বাংলাদেশে এই প্রথম পৌরবর্জ্য হইতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রকল্প গৃহীত হইয়াছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য হইতে উত্পাদিত ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ জাতীয় পাওয়ার গ্রিডে যুক্ত হইবে। দায়িত্ব পাইয়াছে ইতালিভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ফিনান্স এসইএল নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাহারা ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করিবে। যাত্রাবাড়ী ও আমিনবাজারে দুটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হইবে এবং উত্পাদিত প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুত্ সরকার আট টাকা ৭৫ পয়সা দরে কিনিবে। সরকারের সাথে চুক্তির পর তিন ধাপে তিন বত্সরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হইবে। নগরজীবনের ক্রমবর্ধমান বিপুল বর্জ্য সমস্যাকেই বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মিটাইতে ব্যবহারের এই উদ্যোগ নিশ্চয় সাধুবাদ পাইবার যোগ্য।
পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই আমাদের দেশেও শহরগুলির নিকটবর্তী নিচু জমিতে পৌরবর্জ্যের ভাগাড় গড়িয়া উঠিয়াছে। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তাল মিলাইয়া বর্জ্যের পরিমাণও বাড়িতেছে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার টন বর্জ্য উত্পন্ন হয়, যাহা ফেলিবার জায়গা পাওয়া ক্রমেই দুষ্কর হইয়া উঠিয়াছে। উপরন্তু, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে তাহা ভূমি, পানি ও বায়ু দূষণ ঘটাইয়া জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়াইতেছে। তাই, পরিবেশ দূষণ রোধে বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি হইয়া পড়িয়াছিল। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম উপায় হইল পোড়াইয়া পরিমাণ কমাইয়া ফেলা। কিন্তু পোড়াইলে তাহার পরিমাণ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করা সম্ভব হইলেও চারিপার্শ্বে ধোঁয়া ছড়াইয়া বিপত্তির কারণ ঘটায়। বর্জ্যের উপাদানসমূহের বৈশিষ্ট্যানুযায়ী ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিক্রিয়াও হয় বিভিন্ন ধরনের। সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতব বা ডাই-অক্সিন উত্পাদনকারী প্লাস্টিক বা পলিথিন জাতীয় পদার্থ পোড়াইলে তাহার বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। উত্তম ও আধুনিক পন্থা হইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করা। পচনশীল বর্জ্য হইতে জৈব সার উত্পাদন তেমনই একটি প্রক্রিয়া; পৌরবর্জ্য পোড়াইয়া বিদ্যুত্ উত্পাদন আরেকটি বিকল্প। অনেক বত্সর পূর্বেই বিশ্বের বড় বড় শহরে বর্জ্য হইতে বিদ্যুত্ ও জৈব সার উত্পাদনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক ব্যবস্থাপনা চালু হইয়াছে।
বাংলাদেশেও বর্জ্য হইতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব পুনর্চক্রায়নের মাধমে বিদ্যুত্ ও জৈব সার উত্পাদন করা সম্ভব। ইহা দেশের বর্তমান বিদ্যুত্ ঘাটতি পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখিবে। সেইসাথে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করিতে পারিলে পচনশীল বর্জ্য সংগ্রহ করিয়া উন্নতমানের জৈবসার উত্পাদন ও বিপণনের মাধ্যমে অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হইতে পারে। ইতোমধ্যে, দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সীমিত পরিসরে গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ করিয়া জৈবসার উত্পাদন ও বিপণনের কিছু ছোট প্রকল্প পরিচালনা করিতেছে। কিন্তু দেশে উত্পাদিত বর্জ্যের পরিমাণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনের তুলনায় এখনো সেইসব উদ্যোগ নিতান্তই অপ্রতুল। উল্লেখ্য, সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুত্ চাহিদার পাঁচ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করিয়া বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করিয়াছে। বতর্মান প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নূতন দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারে ভূমিকা রাখিবে। সরকার বর্জ্য পোড়াইয়া বিদ্যুত্ উত্পাদনের যে দুইটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়াছে, সেগুলি কী ধরনের সতর্কতা পালন করিবে তাহা বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে, পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করিতে সরকার ও প্রকল্প পরিচালকেরা সতর্ক হইবেন এরূপই আমরা আশা করিতে পারি।
