আমাদের বাসা ছিল পুরানো ঢাকার ঠাটারিবাজারের ৮৯নং বিসিসি রোডে। আমাদের পাড়াতে বেশ ক’জন প্রখ্যাত লেখক বাস করতেন। ৮৭ নম্বরের বাসাটি ছিল ড. আনিসুজ্জামান স্যারদের। তার চাচাতো ভাই আমিনুজ্জামানের লেখা গল্প তখন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হত। সে বাড়ির নিচতলায় ভাড়াটে ছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গনি হাজারী। ৯০ নম্বর বাড়িতে থাকতেন আদমজী পুরস্কারপ্রাপ্ত কন্যা কুমারী উপন্যাসের লেখক আবদুর রাজ্জাক চৌধুরী। তার বাড়িতে শিশু সাহিত্য সংসদ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিল। যেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছিল আতোয়ার রহমানের সাঁঝের বেলার রূপকথা।’ আনিসুজ্জামানের বাসায় ছিল ‘পূরবী’ কচি কাঁচার মেলার পাঠাগার। সেখানে র্যাকে থরে ধরে সাজানো শিশু সাহিত্যের ঝলমলে সব বই। সব মিলিয়ে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠার মত অনুকূল পরিবেশ।
পাড়ার ‘ভাস্কর’ কচি-কাঁচার মেলার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে ৬৪ সালে একদিন এলেন দাদাভাই। আমার অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ভঙ্গি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি আমাকে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার আহ্বায়ক নিযুক্ত করলেন। আমি যেন সহসাই এক ভিন্ন সৃজনশীল জগতে প্রবেশ করলাম। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গে’র মত অবস্থা।
আনিসুজ্জামান স্যারের ছোট ভাই আমার সহপাঠি আখতারুজ্জামান সে সময় ‘পূরবী’ নামে ছোটদের জন্য এক মাসিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। আমাকে পত্রিকার জন্য গুল্প লেখার নিত্য তাগাদা দিত। আমার লেখালেখি শুরু করতে এসব প্রধান ভূমিকা রাখল।
লয়াল স্ট্রিটের সাপ্তাহিক বেগম ও মাসিক সওগাত পত্রিকার কার্যালয়ে তখন কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হত। সাথী ভাই শাহাদত চৌধুরী সেটি পরিচালনা করতেন। আমি সেখানে ৬৫ সালে ‘ট্রাকের নতুন শিকার’ নামে একটি করুন রসের গল্প পাঠ করলাম।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. আবদুল্লাহ আল মূতী শরফুদ্দিন লেখাটির যথেষ্ট প্রশংসা করলেন। তার ভাষণে বল্লেন, লেখকের জীবনকে দেখার চোখ রয়েছে। দাদাভাই লেখাটি নিয়ে পরের শুক্রবারের ‘কচি-কাঁচার আসরে’ প্রকাশ করলেন। সাথে হাশেম খানের চমত্কার ইলাসট্রেশান। দাদাভাই তার চিঠিতেও লেখাটির উল্লেখ করে নবাগত লেখককে অভিনন্দন জানালেন। আমি তো অভিভূত হয়ে গেলাম। যেন সোনার কাঠি, রূপোর কাঠির অদল-বদলে ঘুমন্ত রাজকন্যে জেগে উঠল। আমি দারুণভাবে আলোড়িত হলাম। বুকে জাগল ঢেউ। চোখে ঘনাল ঘোর। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, যে করেই হোক আমাকে একজন লেখক হতে হবে। শুধুমাত্র লিখেই শিশু-কিশোরদের মনকে স্পর্শ করতে হবে। আমাকে এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর পর্যন্ত।
দৈনিক ইত্তেফাকের মত একটি বহুলপঠিত ও জনপ্রিয় পত্রিকার ১৪ বছর বয়সে লেখা ছাপা হওয়াতে আমি ব্যাপক পরিচিতি পেয়ে গেলাম। বলা যায় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠলাম। দাদাভাই আমাকে আরো গল্প লিখতে তাগাদা দিলেন। আমি যেন এক নতুন পৃথিবীর অভিযাত্রী হয়ে উঠলাম। চারপাশের পরিবেশ আর মানুষজনদের ভিন্ন চোখে দেখা শুরু করলাম। কোন ঘটনার নেপথ্যের কাহিনীটাকে জানার প্রতি কৌতূহলী হয়ে উঠলাম। এক আশ্চর্য রকমের ঘোরলাগা অবস্থা তখন আমার। মনে হত বহু বিচিত্র ধরনের গল্প-কাহিনী চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমি উত্সুক হয়ে সেসব খুঁজতে লাগলাম। আমার অনুভূতি ক্রমশ তীক্ষ্ম হতে লাগল।
ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে আমি একজন দুঃসাহসী ভূ-পর্যটক হব। বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে ভ্রমণ করতে যাব। বাঙালি ভু-পর্যটক রমানাথ বিশ্বাসের রোমাঞ্চকর ভ্রমণ কাহিনী পাঠ করে আমি প্রবলভাবে উদ্দীপিত হয়েছিলাম। শুধুমাত্র দু’-চাকার এক সাইকেলে চেপে কতো জায়গায় তিনি অনায়াসে চলে গেছেন। বিভূতিভূষণের একটি গ্রন্থ আমাকে দূরের বিচিত্র পৃথিবীর হাতছানি দিল। সে লেখায় গহিন অরণ্য, প্রবাল দ্বীপ, পার্বত্য অঞ্চল-এর সন্ধান পেলাম। শুধু যেন মনে হত, কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। এক দুরন্ত পর্যটক হবার স্বপ্নে আমি যেন বিভোর হয়ে থাকতাম।
আমি প্রাচীনকালের বাংলাদেশের পটভূমিকায় ‘জীবনের জন্য’ নামে একটি কিশোর উপন্যাস রচনা করছিলাম। অষ্টম ও নবম শতকের কাহিনী। ইতিহাস আমার একটি প্রিয় বিষয়। সেই কাহিনীর নায়ক ছিল কঙ্ক নামের এক কিশোর যে পোড়ামাটির কারুকাজ নির্মাণে কুশলী ছিল। সোমপুর বিহারের দেয়ালে স্থাপনের জন্য যে নিখুঁতভাবে টেরাকোটার কাজ করেছিল। ওই লেখাটির জন্য আমি প্রাচীন বাঙলার বিভিন্ন জনপদ সমতট, বরেন্দ্র, রাঢ়, হরিকেল, বাঁকলা, চন্দ্রদ্বীপের ইতিহাস পাঠ করে ভীষণ আলোড়িত হয়েছিলাম। যেন প্রাচীন বাঙলার অতীতের দিনগুলো ছবির মত থরে থরে চোখের সামনে ফুটে উঠল। অনুভব করলাম আমাদের প্রত্যেকের পায়ের নিচে লেগে আছে পলিমাটির দাগ। লেখাটি আমার কাছে প্রিয়।
আমার কিশোরকালে আব্বা একবার পূবাইলের বিল থেকে এক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি শিকার করে এনেছিল। বন্দুকের ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ওই পাখিদের ছিন্ন-ভিন্ন শরীর দেখে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ক্রমাগত বমি করতে থাকি। পাখিদের যে ডানাগুলো মুক্ত আকাশে অবাধে উড়ে বেড়ায় সেগুলোর অমন রক্তমাখা দোমড়ানো-মোচড়ানো রূপ দেখে আমি নিদারুণ কষ্টে কাতর হয়ে যাই। আমার বুকের ভেতরে পাখিরা যেন ডানা জাপটাতে থাকে। আম্মাকে বলি, আব্বা যেন পাখি শিকার করা ছেড়ে দেয়। আমার অসুস্থতা আর যন্ত্রণা দেখে আব্বা এরপর পাখি হত্যা সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিয়েছিল। সেটা ছিল আমার জন্য এক স্মরণীয় ঘটনা।
আমার জন্ম তারিখ ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাউতলির নানাবাড়ি। ১৯৬৬ সালে ঢাকার নবাবপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি। জগন্নাথ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশাগত জীবনে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চ্যানেল ওয়ানের মহাব্যবস্থাপক ছিলাম। বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাই টিভি এবং মোহনা টিভি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলাম। বর্তমানে ফ্রি-ল্যান্স কাজ করছি। চ্যানেল আই এবং গাজী টিভিতে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি।
শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা পাঁচ শতাধিক। উল্লেখযোগ্য বই: দ্বীপের নাম মধুবুনিয়া, অপারেশন কাঁকনপুর, শাদা পরি, তিতিরমুখীর চৈতা, বনকুসুমপুর রহস্য, আলোর ফুলকি, জীবনের জন্য, বাঙলা নামে দেশ, নীল চোখের ছেলে, পিকুসমগ্র, হিমছড়ির ভরভূর রূপোলি ফিতে, ডানা মেলার দিন, সেরা কল্পবিজ্ঞানের গল্প।
বাংলা একাডেমী পুরস্কার (২০০২), অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণপদক, লেখিকা সংঘ স্বর্ণপদক, হোসনে আরা শিশু-সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশু-সাহিত্য পুরস্কার, ছোটদের কাগজ শিশু-সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পুরস্কার (২০১২)।
