকাবেলা করা কঠিন কিছু নয়। সর্বশেষ বলা যায়, শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাসেই নয়, সারা বছর ভাষা প্রেম জাগ্রত হোক সবার মাঝে। ছোট বাচ্চাদের শুদ্ধ বাংলা ভাষাটা শেখান মনোযোগ দিয়ে, যত্নের সাথে। দেখবেন আপনার বাচ্চা ইংরেজিটাও শিখবে শুদ্ধ করে। এটা আমাদের আত্মার কথা, অন্যটা জীবনের প্রয়োজনে কথা বলে। আমরা দুটোই শেখাই না কেন, আমাদের আদরের সোনামণিদের। মাতৃভাষায় আপনার সোনামনিকে করে তুলুক আত্মপ্রত্যয়ী ও আধুনিক। মাতৃভাষার চেয়ে মিষ্টি আর কী আছে বলুন তো!