শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর এখন ‘জয়বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত, যা এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে। রাতদিন ২৪ ঘণ্টা এখন ধ্বনিত হচ্ছে জয়বাংলা স্লোগান। স্বাধীনতা লাভের পর আমরা আমাদের জাতীয় চেতনা ও মূল্যবোধকে লালন করার মানসে কতগুলো চেতনাকে গ্রহণ করেছি। ব্যাংক, বীমা, শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ ছাড়াও আমরা আমাদের কিছু ঐতিহ্যকে ‘জাতীয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছি। যেমন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা ও লালন করার শপথ নিয়েছি। জাতীয় সংগীত ছাড়াও গাঢ় সবুজ জমিনের মধ্যে ১০:৬ অনুপাতের একটি লাল বৃত্তের ‘জাতীয় পতাকা’ হূদয়ে ধারণ ও সর্বত্র উত্তোলন করেছি, পানিতে ভাসমান শাপলা এবং উভয় পাশে একটি করে ধানের শীষ, চূড়ায় পাটগাছের পরস্পরযুক্ত তিনটি পাতার উভয় পাশে দুটি করে তারকা সম্বলিত ‘জাতীয় প্রতীক’ গ্রহণ করেছি, ‘ইলিশ’কে আমরা ‘জাতীয় মাছ’ হিসেবে, ‘দোয়েল’কে আবার ‘জাতীয় পাখি’ হিসেবে, ‘কাঁঠাল’কে ‘জাতীয় ফল’, ‘শাপলা’কে ‘জাতীয় ফুল’, আমাদের অহঙ্কার সুন্দরবনের ‘রয়েল বেঙ্গল’কে ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়াও আমরা আমাদের ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদদের স্মরণে জাতীয় পুরস্কার হিসেবে ‘একুশে পদক’, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণে জাতীয় পুরস্কার হিসেবে ‘স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার’, চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্যে ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’, ক্রীড়াঙ্গনের বিশেষ অবদানের জন্যে ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’, মুুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতির স্মরণে ‘জাতীয় বীরত্বসূচক খেতাব’ (বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক) প্রবর্তন করেছি। আমাদের গৌরবের দিনগুলো যথা শহীদদিবস, স্বাধীনতাদিবস, পহেলা বৈশাখ ও বিজয়দিবসকে ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে ঘোষণা ও পালন, তারুণ্য আর দ্রোহের কবি নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে ঘোষণা করেছি। তা ছাড়াও আমরা ‘জাতীয় জাদুঘর’, ‘জাতীয় গ্রন্থাগার’, ‘জাতীয় প্রেসক্লাব’, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড’ ইত্যাদির মতো প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছি। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হচ্ছে আমরা আমাদের একটা ‘জাতীয় স্লোগান’ অদ্যাবধি প্রণয়ন করিনি। যদিও স্লোগানে স্লোগানে আমাদের কান এখন ঝালাপালা। প্রায় প্রত্যহ-ই আমরা ‘আগুন জ্বালো’ কিংবা ‘ওমুকের চামড়া, তুলে নেব আমরা’ ধরনের স্লোগান শুনতে শুনতে অনেকটা স্লোগান বিমুখ হয়ে পড়েছি। কিন্তু পৃথিবীর অনেক দেশেই তাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে জাতীয় ‘স্লোগান’ রক্ষা করছে। ভারতেও ‘বন্দে মাতরম’ তাদের ‘জাতীয় স্লোগান’।
বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জাতীয় স্লোগান না থাকলেও ‘জয়বাংলা’ ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও অন্যতম স্লোগান। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীপক্ষ তথা পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা বিজাতীয় তথা বিভাষিক ‘জিন্দাবাদ’কে পাকিস্তানের পক্ষে ব্যবহার করতো। একাত্তরের পাকিস্তানি পক্ষের অনুসরণে অনেক বাংলাদেশি এখন জেনে কিংবা না জেনে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উর্দু ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনিটি ব্যবহার করছে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী বিধায়, সঙ্গত কারণেই জিন্দাবাদ ধ্বনিটিতে মুিক্তযুদ্ধের চেতনাধারী অনেকেই মনোকষ্টে ভোগেন। অর্বাচীন শাসককুলের হাতে পড়ে এবং অনেকটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ধ্বনি ‘জয়বাংলা’ আমাদের থেকে হারিয়ে যেতে বসেছিল। তাই ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মার ধ্বনি ও মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনের অন্যতম প্রেরণা ও শক্তি ‘জয়বাংলা’কে বাংলাদেশের ‘জাতীয় স্লোগান’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ তথা ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে বলে বিশ্বাস করি। যদিও এ স্লোগানে কারো কারো গাত্রদাহ বেড়ে যেতেও পারে, তারপরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবিকারী বর্তমান সরকার অবশ্যই বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা ইতিহাসের স্বার্থেই।
সম্প্রতি মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্লোগান ‘জয়বাংলা’-কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্লোগান কেন ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে সরকার তথা ১) মুখ্য সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়; ২) মন্ত্রী পরিষদ সচিব, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ; ৩) সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; ৪) সচিব, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়; ৫) সচিব, তথ্য মন্ত্রণালয়; ৬) সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি গত ২০-১-২০১৩ তারিখে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ২৮ নম্বর কোর্টের বিচারপতি এম মোয়াজ্জেম আলী ও বিচারপতি এম হাবিবুল গনি ২০ জানুয়ারি রুলটি জারি করেন। বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জের রিট আবেদনকারী জাহাঙ্গীর হোসেন একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে গত ১৩-১-২০১৩ তারিখ হাইকোর্টের ১৬ নম্বর বেঞ্চে বিচারপতি নাঈমা হায়দারের কোর্টে রিট নম্বর ১৬৪৯৪/২০১২ ও একই উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা আ. বাতেন (কমান্ডার, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল) রিট নম্বর ১৭২৮৭/২০১২-তে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্লোগান হিসেবে ‘জয়বাংলা’কে রাষ্ট্রীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণার আবেদন করেন। যা ১৬ নম্বর কোর্টের ১৪ জানুয়ারি আইটেম ১৪০ ও ১৪১ হিসেবে কার্যতালিকায় এবং ১৫ জানুয়ারি আইটেম ১০৮ ও ১০৯ হিসেবে কার্যতালিকায় স্থান পায়। ১৬ নম্বর কোর্টের বিচারপতিদ্বয় হাইকোর্টে প্রাথমিক শুনানি শেষে কোনো রুল না দিয়ে আবেদনপত্র দুটি ১৬ বেঞ্চের বদলে ‘সিনিয়র কোনো বেঞ্চে’ শুনানির পরামর্শ দিয়ে ফেরত দিলে, ২০ জানুয়ারি আবেদনকারীদ্বয় রিট ২টি ২৮ নম্বর কোর্টে বিচারপতি এম মোয়াজ্জেম আলী ও বিচারপতি এম হাবিবুল গনির আদালতে তুললে কোর্ট ২০ জানুয়ারি রুলটি জারি করেন। আবেদনকারীদের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন মামলা ২টি উপস্থাপনা ও নানাবিধ যুক্তি তুলে ধরেন, তাঁকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট এম হুমায়ুন কবীর। আবেদনে প্রতিবাদীগণের বিরুদ্ধে স্বল্প সময় দিয়ে একটি রুল নিশি ইস্যু করা, যাতে তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের মহান স্লোগান ‘জয়বাংলা’-কে কেন জাতীয় স্লোগান হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে না এবং একইসঙ্গে ‘জিন্দাবাদ’কে কেন বাংলাদেশের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ তথা বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ তথা আদেশ প্রদানের আবেদন করেন। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে অবস্থানকারী লাখো তরুণ কণ্ঠে ধ্বনিত ‘জয়বাংলা’ এদেশের রাষ্ট্রীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষিত হোক— এ প্রত্যাশা অনেকেরই।
ঢাকা
