নাব্যতা সংকটে বন্ধ খুলনা অঞ্চলের ৩০ নৌপথ

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:০৮
নাব্যতা সংকটের কারণে গত দুই যুগে খুলনা অঞ্চলের ৩০টিরও অধিক নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে ছয়টি নৌপথে মাত্র ৯টি লঞ্চ চলাচল করছে। যাত্রীর অভাবে যে কোন সময় এ নৌপথগুলোও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এদিকে অধিকাংশ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সড়কপথে মালামাল পরিবহন ও যাতায়াত ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও লঞ্চ মালিক সূত্র জানায়, উন্নত সড়ক যোগাযোগের অভাবে ব্রিটিশ আমল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ। সে সময় খুলনা থেকে মানুষ লঞ্চে যাতায়াত করত বরিশাল, টেকেরহাট, নড়াইল, মাগুরা, ভাটিয়াপাড়া, বড়দিয়া, কালিয়া, তেরখাদা, রামপাল, মংলা, ভান্ডারিয়া, দাকোপ, কালাবগি, মদিনাবাদ, জোড়সিং, ঘুগরাকাঠি, আংটিহারা, নীল ডুমুর, পাইকগাছা, আশাশুনি, মুন্সিগঞ্জ, মাদ্রাসারহাট ও ঘাগরসহ ৩৫টিরও অধিক রুটে। ফলে এ অঞ্চলে লঞ্চে যাত্রী পরিবহন ব্যবসা জমজমাট হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে বেঙ্গল ওয়াটার ওয়েজ, পাক ওয়াটার ওয়েজ, নাহার ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি ও আব্দুল্লাহ নেভিগেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু স্বাধীনতার পর ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস ও গত শতকের ৮০’র দশকের পর থেকে সড়ক পথের ব্যাপক উন্নয়ন, অধিকাংশ নদীর ওপর ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও যাত্রী সংকটের কারণে নৌপথগুলোতে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এ অঞ্চলে মাত্র ছয়টি নৌপথে ৯টি লঞ্চ চলাচল করছে। এ ছয়টি নৌপথ হচ্ছে খুলনা-নীলডুমুর, খুলনা-মদিনাবাদ, খুলনা-বাগেরহাট হয়ে তুষখালি, খুলনা-মুন্সিগঞ্জ, খুলনা-একসরা ও খুলনা-জোড়সিং। তবে এ ছয়টি নৌপথে লঞ্চে যাত্রী পরিবহনের চেয়ে বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী পরিবহনে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে। তাছাড়া যে সকল নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে সে সকল রুটে লঞ্চের পরিবর্তে বর্তমানে ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে মালামাল পরিবাহিত হচ্ছে। ইচ্ছামত ও বেআইনিভাবে এ সকল ট্রলার চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা। জানা গেছে, শুরুতে খুলনা বিভাগে নৌপথের দৈর্ঘ্য ছিল এক হাজার ১৮৪ কিলোমিটার। ইতিমধ্যে পলি জমে ও ডুবোচরের কারণে ৪৯১ কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ৬৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে স্বলসংখ্যক লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযান চলাচল করছে। এসব নৌযানে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করে এবং প্রায় তিন লাখ টন মালামাল আনা-নেয়া করা হয়। বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, পলি জমে ও ডুবোচর পড়ে বর্তমানে খুলনা অঞ্চলের প্রায় ৯০ কিলোমিটার নৌপথ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেলের ৩২ কিলোমিটার, চালনা-কালীবাড়ি ২০ কিলোমিটার, খুলনা-নওয়াপাড়া ৮ কিলোমিটার, চালনা-নলিয়ান নৌপথের চার কিলোমিটার এবং শিপসা নদীর পাইকগাছার হড্ডা এলাকায় তিন কিলোমিটার, চুনকুড়ি নদীর মোহনা ও ডাঙ্গাপাড়া সংলগ্ন নদীতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ নদীর নাব্যতা হ্রাস, দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং যাত্রী ও মালামাল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে খুলনা অঞ্চলের বেশিরভাগ নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। যে সকল নৌপথে এখনো লঞ্চ চলাচল করছে সে নদীগুলো ড্রেজিং করা না হলে দু’-এক বছরের মধ্যে সেগুলোতেও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে লোকসানের কারণে অধিকাংশ মালিক লঞ্চের ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। ফলে বেকার হয়ে গেছে এ অঞ্চলের সহস্রাধিক লঞ্চ শ্রমিক ও কর্মচারী। এদিকে, অধিকাংশ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সড়কপথে মালামাল পরিবহন ও যাতায়াত ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। নৌযান চালকরা জানান, রামপাল-ঘোসিয়াখালী চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৫ কিলোমিটারের জায়গায় অতিরিক্ত ৬০ কিলোমিটার ঘুরে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। মংলা-খুলনা নৌপথে চলাচলকারী এমভি নাদিম-১ এর চালক শেখ মোহম্মদ মোহসীন বলেন, নওয়াপাড়া থেকে শিরোমনি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার, সাতক্ষীরার কপোতাক্ষের প্রায় সব অংশ, পাইকগাছার শিপসা নদীর হড্ডা এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটারে ভাটার সময় মাত্র দুই-তিন ফুট পানি থাকে। তিনি জানান, একটি কার্গোতে যেখানে ১০০ টন সার নিতে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে সড়কপথে ট্রাকে করে সমপরিমাণ সার নিতে চার লাখ টাকা খরচ হয়। কয়রা উপজেলার নিয়ামত আলী জানান, বাসের তুলনায় লঞ্চে ভাড়া কম। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেখানে বাস ভাড়া ১৪০ টাকা, সেখানে একই পরিমাণ দূরত্বে লঞ্চ ভাড়া ৯০ টাকা।